কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দ্বিতীয় ধাপের অভিযান নিয়ে শঙ্কিত চট্টগ্রাম বাসী।

unnamed.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম যা সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রথম ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করে গত ৪ ফেব্রুয়ারি’১৯ থেকে শুরু হয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি’১৯ সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের উচ্ছেদ অভিযানে দখলদারদের ২৩০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়ে তা নির্বিঘ্নে এবং বাঁধাহীনভাবে শেষ হয়েছে।

মহামান্য হাইকোর্টের আদেশে মোট ২,১১২ টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ভূমি মন্ত্রী বলেছিলেন স্বল্প সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হবে। এখন জানা গেছে, “কর্ণফুলী নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করার আগে উদ্ধারকৃত জায়গা সংরক্ষণ করার বিষয়ে মাস্টারপ্ল্যান করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে”। {সূত্রঃ সুপ্রভাত, ২ মার্চ’১৯}।

জেলা প্রশাসন এ পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রমের জন্য পেয়েছে ২০ লাখ টাকা। প্রথম ধাপের কাজের হিসাব শেষ করার পর উদ্বৃত্ত অর্থ দ্বিতীয় ধাপে খরচ করা হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হতে অনেক বিলম্ব হবে কেননা উদ্ধারকৃত জায়গা সংরক্ষণের জন্য মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলা হচ্ছে। চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন প্রশাসনের প্রথম ধাপ উচ্ছেদের সময় যে আগ্রহ ছিল এখন তাদের সে আগ্রহ নেই মনে হচ্ছে। তাছাড়া যে মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলা হচ্ছে সেখানে কি আছে তা কেউ জানেনা। পাশাপাশি একটি মাস্টারপ্ল্যান রাতারাতি বা কয়েকদিনের মধ্যে হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমনও না। এখানে মাসের পর মাস এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং চট্টগ্রাম বাসীর উদ্বেগ আর আশঙ্কাহচ্ছে উদ্ধারকৃত স্থান ইতোমধ্যে কঠোরভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে তা আবার দখলদারদের হাতে চলে যেতে পারে। কেননা উদ্ধার করা জায়গা বেদখলের খবর পাওয়া গেছে যা আবার পুনরায় উদ্ধার করা হয়। প্রথম দফায় সদর ঘাটঘাট ও মাঝিরঘাট এলাকায়ও উচ্ছেদ অভিযান চলেছে। সেখানে বিআইডব্লিউটিসি ঘাটে নদীর জায়গা দখল করে দোকান এবং সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতির কার্যালয় ভেঙ্গে দেয়া হলেও দুই দিন পর নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে দখল করা হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট খবর পেয়ে তাদের আবার উচ্ছেদ করেন। পাশাপাশি “৮ ফেব্রুয়ারি’ ১৯ উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার পর সদরঘাট এলাকা আবার দখল করে নেন কিছু স্থানীয় যুবক। পরে ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে গিয়ে সরিয়ে দেন। এভাবে অন্যান্য স্থানেও উদ্ধার করা জমি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রশাসন”। {সূত্রঃ প্র/ আলো, ১ মার্চ’১৯}। উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্ব দানকারী সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাহমিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “ওই জায়গাটি নতুন করে আবার দখল করে নিয়েছিল। পরে আবার উচ্ছেদ করি। এভাবে ইঁদুর-বেড়াল খেলা চলছে। উচ্ছেদ করা ভূমি রাখা কঠিন”। অন্যদিকে ২০১৬ সালে হাইকোর্ট কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও কর্ণফুলী নদীর পাড়ে পতেঙ্গা এবং বন্দর এলাকায় বেশ কিছু জমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইজারা কিম্বা বন্দোবস্ত নবায়ন করেছে। এগুলোর মধ্যে বোট ক্লাব, বেসরকারি একটি কনটেইনার ডিপো, বেসরকারি ড্রাইডকসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় দেড়শ একর আয়তনের পতেঙ্গার লালাদিয়ার চর বেদখল হয়ে আছে