সুবিধা বঞ্চিত নাকি অধিকার বঞ্চিত ?

FB_IMG_15512320641299558.jpg

তানজীল ইসলাম শুভ :

আসলেই সুবিধা বঞ্চিত বলতে কোন শব্দ কি আছে? নাকি আমরা তাদের বঞ্চিত বলে নিজের দায় এড়িয়ে চলছি। কারণ একটি গণতান্ত্রিক দেশে কখন ও সুবিধা বঞ্চিত কোন মানুষ থাকতে পারে না। আমরা মূলত বস্তি এবং ফুটপাতে ঘুমানো মানুষদের সুবিধা বঞ্চিত বলে থাকি। আসলে তারা সুবিধা বঞ্চিত নয়। তারা হলো অধিকার বঞ্চিত কেননা আমরা যেই সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্র থেকে পেয়ে থাকি তারা সেই সুযোগ সুবিধা পায় না। পায়না সঠিক শিক্ষার সুযোগ। কারণ আমাদের সমাজে এখন শিক্ষা ব্যবসায় রূপ নিয়েছে যা শুধু মাত্র সমাজের উচ্চ শ্রেণীর লোকদের জন্য। তারা পায়না সঠিক চিকিৎকার সুযোগ। কিন্তু চিকিৎসা সেবা পাওয়া কিন্তু সমাজের প্রতিটি লোকের অধিকার। কিন্তু আমাদের সমাজের চিকিৎসা সেবা ও সেই বড় বড় লোকদের জন্য। এসব অসহায় লোকদের কথা কেউ চিন্তা করি না আমরা।
আমাদের সামনে যখন একদল শিশুরা ফুটপাতের কোনায় বসে বসে না খেয়ে পরে থাকে তখন আমরা সমাজের লোকেরা তা সিনেমার মতো উপভোগ করি। বাহ কি চমৎকার। যখন একজন ৪ বছরের শিশু আমাদের কাছে ভিক্ষার জন্য হাত পাতে তখন আমরা তাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেই। কিন্তু উপরে উল্লেখ্য প্রতিটি অধিকার তাদের দেয়া কথা। কিন্তু তারা তা পাচ্ছে না। যার কারণে তারা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জীবন সংগ্রাম করার জন্য নেমে যায় যুদ্ধে। যার কারণে বস্তিতে থাকা কিছু লোকের ছেলে মেয়েরা অল্প শিক্ষিত হলে ও বেশিরভাগ পরিবারের ছেলে মেয়েরা ই অল্প বয়সে ই সমাজ থেকে ছিটকে পরে। আর তার পরেই জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য তা যুক্ত হয় নানান অপরাধ মূলক কাজে৷ বেড়ে যায় ভিক্ষাবৃত্তি,সন্ত্রাস, খুন,মাদক,ছিনতাই এগুলোর আনাগোনা। কারণ তারা যানে যে এ সমাজে বেঁচে থাকতে হলে যুদ্ধ করে বাঁচতে হবে। আমাদের সমাজে এখন অনেক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করার মানুষ আছে কিন্তু এই বস্তির অধিকার বঞ্চিত শিশুদের জন্য আন্দোলন করার মতো মানুষ নেই। আজকে যদি তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত অধিকার পেতো তাহলে তারা তারা এই রকম অপরাধ মূলক কাজে কখন ও জড়িয়ে পড়তো না। তারা ও আমাদের মতো পড়ালেখা করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতো৷ আমাদের দেশের সমাজ টা একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভিতর সীমাবদ্ধ কেননা আমাদের কাছে যখন একজন অসহায় শিশু আসে তখন আমরা তাকে নানান ভাবে অপদস্থ করি। তাড়িয়ে দেই। মারধর করি। কিন্তু কেন? তারা কি মানুষ নয়। সমাজে কি তাদের থাকার অধিকার নেই??
হ্যা অবশ্যই আছে।
