কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং প্রাসঙ্গিক কিছুকথাঃ

unnamed.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী। :

অবশেষে কর্ণফুলী নদীর প্রথম জোনের উচ্ছেদ সমাপ্ত। ১০ একর ভূমি দখলমুক্ত। উদ্ধার হলো পাঁচ উপখাল। “ কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম গতকাল (৮ ফেব্রুয়ারি’১৯) সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও অব্যাহত ছিল। গত পাঁচ দিনে দখলদারদের ২৩০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়েছে প্রথম জোনের কার্যক্রম” { সূত্রঃ সুপ্রভাত/৯ ফেব্রুয়ারি’১৯}। জানা যায় সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রথম ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয় যা নির্বিঘ্নে এবং বাঁধাহীনভাবে শেষ হয়েছে। তবে আনু মাঝির ঘাটের আশেপাশের এলাকায় নদীর পাড়ে একটি মসজিদ এবং নগরীর সদরঘাট থানারপশ্চিম মাদারবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে “কর্ণফুলী কোল্ড স্টোরেজ এর স্থাপনা অক্ষত থাকা পাশাপাশি মাছ বাজার বহালতবিয়তে আছে এব্যাপারে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কোল্ড স্টোরেজে অনেক সম্পদ সংরক্ষিত আছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে গুঁড়িয়ে দিলে সম্পদ নষ্ট হবে। তাই তাদের সময় দেয়া হয়েছে। একইভাবে মাছবাজারও উচ্ছেদ করা হবে” {সূত্রঃ প্র/ আলো, ১০ ফেব্রুয়ারি’১৯}।

এদিকে ভূমিমন্ত্রী কর্ণফুলী নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিদর্শনে এসে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “হুমকি দিলে উচ্ছেদের গতি আরও বাড়বে” {সূত্রঃ সুপ্রভাত/ ১০ফেব্রুয়ারি’১৯}। চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার একটি বিশেষ কারণ ছিল কর্ণফুলী নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা। যার কারণে বর্ষাকালে নগরীর পানি নিষ্কাশন বাঁধাগ্রস্থ হয়ে নদীতে পৌঁছাতে পারতো না। উল্লেখ্য এখানে পাঁচটি উপখালের প্রবেশ পথ অবৈধ দখল মুক্ত করা হয়েছে। এসব খাল দখল হতে হতে নালায় পরিণত হয়েছে। ফলে নগরীতে জলাবদ্ধতা হত। উচ্ছেদ কার্যক্রমের সমন্বয়ক তাহমিলুর রহমান বলেন, উচ্ছেদের পর খালকে যদি পুরানো আকৃতিতে ফেরানো যায়, জলাবদ্ধতা কমে যাবে বলে তিনি জানান। এখানে উল্লেখ্য, “পাকিস্তান আমলে প্রণীত ড্রেনেজ মাষ্টার প্ল্যানে নগরীর কালুর ঘাট সেতু থেকে নেভাল একাডেমী পর্যন্ত মোট ৩৪ টি খাল চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি চসিকের প্রকৌশলীরা এই ৩৪ টি খালের মধ্যে ২২ টির অস্তিত্ব পেয়েছেন। বাকী ১২ টি খাল হারিয়ে গেছে। খুঁজে পাওয়া ২২ টির মধ্যে আবার ৪টি মরা খাল। সে হিসেবে ৩৪ টি খালের মধ্যে বর্তমানে আছে মাত্র ১৮ টি খাল। বাকি খাল গুলো গত ৪৮ বছরে দখল-বেদখলে অস্তিত্ব হারিয়েছে। এই দুঃখজনক খবরটি জানা গেছে গত ২০ মে ১৭ তারিখ দুপুরে নগরীতে আয়োজিত “নাগরিক সংলাপ ঃ চট্টগাম মহানগরে জলাবদ্ধতা” শীর্ষক এক গোল টেবিল বৈঠকে। (সূত্র,আজাদী/ ২১ মে’১৭)।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে পাঁচটি উপখাল উদ্ধার হয়েছে। পাশাপাশি ৩৪ টি উপখালের মধ্যে মাত্র ১৮টি খালের অস্তিত্ব আছে, ৫টি উপখালের মুখ পাওয়া গেছে বাদবাকী উপখালের অস্তিত্বহীন ১২টি সহ সব উপখালকে যে কোন উপায়ে আগের আকৃতিতে অবশ্যই ফিরিয়ে আনতে হবে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ।যেভাবে সব রক্তচক্ষু, ক্ষমতার দাপট, হুমকি ধামকি উপেক্ষা করে কর্ণফুলী নদী তীরের অবৈধ দখলদারদের প্রথম ধাপে উদ্ধার করা হয়েছে সেভাবে। ভূমিমন্ত্রীজানান, “দ্বিতীয় পর্যায়ের উচ্ছেদ অভিযান পাঁচ দিনের মধ্যে শুরু হবে। যেসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে, তা অপসারণের জন্যই অভিযান আপাতত বন্ধ আছে” {সূত্রঃ প্র/ আলো, ১০ ফেব্রুয়ারি’১৯}। মন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এটি লোক দেখানো বা পাবলিসিটির জন্য করা হচ্ছে না। দেশের স্বার্থেই তা করা হচ্ছে। এটিকে সরকার এবং জনগণ মিলে রক্ষাণাবেক্ষণ করতে হবে। এখানে আর কোন অবৈধ স্থাপনা বসতি স্থাপন করতে দেয়া হবে না। দখল করা জায়গায় একগুচ্ছ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সরকারের আছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে দৃষ্টিনন্দন কিছু করার পাশাপাশি ভাসমান জেটি করার চিন্তাও আছে। জেটি করলে পণ্য উঠানামায় গতি আসবে বলে মন্ত্রী জানান।

