সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় গ্যাস দুর্ভোগ ও উন্নয়ন ভোগান্তিতে নগরবাসী।

unnamed.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

‘উন্নয়ন ভোগান্তিতে নগরবাসী। উন্নয়ন করতে গিয়ে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় চরম দুর্ভোগ পোহালো নগরবাসী। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি’১৯ শনিবার বিকাল ৪টা থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি’১৯ ভোর ৪টা পর্যন্ত প্রায় ৬০ ঘণ্টার গ্যাস দুর্ভোগে ছিল নগরবাসী’।{ সূত্রঃ সুপ্রভাত, ১৯ ফেব্রুয়ারি’১৯}। জানা যায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি’১৯ শনিবার বিকেলে ইপিজেডের পেছনে মাইট্টা খালে কাজ করতে গিয়ে সিটি কর্পোরেশনের ঠিকাদার গ্যাসের ২৪ ইঞ্চি পাইপ ফুটো করে ফেলে। ফলে ১৮ ফেব্রুয়ারি’১৯ পর্যন্ত গ্যাস ছিলনা। একটি পাইপের ফুটো মেরামত করতে এতো দীর্ঘ সময় কেন ব্যয় হল তা জানতে চাইলে কর্ণফুলী গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, লাইনটি খালের ভেতরে হওয়ায় প্রতিবন্ধকতা ছিল। আর সিটি কর্পোরেশন প্রথমে শোর ফাইলিং কাজ না করায় দুপাশ থেকে মাটি ভেঙ্গে পড়ে এবং কাজ পিছিয়ে যায়। চসিক শোর পাইলিং শেষ করার পর কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষ তাদের কাজ শুরু করে। পাশাপাশি কৌশলে বন্ধ করা হয় গ্যাসের অপচয়। দুর্ঘটনার পর পর ২০ ইঞ্চি পাইপের প্রধান লাইনটিতে অনেক গ্যাস ছিল। কেননা গ্যাস পুরোদমে বন্ধ করা হয়নি। সে কারণে কিছু কিছু এলাকায় মিটি মিটি আকারে চুলো জ্বলেছে। ধীরে ধীরে ব্যবহারের সুযোগ না দিলে তা বিষ্পোরণ হতে পারতো। প্রকৃতপক্ষে গ্যসের অপচয় রোধ এবং দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য এ কৌশল অবলম্বন করেছে কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষ। গ্যাস না থাকায় নগরবাসীর চুলাও যেমন চলেনি তেমনি গ্যাস নির্ভর অনেক শিল্প কারখানাও সচল ছিলনা ।
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় এবং নোংরা রাজনীতি আর অপসংস্কৃতি হচ্ছে একে অপরের প্রতি দোষারপ করা। ব্যক্তি পরিবার সমাজ রাজনীতি সমাজনীতি পেশাজীবী সবকিছুতেই একে অন্যকে দোষারপ করে নিজেকে দোষমুক্ত দাবী করতে সবাই পছন্দ করে। নিজেকে দোষত্রুটিমুক্ত করে আমরা সবাই বাহবা নিতে চাই। নিজেকে পাহাড়ের চূড়ায় আর অন্যকে নর্দমায় নামাতে পারলে খুব আনন্দ লাগে। নিজে নিজের শার্টের কলার নেড়ে তৃপ্তি, আনন্দ ভোগ আর উপভোগ করি। এমন কি দেশ বা রাষ্ট্রের ব্যাপারেও কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। চকবাজার ট্র্যাজেডি নিয়ে দুই সাবেক শিল্প মন্ত্রীর একের প্রতি অন্যের দোষারপ চলছে। বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও সিভিল এভিয়েশানের দিকে আঙ্গুল তুল্লেও তাঁরা বলছেন ব্যক্তিগত তল্লাশি এবং মেশিনে স্ক্যানিং ছাড়া কিছুই ঢুকতে পারেনা। প্রশ্ন থাকে মেশিনের পেছনে এবং তল্লাশির দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব সুষ্ঠু এবং সঠিকভাবে না করে তবে কি হবে। এখানে দোষারপের চেয়ে বিমান বন্দরের নিরাপত্তা রক্ষায় কি কি করণীয় সে ব্যাপারেই সকলের মনযোগী হওয়াটাই দেশের স্বার্থে খুবই জরুরী। আঞ্চলিক পর্যায়েও দোষারপের অন্ত নেই। চট্টগ্রামে গ্যাসের ভোগান্তি নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অভিযোগ করেন চসিক তাঁদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। আরো বলেন কাজ করার আগে কর্ণফুলী গ্যাসকে অবহিত করে থাকলে তাঁরা এর উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতেন। তা হয়নি বলে বিশাল এক ক্ষতি হয়ে গেল। নগরবাসীর দুর্ভোগ হল আর কর্ণফুলী গ্যাসের হল আর্থিক ক্ষতি। তিনি মেয়র সাহেবের সাথে দেখা করে সেবা ও উন্নয়নের উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধণের বিষয়টি তাঁর নজরে আনবেন বলে জানান। অপরদিকে সিটি মেয়র বলেন, অবশ্যই এসব কাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরী। তিনি আরো বলেন, এজন্যই সেবা ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো নিয়ে আমি কো-অর্ডিনেশন মিটিং শুরু করেছিলাম। মেয়র দুঃখ করে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান প্রধানরা মিটিংএ উপস্থিত না হওয়ায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছরও মেয়র বর্ষাকালে রাস্তা খোড়াখোড়ি না করার জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসাকে চিটি দিয়েছিলেন। তবে ওয়াসা মেয়রের আহবানে সাড়া দেয়নি কেননা এ প্রকল্পে জাপানের অর্থ আর কারগরি সহায়তা জড়িত ছিল। এদিকে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, কর্ণফুলী গ্যস কোম্পানির এতো বড় একটি পাইপ লাইন গিয়েছে কিন্তু সেখানে কোনো এয়ার মার্ক (নির্ধারিত চিহ্ন) ছিল না। একারণে কাজের সময় তা চোখে পড়েনি বলে তাঁর দাবী। অপরদিকে ঘটনাস্থলে এয়ার মার্ক না থাকার প্রসঙ্গে কর্ণফুলীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ঘটনাস্থলে এয়ার মার্ক থাকার বিষয়টি সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীদের ডেকে দেখানো হয়েছে। তিনি আরও জানান আন্তর্জাতিক বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী মাটির ৫ থেকে ৬ ফুট নিচ দিয়ে পাইপ লাইন নেয়ার কথা থাকলেও এখনে ১৬ ফুট নিচ দিয়ে পাইপ লাইন নেয়া হয়েছে। তারপরও দুর্ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরী বলে তিনি অভিমত দেন। মোট কথা এখানেও একের প্রতি অন্যের দোষারপ আছে নেই দায় স্বীকারের মন মানসিকতা ও সৎ সাহস। জনগণের দুঃখ, দুর্ভোগ, ভোগান্তি, বিড়ম্বনা কেউ বুঝেনা। যার যার অবস্থানে তার অবিচল এবং অটল। যেন জনগণের দুঃখ দুর্দশা ভোগান্তি তাঁদের কিছু কিছুই নয়।

