বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নয়,যেন এক বিশ্ব বেহায়া দিবস॥ তরুন-তরুনীদের সর্বনাশা দিবস

2-5.jpg

মাসুদুর রহমান-

১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালন করবেন অনেকেই। একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ ফেব্রুয়ারি অশ্লীল, বেহায়াপনা প্রেম এবং অনুরাগের মধ্যে উদযাপিত করা হয়। এই দিনে মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ফুল, চিঠি,কার্ড, গহনা প্রভৃতি উপহার প্রদান করে দিনটি উদযাপন করে এবং বিজাতীয় অপসংস্কৃতির উচ্ছৃংখল জীবনের সাথে গা ভাসিয়ে দেয়। ভালোবাসার জন্য মানুষ মৃত্যুকে তুচ্ছ করে। রাজা সিংহাসন ত্যাগ করে হাসিমুখে প্রেমিকার হাত ধরে। কিন্তু প্রত্যেক মু’মিনের ভালোবাসার একমাত্র প্রধান কেন্দ্র হলো মহান আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয় রাসূল (সা.)। পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ইত্যাদি সকলের প্রতি ভালোবাসার মূল ভিত্তি হবে আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসার পরিপূর্ণতার জন্য। আজকাল অনেক মুসলিমই প্রকৃত বিষয়টি না জেনে নানা রকম বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা করে থাকে। তারা এটি খুবই কম উপলব্ধি করে যে, তারা যা নির্দোষ বিনোদন হিসেবে করে তার শিকড় আসলে পৌত্তলিকতায়, যা তারা লালন করে তা কুসংস্কার থেকেই জন্ম। আজকের প্রজন্মের কাছে এটি সবচেয়ে কাঙ্খিত দিন। দুনিয়াজুড়ে তারা এ দিনটিকে অত্যন্ত আগ্রহ ও আনন্দের সঙ্গে পালন করে আসছে। ভালবাসা নাম করে যে সব তরুণ তরুণীরা এ দিনটি কে ভালবাসার নামে নোংরামিতে পরিনিত করে, তাদের কে বলছি বিশ্ব বেহায়া, নির্লজ্জ, গজব দিবস ভালবাসার কোন সীমাবদ্ধতা নেই। ১৪ ফেব্রুয়ারী হলো হাজারো মেয়ে নিরবে ধর্ষণ হয়ে বাসায় ফেরার দিনমাত্র। ঐদিন দেশের সকল পার্ক/বিনোদন কেন্দ্রগুলি যদি বন্ধ ঘোষণা করা হয় তাহলে হাজারো তরুণ-তরুণী নিরব ধর্ষণ থেকে রক্ষা পেতো। তারুণ্যের অনাবিল আনন্দ আর বিশুদ্ধ উচ্ছ্বাসে সারাবিশ্বের মতো ভ্যালেন্টাইনস ডে ক্রেজ আমাদের দেশেও দিন দিন বিপদজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কী এই ভ্যালেন্টাইনস ডে? কীভাবে তার উৎপত্তি? কেনইবা একে ঘিরে ভালোবাসা উৎসবের আহ্বান?
‘ভালবাসা দিবস’কে কেন্দ্র করে বাজার ছেয়ে যাচ্ছে নানাবিধ হাল ফ্যাশনের উপহারে। পার্কগুলোতে চলছে ধোয়ামোছা। রেস্তোরাঁগুলো সাজছে নতুন সাজে। পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরেই ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-কে ঘিরে সাজ সাজ রব। এমনকি ৯৫ ভাগ মুসলমানের এ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও উচ্ছৃংখল মুসলিম ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়িরাও এ অশ্লীল স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে থাকে। এতে করে ভেঙ্গে পড়েছে সামাজিক বন্ধন, পারস্পারিক সহানুভূতি, সৌহার্দ্যতা ও পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ। হৈ চৈ, উন্মাদনা, রাঙায় মোড়া ঝলমলে উপহার সামগ্রী, নামি রেস্তোরাঁয় ‘ক্যান্ডেল লাইট ডিনার’কে ঘিরে প্রেমিক যুগলের চোখেমুখে এখন বিরাট উত্তেজনা। জন্মের পর থেকেই মানুষের বেড়ে উঠা এই ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই। আর তাই ভালোবাসার দিনটিকে নিয়ে সকলের