চকবাজার ট্র্যাজেডি এবং শঙ্কিত চট্টগ্রাম বাসী।

IMG_20190209_191937.jpg

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

বাংলার আকাশে বাতাসে আজ আগুনে দগ্ধ লাশের গন্ধ। গত ২০ ফেব্রুয়ারি’১৯ রাত সাড়ে দশটার দিকে পুরান ঢাকার চকবাজারের চড়ুহাট্টা মোড় এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে কমপক্ষে ৭০ থেকে ৭৮ জন মানুষ মারা গেছেন। মহান ভাষা ও অমর শহীদ দিবসের শোকের মধ্যে মানুষ দেখলো আরকেটি শোকাবহ ঘটনা “চকবাজার ট্র্যাজেডি”। যাতে মারা যাওয়া ছাড়াও অনেকে মানুষ আগুনে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল সহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধনী আছে। তাঁদের আর্ত-চিৎকার আর স্বজনহারা এবং স্বজনদের খুঁজতে মানুষের গগনবিদারী আহাজারি মানুষকে শোকসন্তপ্ত করে তুলেছে। দগ্ধদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আগুনে পুড়ে পুরান ঢাকার চকবাজারের চড়ুহাট্টি এখন আতঙ্ক আর ভূতুড়ে জনপদে পরিণত হয়েছে। ঘনবসতি পূর্ণ এলাকা এবং বিভিন্ন রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের দোকান আর গুদাম থাকায় এমন নিষ্ঠুর, নির্মম আগুনের লেলিহান শিখা চোখের পলকে নিমিষেই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস ১০/১২ ঘণ্টার অবিরাম চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রাসায়নিক গুদাম যে কত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ তা পুরানো ঢাকার নিমতলীর মানুষ দেখেছিল ০৩ জুন ২০১০ সালে। সে সময় ১২৪ জন মানুষ মারা যায়। সে দুর্ঘটনার পর গঠিত সরকারি তদন্ত কমিটি তাঁদের প্রতিবেদনে ১৭টি সুপারিশ করেছিল যা বিগত আট বছরের বেশি সময় পার হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সেই নিমতলী থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরত্বে চড়ুহাট্টাতে ঘটলো আবারো ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। মানবিক বিপর্যয়, দগ্ধ মানুষের ও স্বজন হারানোদের করুণ আর্তি আর আহাজারি। নিমতলীর ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নিলে আজ দেশের এই মহা দুর্যোগ, প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো। আমাদের দেশ জাতি ও রাষ্ট্র কেউই অতীত থেকে কোনদিনই শিক্ষা নেয়না, নিতে চায়না। যদি রাজনীতিবিদরা, সমাজপতিরা অতীত থেকে শিক্ষা নিতো তবে দেশের চেহারা পাল্টে যেত এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক ও পারস্পরিক বন্ধন ও দেশের উন্নয়নেও অনেক পরিবর্তন আসতো। তবে চকবাজারে স্থানীয়দের মধ্যে বিরাট লোভ লালসা কাজ করেছে। পাশাপাশি তদারকী প্রতিষ্ঠান গুলির সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনাও সমানভাবে দায়ী। স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, সারা দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ এখানেই কিনতে আসেন যেহেতু এটি অনেক পুরানো ও প্রসিদ্ধ বাজার। পাশাপাশি এক হাজার বর্গফুটের একটি গুদামের জন্য সহজেই ১০ লক্ষ টাকা অগ্রীম এবং মাসে কমপক্ষে ২৫ হাজার ভাড়া পাওয়া যায়। এখানে ব্যবসা করে চার পাঁচ গুণ বেশী লাভ করা যায়। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন যে ভাবে বাতাসে ছড়িয়েছে তা কোন অতি দাহ্য গ্যাস বা রাসায়নিক ছাড়া সম্ভব নয়। আগুনের সূত্রপাত নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলছেন গ্যাস সিলিন্ডার থেকে কেউবা বলছেন ট্রান্সফরমার বিষ্পোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত। রাসায়নিককে আগুনের কারণ মানতে নারাজ এখানকার ব্যবসায়ীরা। তবে যেভাবেই হোক না কেন আগুন তো লেগেছেই। তবে আগুন অতি দ্রুত দাবানলের আকার ধারণের কারণ যে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ সে