আমাদের বিশ্বাস কর্ণফুলী তার হারানো গৌরব আবার ফিরে পাবে। চারিদিকে সবুজ বনায়ন, বিনোদন কেন্দ্র, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা করা উচিৎ যাতে সুন্দর পরিবেশে কর্ণফুলী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বিনোদন পাওয়া যায়। মানুষ প্রকৃতির সাথে বিরুপ আচরণ করে সবুজ গাছ, বন, বাদাড় উজাড় করে ফেলছে। পাহাড় কাটছে। তাই কর্ণফুলী নদীর তীরকে পরিকল্পনার মাধ্যমে বনায়ন করে মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। মানুষ নদী ভ্রমণ করতে পারে তার সুব্যবস্থাও করা যায়। আমাদের গ্রাম্য জীবনের আনন্দদায়ক একটা উপকরণ ছিল বর্ষাকালে নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতা। বিভিন্ন রং বেরঙয়ের নৌকা আর মাঝি মাল্লাদের সুরের মাধ্যমে আনন্দ উল্লাস নিয়ে নৌকা প্রতিযোগিতা আমরা শৈশব এবং কিশোরকালে আনন্দ এবং বিনোদনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছি। প্রিয় নৌকার মাঝীদেরকে উৎসাহ দেয়ার জন্য নারী পুরুষের সেকি চিৎকার উল্লাস। যা আমরা হালদা নদীতে দেখেছি। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতা এখন উঠে গেছে বললেই চলে। দেশের বিভিন্ন নদ নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা খুব জরুরী পশাপাশি কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম অতি দ্রুত শেষ করা উচিৎ। নদীর তলদেশে বিশাল পলিথিনের স্তরের জন্য ড্রেজিং এখনো পূরণোদ্যমে শুরু হয়নি যা ভাবনার বিষয়। ভয়ানক ও ভয়ংকর পরিবেশ এবং নদী দূষনের বিষয়। দেশ ওজাতির বিশ্বাস কর্ণফুলী সহ দেশের সকল নদ নদী অবৈধ দখলমুক্ত হবে। তাছাড়া এর কোন বিকল্পও নেই কেননা গত ০৩ ফেব্রুয়ারি’১৯ তারিখে তুরাগ নদী নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ‘তুরাগ নদকে “লিগ্যাল পারসন, জুরিসটিক পারসন ও জীবন্ত সত্ত্বা” হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে দেশের নদ-নদী রক্ষায় প্রতিরোধমূলক বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে’।{ সূত্রঃ প্র/আলো, ০৪ ফেব্রুয়ারি’১৯}। এরই প্রেক্ষিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকৃত স্থান যেন কোনভাবে আবার বেদখল না হয়ে যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে সজাগ সচেতন থাকতে হবে দেশের প্রতি দরদ আর মায়া নিয়ে। যারা অবৈধ দখলকারী তাদেরকে আইনগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে মোকাবেলা করতে হবে যে নির্দেশনা মহামান্য হাইকোর্ট দিয়েছে। আমরাও বিশ্বাস করি কর্ণফুলী নদী বাঁচলে চট্টগ্রাম বাঁচবে, বন্দর বাঁচবে, বাংলাদেশ বাঁচবে। বাংলাদেশের পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা হবে। নদী দূষণ বন্ধ করে জলজ জীব- বৈচিত্র রক্ষা করা দেশের স্বার্থে বেশ জরুরী। দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নদীকে তার জিবন্ত সত্ত্বা ফিরিয়ে দিতে দেশ জাতি এবং রাষ্ট্রকে সামাজিক, রাজনৈতিকভাবে দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও উদারতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষায় দেশপ্রেমের কোন বিকল্প নেই। আসুন নদী বাঁচাই, দেশ ও জাতিকে বাঁচাই।

Top