এসবের সমাধান কি? আমরা ভাবি সমাধান কেবল টাকা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব। প্রথমে যা চাই সেটি হলো সদিচ্ছা। তারপর চাই স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহন। সারা দেশে যতগুলি অভিজাত স্কুল আছে তারা সবাই ২০ জন করে ছাত্র বিনা বেতনে পড়ালে সংখ্যাটি কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়। যদি ঠিক করি প্রতিটি স্বচ্ছল পরিবার অন্তত একজন অধিকারবঞ্চিত শিশুর দায়িত্ত্ব নেব, তাহলে অন্তত ১০ লক্ষ শিশুর সংস্থান হয়ে যায়। সামাজিক উদ্যোগ ছাড়া কখনো অধিকার অর্জন করা যায় না। অধিকার কোন চাপিয়ে দেয়া বা বইতে লেখা শব্দাবলী নয়। আচরনের মধ্য দিয়েই সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। তাই আমাকে যখন উনাইজার বা কারিশমার মতো ভব্যিষতের কোন আলোকিত শিশু লিখতে বলে শিশুদের নিয়ে, আমি বুঝি যে আমাদের সমাজ না হয় উটপাখীর মতো বালিতে মুখ গুঁজে বসে আছে, তাই বলে আমরা তো বসে নেই। শিশুরাই আজ ভাবছে শিশুদের নিয়ে। কঠিন চর্বিত চর্বনের বিতর্ক না করে , তারা বিতর্কের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছে নিজেদের ভবিষ্যতকে। এতো প্রতিকুলতার মধ্যেও তারা যান্ত্রিক অমানবিক হৃদয়ের মানুষ না হয়ে, মানুষের মতো মানুষ হতে চলেছে।
১৬ কোটি মানুষের এই দেশটকে বদলে দিতে চাই শুধুমাত্র সংকল্প ভাবে সবার প্রচেষ্টায়। শিশুদের অধিকার অর্জনের জন্য সভা সমিতি সেমিনার শুধু নয়, চাই উদ্যোগ। নিজের ভাই বোনকে অধিকার বঞ্চিত রেখে দারিদ্রকে যতই জাদুঘরে পাঠাই আর সুশাসন, গণতন্ত্র নিয়ে যতো বুলি কপচাই না কেন, সভ্য সমাজের সভ্য হয়ে ওঠার জন্য চাই সভ্য আচরন। শেরাটন হোটেলের ভেতরে ইউনিসেফের অফিস কম্পাউন্ড ,বাইরে ফুল বিক্রেতার কাজ করবে শিশুরা আর ভেতরে আমরা শিশু শ্রম নিয়ে কথা বলবো, কি বিকৃত এই বৈপরীত্য। আমি জানি অনেকেই বলবেন আমি একটু মেজাজ গরম করে এই লেখাটি লিখছি। ছোটবেলায় মা যখন চুল আচড়ে দেন,তখন থুতনিটা জেরে ধরে নেন যাতে আমরা মাথা না নাড়ি। সমাজের সেই থুতনী ধরার মানুষ যারা, তারা সমাজের মাথা, বুদ্ধিজীবি, নেতা, রাজনীতিবিদ। তারা এখন আর সে কাজটি করছেন না। ফলে সমাজের মাথা নড়ছে প্রবল অনাচারে। কাউকে না কাউকে সেই কাজটি করতেই হবে।
আমরা না পারলে কি হবে, আগামী দিনের মানুষেরা এ কাজটি করতে প্রস্তুত এখন। আমাদের চুপ করে থাকার কৈফিয়ত দিতে হবে তাদের কাছে। আমরা যদি কথা না বলি, তবে একদিন যখন আগামী প্রজন্ম প্রশ্ন করবে কেন চুপ করেছিলাম আমরা, তখন মাথা নিচু করে আবারো চুপ করে থাকতে হবে আমাদের। আমি সেই চুপকরা নির্বাকদের দলে থাকতে চাই না।
আসুন আমরা কথা বলি। আমরা আমাদের অধিকারের কাথা বলি। আমরা আগামী দিনের স্বপ্নের কথা বলি। আমরা আমাদের আশা আর ভালোবাসার কথা বলি। আমরা সেই দিনের কথা বলি, যেদিনকে কাছে আনবেন বলে ৭১ সালে প্রান দিয়েছিলেন আমাদের প্রিয় মানুষেরা।

তানজীল ইসলাম শুভ
প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি
এসএনডিসি বাংলাদেশ

Top