ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ

1550557561179_1531056542486blob.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী ;

নেশার জগতের রাজা হচ্ছে ইয়াবা। ইয়াবা সেবন করে নেশাগ্রস্থরা সপ্তম উকাশে উড়ে বেড়ায়। নিজের অর্থের পাশাপাশি শরীরের সর্বনাশ করে। সর্বনাশ ডেকে আনে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ আর জাতির। মাদক বিরোধী অভিযান চলছে, বন্দুক যুদ্ধে ব্যবসায়ীরা মারা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হচ্ছে তবুও থেমে নেই ইয়াবা ব্যবসা আর ইয়াবা পাচার। কেননা জীবনে যারা সৎতা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা, যোগ্যতা, অদম্য সাহস, নৈতিকতা, আর অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে, লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে জীবন যাপন না করে শর্টকাট রাস্তায় কম পুঁজিতে অতি দ্রুত ধনী, বড় লোক, সমাজপতি, জনপ্রতিনিধি হতে চায় তাঁদের কাছে ইয়াবা ব্যবসা অত্যন্ত লোভনীয় ও আকর্ষণীয়। দীর্ঘ সময় জীবন সংগ্রামে ব্যয় করে যা করা অসম্ভব কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা বানিয়ে ফেলা বা অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হওয়া অনেক অনেক সহজ। তাই এ ব্যবসার পেছনে সবাই লাইন ধরে ছুটে চলেছে। সমাজের উচ্চবিত্ত্ব, মধ্যবিত্ত্ব, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, মজুর, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজমিস্ত্রি, রিকশাচালক, খেলোয়াড়, গণমাধ্যম কর্মী, সমাজকর্মী, সমাজসেবক, পুলিশ, সেনা সদস্য,গাড়ির ড্রাইভার, হেল্পার, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি কে নেই এই তালিকায়। সমাজের সকল শ্রেণী পেশার অনেক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যেন অশুভ, নোংরা, মানব বিধ্বংসী ইয়াবা ব্যবসার প্রতিযোগীতায় নেমে পড়েছে। হালে ধর্মীয় শিক্ষক, মসজিদের ইমামা, মোয়াজ্জিন আলেম ওলেমারাও বাদ যাচ্ছে না এ তালিকা থেকে। আরও জানা যায়, সম্প্রতি সাপুড়ে, হিজড়া, কিশোর, নারী ও কাপড় ব্যবসায়ী সেজে ইয়াবা পাচারের সময় অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এক তথ্য থেকে জানা যায়, — “ইয়াবা এক সময় সর্দি ও নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার এবং ওজন কমানোর ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো কিছু কিছু দেশে যার মূল উপাদান হচ্ছে মেথঅ্যামফিটামিন। এটির প্রচণ্ড উত্তেজক ক্ষমতা আছে বলে এটি যৌন উত্তেজক, ক্লান্তি দূর করে, ঘুম কমিয়ে দেয়, ক্ষুধা কমিয়ে দিয়ে স্লিম হওয়ার ঔষধ হিসেবেও ব্যবহার হয়। সেবনের পর ইয়াবার আনন্দ আর উত্তেজনা সাময়িকভাবে জীবনের সব যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিয়ে।নিয়ে যায় স্বপ্নের ভুবনে। ধীরে ধীরে আসক্ত ব্যক্তিটির ক্ষণস্থায়ী আনন্দ নিয়ে যায় ক্ষতিকর নানান রোগের দিকে। আর ডোজ বাড়াতে হয় বলে তা নিয়ে যায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এবং এতে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক রোগ ও উপসর্গ দেখা দেয়। ইয়াবা সেবনের ফলে তাঁর স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন হয় এবং ধীরে ধীরে হেপাটাইটিস বি, সি ও এইডসের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পর্যন্ত পতিত হয় অনেকেই। তাছাড়া এ মাদক সেবীদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়, অনেকের আবার দৃষ্টি শক্তি কমে যায় আবার অনেকের ঘটে স্মৃতিভ্রম। এরা নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যু মুখে যেমন পতিত হয়”।