বড় আশঙ্কা আর উদ্বেগের কথা শুনিয়েছেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন সামান্য একটি পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ায় দুই দিন নগরীতে গ্যাস নেই। তিনি প্রশ্ন রাখেন, সিডিএ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে যাচ্ছে সেখানে কি ঘটবে ? শেখ মুজিব রোডের নিচে বক্সকালভার্ট, ওয়াসার কয়েকটি মেইন লাইন, টিএন্ডটি লাইনসহ অনেকগুলো সার্ভিস লাইন রয়েছে। তাই সমন্বয় ছাড়া উপায় নেই। অন্যথায় নগরবাসীকে দুর্ভোগে পড়তে হবে। যদিও উন্নয়ন ভোগান্তি নিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, অবশ্যই কাজ শুরু করার আগে ওয়াসা এবং কর্ণফুলী গ্যাসকে অবহিত করা হবে। পাশাপাশি তাদেকে জানানো ছাড়া সিডিএ কোন ডিজাইন করেনা বলে তিনি জানান। একারণে সিডিএর কর্মকাণ্ডে কোন দুর্ঘটনা ঘটে না বলে তাঁর দাবী। যদিও কয়েক বছর আগে বহদ্দারহাট নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে সেটির চাপায় অনেক মানুষ নিহত এবং আহত হয় সেকথা তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন। কথা হচ্ছে চসিক, সিডিএ, ওয়াসা, কর্ণফুলী গ্যাস সবাই সমন্বয়ের কথা বলছেন কিন্তু কোন এক অজানা কারণে কাজের সমন্বয়টা যে হচ্ছেনা তা নগরবাসীর কাছে দৃশ্যমান। এবং দুঃখজনকও বটে। এ বিষয়ে চসিক মেয়রের যে আন্তরিকতার অভাব নেই তা তাঁর কো-অর্ডিনেশন মিটিং আয়োজনের উদ্যোগ থেকেই বুঝা যায়। পাশাপাশি সিডিএ চেয়ারম্যানও সমন্বয়ের কথা বলছেন। চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা চসিক মেয়র এবং সিডিএ চেয়ারম্যান আন্তরিকভাবে জনগণ এবং দেশের উন্নয়নের স্বার্থে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো সমন্বয়ের জন্য এক ফ্লাটফর্মে এসে কাজ করবেন এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোকে সমন্বয়ের মাধ্যমে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসবেন। তাঁরা দুজনে মিলেমিশে এক হয়ে কাজ করলে নগরবাসী উপকৃত হবে। ফলশ্রুতিতে দেশের সম্পদ আর অর্থের অপচয় রোধ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করা যাবে। পাশাপাশি দেশের মানুষ দুর্ভোগ ভোগান্তি ছাড়া উন্নয়নের সুফল দ্রুত ভোগ করতে পারবে।

Top