ভাবনাটাও থাকে বিশেষ। এই দিনটির শুরুর গল্পটাও বেশ রঙিন। ১৯৯৩ সালের দিকে আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবসের আবির্ভাব ঘটে। সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব শফিক রেহমান পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। পাশ্চাত্যের রীতিনীতিতে তিনি ছিলেন অভ্যন্ত। দেশে ফিরে তিনিই ভালোবাসা দিবসের শুরুটি করেন। এ নিয়ে অনেক ধরনের মতবিরোধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত শফিক রেহমানের চিন্তাটি নতুন প্রজন্মকে বেশি আকর্ষণ করে। সে থেকে এই আমাদের দেশে দিনটির শুরু। ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’র ইতিহাস প্রাচীন। এর উৎস হচ্ছে ১৭শ’ বছর আগের পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত ‘আধ্যাত্মিক ভালোবাসা’র উৎসব। এ পৌত্তলিক উৎসবের সাথে কিছু কল্পকাহিনী জড়িত ছিল, যা পরবর্তীতে রোমীয় খৃস্টানদের মাঝেও প্রচলিত হয়। এ সমস্ত কল্প-কাহিনীর অন্যতম হচ্ছে, এ দিনে পৌত্তলিক (অগ্নি উপাসক) রোমের পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত রোমিউলাস নামক জনৈক ব্যক্তি একদা নেকড়ের দুধ পান করায় অসীম শক্তি ও জ্ঞানের অধিকারী হয়ে প্রাচীন রোমের প্রতিষ্ঠা করেন। রোমানরা এ পৌরাণিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে ১৪ ফেব্রুয়ারি উৎসব পালন করত। সবচেয়ে যে জঘন্য কাজ এ দিনে করা হয়, তা হ’ল ১৪ ফেব্রুয়ারি মিলনাকাক্সক্ষী অসংখ্য যুগল সবচেয়ে বেশী সময় চুম্বনাবদ্ধ হয়ে থাকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। আবার কোথাও কোথাও চুম্বনাবদ্ধ হয়ে ৫ মিনিট অতিবাহিত করে ঐ দিনের অন্যান্য প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে। ভালবাসায় মাতোয়ারা থাকে ভালোবাসা দিবসে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলো। অনেক তরুণ দম্পতিও হাজির হয় প্রেমকুঞ্জগুলোতে। রাজধানী সহ বিভিন্ন হোটেলে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ উদযাপন উপলক্ষে হোটেলের বলরুমে বসে তারুণ্যের মিলন মেলা। নানা রঙের বেলুন আর অসংখ্য ফুলে স্বপ্নিল করা হয় বলরুমের অভ্যন্তর। জম্পেশ অনুষ্ঠানের সূচিতে থাকে লাইভ ব্যান্ড কনসার্ট, ডেলিশাস ডিনার এবং উদ্দাম নাচ। তারা পাঁচতারা হোটেলে, পার্কে, উদ্যানে, লেকপাড়ে, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসে ভালোবাসা বিলাতে, অথচ তাদের নিজেদের ঘর-সংসারে ভালোবাসা নেই! আর ধীরে ধীরে সমাজে বৃদ্ধি পাচ্ছে নির্লজ্জতা। অন্যদিকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের বিধ্বংসী কর্মকান্ডে মানুষ ক্রমশ নৈতিক শক্তি ও সঠিক চেতনা হারিয়ে ফেলছে। আমাদের বাংলাদেশী ভ্যালেন্টাইনরা যাদের অনুকরণে এ দিবস পালন করে, তাদের ভালোবাসা জীবনজ্বালা আর জীবন জটিলতার নাম। মা-বাবা, ভাই-বোন হারাবার নাম; নৈতিকতার বন্ধন মুক্ত হওয়ার নাম। তাদের ভালোবাসার পরিণতি ‘ধর ছাড়’ আর ‘ছাড় ধর’ নতুন নতুন সঙ্গী। বছর ঘুরে ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি আমাদের ভালোবাসায় রাঙিয়ে গেলেও, ভালোবাসা কিন্তু প্রতিদিনের। জীবনের গতি নির্ধারণ করে ভালোবাসা। মানুষ বেঁচে থাকে ভালোবাসায়।

————–

লেখাটি লিখেছেন ঢাকা তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান । তিনি জামালপুর জেলার কৃতি সন্তান ও পেশায় সাংবাদিক।।

Top