‘প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের জড়ানো হচ্ছে জঙ্গিবাদের মত ভয়ঙ্কর জগতে’

BUBT_Suchinta.jpg

বিইউবিটি’তে সুচিন্তা’র জঙ্গিবাদ বিরোধী সেমিনার বক্তারা বলেন

বিশেষ প্রতিনিধি:
‘জাগো তারুণ্য রুখো জঙ্গিবাদ’ শিরোনামে সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের নিয়মিত জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমের এবারের সেমিনারটি আয়োজন করা হয়েছিল রাজধানী মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি)-তে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রায় দেড় বছর ধরে সেমিনার করে আসছে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন।
এবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিইউবিটি ট্রাস্ট, প্রফেসর ড. সফিক আহমেদ সিদ্দিক, বিইউবিটি’র উপাচার্য প্রফেসর মো. আবু সালেহ, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু, চিত্রনায়ক রিয়াজ আহমেদ ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম সংসদের সভাপতি একেএম আজম খান।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে বিইউবিটি’র ট্রাস্ট, প্রফেসর ড. সফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, এই উপমহাদেশে ইসলাম তলোয়ারের নির্দেশে আসেনি, এসেছে সুফিবাদের মধ্যদিয়ে। হযরত শাহজালাল (র.), হযরত শাহ পরান (র.) আমানত শাহ (র.), নিজামউদ্দিন আউলিয়া প্রত্যেকেই এই উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের গোড়াপত্তনে অবদান রেখেছেন। ইসলামের যে শান্তি ও শীতলতা, মানবিকতা ও ঔদার্য্য তাতে আকৃষ্ট হয়ে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন। কোন ধরনের জঙ্গিবাদের সুযোগ সেখানে ছিল না। আমাদের নবীজী (সা.) এর মদিনা সনদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে অন্য ধর্মের মানুষ কত নিরাপদ ছিল।
ইসলামী দেশগুলো এক সময় অনেক সমৃদ্ধ ছিল। আমার ছেলে ববি একবার সিরিয়া ঘুরে এসে বলল, বাবা এত সুন্দর দেশ, মসজিদের পাশে গির্জা, গির্জার পাশে প্যাগোডা। যে যার মত ধর্ম পালন করছে। সেই সিরিয়া, লিবিয়া, ইরানের মত ঐতিহ্যবাহী ইসলামী দেশগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। বাংলাদেশেও মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ঠান পাশাপাশি থেকেছে। কিন্তু আজকে কারা ধর্মীয় উগ্রবাদ তৈরী করতে চাচ্ছে তা তরুণদের বুঝতে হবে। পাশাপাশি জঙ্গিবাদকে রুখতে হবে তরুণদেরই।
চিত্রনায়ক রিয়াজ আহমেদ বলেন, বাঙালি জাতির জন্য মার্চ মাসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসেই আমরা প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলামÑ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষনের মধ্যদিয়ে।
তারুণ্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অভিনেতা বলেন, তারুণ্য বলতে আমি মনে করি, নতুনকে আলিঙ্গন করা, এগিয়ে যাওয়া, নিয়ম ভেঙ্গে নতুন নিয়ম করা, ন্যায়ের পক্ষে প্রতিবাদ করা, প্রগতির পথে চলা, ক্রিকেট-ফুটবলের মাঠে ঝড় তোলা, গিটার হাতে গান গেয়ে ম মাতানো, ভালবাসাÑসবকিছু মিলিয়েই তারুণ্য। জীবনের শিশু, কিশোর, তরুণ ও বৃদ্ধ এই ধাপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে তারুণ্য। তারুণ্যের আলোয় আলোকিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। কিন্তু কিছু বিপদগামী,স্বার্থান্বেষী মানুষের প্ররোচনায় এই তারুণ্য হারিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিবাদের অন্ধকারে। তাই সঠিক পথে থাকতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ২০০২ সালে ময়মনসিংহে একসাথে ৪টি হলে বোমা হামলা হয়েছিল, ২টি হলে আমার সিনেমা চলছিল। ২৭ জন মারা যায় ঐ ঘটনায়। আহতদের দেখতে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমি কোনদিন ভুলব না, সবুর নামে একজন ব্যক্তি বোমা বিষ্ফোরণে যিনি দুই পা হারিয়েছেন তার পাশে দাড়ানোর পর সে বলল, ‘দুই পা হারায়ছি তো কি হইয়ে আপনি আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেন’ এ কথা শোনার পর আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। সেখানে দাড়িয়ে অঝোড়ে কেঁেদছিলাম। আমরা বাঙালিরা অনেক সহজ-সরল। আমাদের এই সরলতার সুযোগ নিয়ে ধর্মের মিথ্যা ভয় ও বেহেশত্ এর প্রলোভন দেখিয়ে তারুণদের জঙ্গিবাদের দিকে নিতে যাচ্ছে একটি মহল।
এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলা, ১৭ আগষ্ট ২০০৫ এ ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা, ১৮ জুলাই ২০১৬ তে হলি আর্টিজান হামলা। এই হামলাগুলো কারা করছে?
তরুণদেরই ব্যবহার করা হচ্ছে এই সব হামলায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর বাণী বিকৃত করে পবিত্র কোরআনের ভুল তর্জমা করে জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দিয়ে এইসব নৃশংস হামলা করা হচ্ছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আল মায়িদায় বলা হয়েছে, ‘একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা আর সমস্ত মানবজাতি হত্যা করা এক’।
তাই ভুল পথ থেকে সরে আসতে হবে তরুণদের। পাশাপাশি সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আলেম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে কোরআন হাসিদের সঠিক ব্যাখ্যা ও তর্জমা নিয়ে। তাহলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। ইতিমধ্যেই সরকার প্রধানের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারনে বাংলাদেশ জঙ্গিমুক্ত হয়েছে। তবে শকুনের দল বসে নেই তাই আমাদেরও সচেতন থাকতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি সফলতার সাথে এদেশ থেকে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নিমূর্ল করেছে। যে চেতনার উপর ভড় করে এদেশে জঙ্গিবাদ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল সেই চেতনাকে রুখতে এবং এর ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে সামাজিক জাগরণ সৃষ্টির সুচিন্তা ফাউন্ডেশন যে কাজ করে যাচ্ছে সে জন্য তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের উচিত এই ধরণের সামজিক সচেতনতা গড়ে তোলা।
আজকে পরিবার মা-বাবা, ভাই-বোনের সাথে দূরত্ব তৈরী হয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকেই ঘটে যাচ্ছে নানা অঘটন। তরুণদের টার্গেট করে এই সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর মাধ্যমে মিথ্যা ধর্মীয় ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের জড়ানো হচ্ছে জঙ্গিবাদের মত ভয়ঙ্কর জগতে। নানাভাবে ব্রেনওয়াশ করে এক একজন তরুণকে আতœঘাতী হিসেবে তৈরী করছে।
মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম সংসদের সভাপতি একেএম আজম খান বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য হাজার কোটি টাকার কাজ নিয়ে এসেছিল জাপানের কিছু প্রতিনিধি। হলি আর্টিজানে তাদের জবাই করে হত্যার পর কতটা কষ্ট করে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে তা সরকারই ভাল বলতে পারবেন। এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল দেশের শত্রুরা। তারা ইসলামের শত্রু। পরবর্তীতে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সফলতার পর এখন বিশ্বে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এই অবস্থান প্রশংসিত হয়েছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাই স্বোচ্চার হতে হবে সবাইকে।
পরিশেষে, বিইউবিটি’র উপাচার্য প্রফেসর মো. আবু সালেহ বলেন, ধর্ম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং অধিকার। সেই বিশ্বাস ও অনুভূতির জায়গাটিতে তারা আঘাত করছে ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের লোভে। যার সঙ্গে ধর্মের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। জঙ্গিবাদের ফলে ইসলামকে ক্ষতিগ্রস্থ করা হচ্ছে। তারা যে ইসলামের কত বড় শত্রু তা আমাদের বোঝা দরকার। ইসলামে বলা হয়েছে, সেই প্রকৃত মুসলমান যার কাছে অন্য ধর্মের মানুষের জান, মাল নিরাপদ থাকে।
সুচিন্তা’র গবেষণা সেলের পক্ষ থেকে আশরাফুল আলম শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মে জঙ্গিবাদ সমর্থন-অসমর্থন বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানটি স ালনা করেন আজ সারাবেলা’র সম্পাদক জব্বার হোসেন।

Top