বছরের পর বছর যার সিংহভাগ মালিক বন্দর কর্তৃপক্ষ। ১০ বছর আগে ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী তা দখলমুক্ত করলেও জায়গাটি আবার বেদখল হয়ে যায়। এটিও কর্ণফুলী নদীর উচ্ছেদ তালিকায় আছে। মূল সমস্যা হচ্ছে এখানে নিম্ন আয়ের মানুষ বসতি স্থাপন করে বসবাস করছে ওরাই এখন উচ্ছেদের বিরোধীতা করছে ব্যানার ফেস্টুন লাগিয়ে। পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার পর ভেড়ামার্কেট বস্তিতে আগুন, বস্তিবাসী নিয়ে রাজনীতি সর্বোপরি ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা না থাকায় উচ্ছেদকাজ ঝুলে গেছে বলে সর্বমহলের ধারণ, উদ্বেগ এবং আশঙ্কা। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, কর্ণফুলী নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলো সরিয়ে কর্ণফুলী নদীকে রক্ষা করার জন্য ২০১০ সালের জুলাই মাসে হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ রিট মামলা দায়ের করে। অনেক আইনি প্রক্রিয়া ও জটিলতা শেষে ২০১৬ সালের ১৬ আগষ্ট হাইকোর্ট উভয় তীরের স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। ভূমিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, “দ্বিতীয় পর্যায়ের উচ্ছেদ অভিযান পাঁচ দিনের মধ্যে শুরু হবে। যেসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে, তা অপসারণের জন্যই অভিযান আপাতত বন্ধ আছে” {সূত্রঃ প্র/ আলো, ১০ ফেব্রুয়ারি’১৯}। মন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এটি লোক দেখানো বা পাবলিসিটির জন্য করা হচ্ছে না। দেশের স্বার্থেই তা করা হচ্ছে।
এটিকে সরকার এবং জনগণ মিলে রক্ষাণাবেক্ষণ করতে হবে। এখানে আর কোন অবৈধ স্থাপনা বসতি স্থাপন করতে দেয়া হবে না। গত ২৪ দিনে (৪ মার্চ’১৫ পর্যন্ত) কর্ণফুলী নদীতে অনেক জল গড়িয়ে গেলেও অদ্যাবধি দ্বিতীয় ধাপের অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান শুরুই হয়নি। রাজনৈতিক বা অন্য কোন চাপেএই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলো কিনা এই নিয়ে জনমনে শঙ্কা, উদ্বেগ, কৌতূহল কাজ করছে। যদিও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, “কর্ণফুলী তীরের উচ্ছেদ অভিযান, কৌশলগত বিরতি চলছেঃ মন্ত্রী তাজুল”। { সূত্রঃ সুপ্রভাত, ৩ মার্চ’১৯}। গত ২ মার্চ’১৯ কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধ উচ্ছেদ কার্যক্রম দেখতে গিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, কর্ণফুলী নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। কৌশলগত কারণে বিরতি দেয়া হচ্ছে। বিরতির পর যথারীতি পুরোদমে আবার উচ্ছেদ কাজ শুরু হবে বলে মন্ত্রী জাতিকে আশ্বস্ত করেন। আমরাও চাই হাইকোর্ট যেহেতু নদীকে জীবন্ত সত্ত্বা ঘোষণা করেছে পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছদের পক্ষে হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চের রায় আছে সেহেতু এখানে দমে যাওয়ার, উচ্ছেদ কার্যক্রম ঝুলে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এখানে মন্ত্রীর আরেকটি কথা প্রণিধানযোগ্য, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা হচ্ছে না।

নদীকে দূষণ ও অবৈধ দখলমুক্ত করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে উচ্ছেদ অভিযান করা হচ্ছে। আমরা উদ্বেগহীন শঙ্কামুক্ত এবং আশ্বস্ত থাকতে চাই যে, যে কোন মূল্যে কর্ণফুলীর উচ্ছেদ অভিযান কথিত বিরতির পর নির্বিঘ্নে, সকল বাঁধা বিপত্তি এবং রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যথারীতি পুরোদমে এগিয়ে যাবে।পাশাপাশি বিরতিকালীন সময়ে যেন উদ্ধারকৃত জায়গা অবৈধ দখলদারেরা আবার অবৈধ দখলে নিতে না পারে সেব্যাপারে প্রশাসনকে হুঁশিয়ার এবং কঠোর নজরদারীর মধ্যে থাকতে হবে। দখলকারীরা ছলে বলে কৌশলে এসব জায়গা আবার দখলে নিতে মরিয়া, ভয়ংকর বা আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশের সব খাল, নদী–নদী দখলমুক্ত হয়ে নদী মাতৃক বাংলাদেশ আবার স্বরূপে ফিরে আসবে। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে আমরা কায়োবাক্য মনে তা বিশ্বাস করি।

Top