অপরদিকে “ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের দিন ঠিক করা হয়েছে ১৬ ফেব্রুয়ারি’১৯। ওই দিন প্রায় ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করেন। এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নেশার ছোবলে পড়ে দেশের তরুণ, যুবক, শিক্ষার্থী সহ নানান পেশার নানান বয়সের মানুষেদের অনেকেই মৃত্য বরণ করেছে, অনেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়েছে, অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে আজ পথের ভিখারি হয়েছে, হয়েছে ভিটেমাঠি ছাড়া। পাশাপাশি এসব মাদক ব্যবসায়ীরা হয়েছে আংগুল ফুলে কলাগাছ। কোটি কোটি টাকার ও সম্পদের মালিক হয়েছে। অনেকেই সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি বনে গেছে শুধু মাত্র অর্থ বিত্ত্বের জন্য অন্যকোন যোগ্যতা, দক্ষতা, সক্ষমতা, শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও। দেশকে নেশার জগতে পরিণত করেছে জঘন্য ইয়াবা কারবারীরা। দেশের বিভিন্ন পেশার মানুষকে, যুব সমাজকে ভয়ংকর নেশার জগতে হাত ধরে টেনে এনেছে এই দুষ্টু চক্র। সমাজের ও দেশের এই মুনাফাখোর দুশমনরা মাদকাসক্তি বা নেশার ভয়ংকর এবং ভয়াবহ ছোবলে দেশের যুব সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে এক পঙ্কিল আর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। সমাজকে ব্যাধিগ্রস্থ করেছে। করেছে কূলষিত। মানুষের মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য এরাই দায়ী। যুব সমাজকে বিভ্রান্ত, দিক ভ্রষ্ট, নীতিভ্রষ্ট করে যুব শক্তির অধঃপতন ঘটিয়েছে। দেশে খুন খারবি সহ নানান অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের কারণেই। সরকার আগের মেয়াদ থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক জায়গায় মাদক বিরোধীদের সাথে সংঘর্ষ ঘটেছে, মাদক ব্যসায়ীদের গ্রেফতার করা হয়েছে, অনেক জায়গায় সংঘর্ষে মাদক ব্যবসায়ীরা নিহতও হয়েছে। বর্তমান সরকার নতুন মেয়াদে সরকার গঠনের পর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদক বিরোধী অভিযান চলমান থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং এই অভিযান আরো জোড়ালে করা হবে বলে হুশিয়ারী দিয়েছেন। এতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বা ক্রস ফায়ারে নিহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে অনেক মাদক ব্যবসায়ী, গডফাদারদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তার আঁচ করতে পেরেছে যে বর্তমান নির্বাচিত সরকার দেশ, জাতি আর যুব সমাজকে রক্ষার তাগিদে এদেরকে আর কোন ছাড় দেয়া হবেনা। তাই তারা লাইন ধরে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাপারে সদাশয় সরকারকে প্রচলিত আইনে অথবা নতুন আইন করে ইতোমধ্যে প্রেফতারকৃত এবং আত্মসমর্পণকারী এসব গডফাদার, রাঘববোয়াল, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবৈধভাবে অর্জিত সকল অর্থ, স্থাবর, অস্থাবর সম্পদ ক্রোক করতে হবে। এর থেকে বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্র, হাসপাতাল গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি তা থেকে বিভিন্ন কারিগরী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, দেশের অর্থনৈতিক খাতকে স্বনির্ভর করে তোলা, বিভিন্ন শিল্প কারখানা গড়ে তোলে মাদকাসক্ত বা বেকার যুব সমাজের বিভিন্নমুখী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আমাদের প্রত্যাশা এসব মাদক ব্যবসায়ীদের তাঁদের ভুল শুধরানোর সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি তাঁদের থেকে জব্দকৃত সম্পদ বা অর্থ দিয়ে দেশের শিল্প কল কারখানা প্রতিষ্ঠা করে মাদকাসক্ত এবং দেশের বেকার যুব সমাজের জন্য কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করার সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ হবে দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক। পাশাপাশি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে দেশের রাস্তাঘাট, সেতু কালভার্ট নির্মাণ বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। বিভিন্ন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য বাস দেয়া যেতে পারে। দেশের জেলা বা উপজেলা ভিত্তক হাসপাতালে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র খোলার জন্যেও এই অর্থ ব্যবহার করা যায়। মোটা দাগে বলা যায় এসব অবৈধ অর্থ ও সম্পদ দেশের মানুষের উন্নয়নে, জনকল্যাণে এবং মঙ্গলে লাগানোটাই প্রথম কথা। জাতির প্রত্যাশা, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের উপার্জিত অবৈধ অর্থ সম্পদ ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত করা খুব জরুরী যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর মাদক ব্যবসায় জড়িত বা উৎসাহী হয়ে না উঠে। এদের অর্থের ভীত ভেংগে চুরমার হয়ে গেলে এরা আর পূর্বের ইয়াবা ব্যবসায় ফিরে যেতে পারবে না। দেশের আর্থ সামাজিক উন্নতি, উন্নয়নের জন্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবৈধ পথে অর্জিত অর্থ আর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং দেশের উন্নয়নে লাগানো এখন সময়ের দাবী।

Top