ব্যাপারে কারো বিতর্ক থাকা উচিৎ নয়। ফায়ার সার্ভিসের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মতে, সুগন্ধিগুলোই অতি দাহ্য রাসায়নিক আর সেখানে যদি সেগুলো ভরানোর ( রিফিল ) কারখানা থাকে, তাহলে তা আরও বিপজ্জনক। এদিকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি’১৯ তারিখ আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় পুড়ে যাওয়া ওয়াহেদ ম্যানশনের ভূগর্ভস্থ তলায় বিভিন্ন ধরণের বিপুল পরিমাণ অক্ষত রাসায়নিক পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞ এবং ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিমত অগ্নিকান্ডের সময় এসব রাসায়নিক আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। ফায়ার ব্রিগেড কর্মীদের পক্ষে এ আগুন সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না যতক্ষণ না এসব রাসায়নিক পুড়ে পুড়ে আপনাআপনিতেই নিঃশেষ হয়ে না যেতো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চকবাজার বাসী আরো ভয়াবহ, ভয়ংকর, মানব বিপর্যয়কারী অবস্থা থেকে বেঁচে গেছে বা রক্ষা পেয়েছে।
এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের কারণ হিসেবে গ্যাস সিলিন্ডারের কথা উঠে এসেছে। সেখানে কেউ কেউ বলছেন গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্পোরণের কারণে অগ্নি কান্ড ঘটেছে। যদিও এখানে পরিত্যক্ত গাড়ির সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার এবং খাবার দোকানের সিলিন্ডার , সিলিন্ডার রাখা এবং রান্নাঘর অক্ষত ছিল। গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্পোরিত হলে সেসবগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা। যদিও আশঙ্কাজনকহারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গাড়ির সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার এবং রান্নার এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্পোরিত হয়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটছে অহরহ। এদিকে চট্টগ্রামের রাজাখালীর ভেড়া মার্কেট বস্তিতে আগুন লেগে ৮ জন পরে আরও ১ জন সহ ৯ জন মানুষ জীবন্ত দগ্ধ হয়, ৪৭০ টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি’১৯ গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। অনেকে এটাকে নাশকতা বলেও সন্দেহ করছেন। এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি’১৯ খাগড়াছড়িতে গ্যাস সিলিন্ডারের গুদামে বিষ্পোরণে ৭ জন দগ্ধ হন। গুরুতর চারজনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সহযোগী এক পত্রিকার বরাতে জানা যায় চট্টগ্রামও বিশাল অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সমীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন মার্কেটের ৪১ টি স্থাপনা ভয়াবহ ঝুঁকিতে, ৯৭ ভাগ হাসপাতাল, ৭০ ভাগ বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, আঠারো তলা উচ্চতায় আগুন নেভানোর যন্তপাতি আছে, আগুন নেভানোর সক্ষমতা আছে তবে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রশস্ত রাস্তা নেই। নগরীকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রখেছে পানি স্বল্পতা। জানা যায় চট্টগ্রামে এক সময় লাখের মতো পুকুর, দিঘী, জলাশয় ছিল এখন যার হাতে গোণা কয়েকটির অস্থিত্ব আছে মাত্র। নগরীর দালানকোঠা নির্মাণের জন্য মাট ঘাট দখলের পাশাপাশি পুকুর, দিঘী, জলাশয় ভরাট করে ফেলায় পানির উৎস সংকুচিত হয়ে গেছে। পাশাপাশি রয়েছে গড়ির সিএনজি সিলিন্ডার এবং বাসাবাড়ির এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার। গাড়িগুলো বিশেষ করে সিএনজি অটোরিক্সা, পিকআপ, ভ্যান গাড়ি, যাত্রিবাহী বাস, মাইক্রো, কার, পণ্যবাহী ট্রাক লরি সবগুলো যেন এক একটি জ্বলন্ত অগ্নিবোমা বহন করছে। সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার যুক্ত সব গাড়ির সিলিন্ডার প্রতি বছর চেক করার কথা থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া অন্যগুলো বিশেষ করে সিএনজি, বাস, ট্রাক সহ অন্যান্য যানবাহনের সিলিন্ডার প্রতি বছর টেস্ট করছে কিনা তা আমরা জানিনা। কারণ হচ্ছে বিআরটিএ আর পুলিশ প্রশাসন তাঁদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব কতটুকু সততা, নৈতিকতা, সচেতনতা, ন্যস্ত দায়িত্ববোধ থেকে পালন করছে জানিনা। এখানে প্রচুর দুর্নীতির কথা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে দেখা যায়। পাশাপাশি জাতি প্রতিদিন দেশে প্রচুর সড়ক দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানীর ঘটনাও দেখছে। এতে বেশীরভাগ আনফিট ও লক্কড় জক্কড় গাড়ি, অদক্ষ, কিশোর ও লাইসেন্সবিহীন চালক এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার ত্রুটির কারণেই ঘটছে। অগ্নি এবং সড়ক সহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য কঠোর, সুষ্ঠু এবং নির্মোহভাবে আইন প্রয়োগ করা খুব জরুরী হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়নের কোন বিকল্প নেই। চট্টগ্রাম নগরী দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিকল্পনাহীন এবং অগোছালোভাবে গড়ে উঠা একটি শহর। যেমন আবাসিক এলাকায় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে গড়ে উঠেছে শিল্প কারখানা এলাকায় আবাসিক ভবন। যেখানে সেখানে ভুঁইফোড়ার মতো গড়ে উঠেছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ছোট বড় অনেক হাসপাতাল যার কারণে নগরে তীব্র জানযট লেগেই আছে। যদি কখনো আগুন লাগে তবে এসব এলাকার মানুষের কপালে যে কি ধরণের বিরাট, ভয়াবহ ও ভয়ংকর বিপর্যয় অপেক্ষা করে আছে তা কেউ জানে না। অত্যন্ত বেদনার বিষয় হচ্ছে, সরু গলি, রাস্তা বিহীন আবাসিক এলাকা বা বস্তিতে যদি আগুন লাগে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি অনেক সময় ঢুকতেও পারেনা। যেমন চকবাজার ট্রাজেডিতে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি অনেক জায়গায় ঢুকতে পারেনি। দূর থেকে পানি ছুড়তে হয়েছে আগুন নেভানোর জন্য। নগরীতে এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢুকা তো দূরের কথা চারজনে কাঁধে নিয়ে লাশ পর্যন্ত বেরুতে পারেনা। আমাদের ফায়ার ব্রিগেড সার্ভিসকে বিভিন্ন মার্কেট, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ছোট বড় সব হাসপাতাল সহ বিভিন্ন স্থাপনায়, সর্বপোরি বিভিন্ন শিল্প কারখানা এবং শিল্প কারখানা জোনে অগ্নিনির্বাপক যথাযথভাবে লাগানো এবং মেয়াদ ঠিক আছে কিনা তা যাছাই-বাছাইয়ের জন্য বিভিন্ন সংস্থার সাহায্য নিয়ে একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেয়া অতীব জরুরী। পাশাপাশি বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ এবং ট্র্যাফিক পুলিশদেরকে গাড়িতে লাগানো সিএনজি সিলিন্ডারগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ কিনা চেক করে দেখতে হবে। গাড়ির সিএনজি’র বিকল্প বের করা এবং জ্বলানী তেলের মূল্য ক্রয়ের সাথে সমন্বয় করে কামাতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। আন্তর্জাতিক মূল্য হিসেবে বাংলাদেশে জ্বালানী তেলের মূল্য অনেক বেশি। আমরা মনেপ্রাণে চাই চকবাজার ট্রাজেডির মতো চট্টগ্রাম সহ দেশের আর কোথাও যেন এধরণের করুণ, মর্মন্তুদ, মর্মস্পর্শী, হৃদয়বিদারক অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বা জানমালের কোন ক্ষয়ক্ষতি না হয়। আমাদের মনে রাখা উচিৎ মানুষের জীবন মোটেও মূল্যহীন নয়। তাছাড়া অস্বভাবিক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু দেশ ও জাতির কাছে কাম্য হতে পারে না।

Top