ঘুরে আসুন; আপনার অপেক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রাম

received_1387852338015680.jpeg

জাহেদুর রহমান সোহাগ,স্টাফ রিপোর্টার;চট্টগ্রাম

পাহাড়; সামনে নীল জলরাশি তারপর আবার পাহাড় ।পাহাড় ছূড়া থেকে ভোর প্রভাতে উঁকি দিয়ে দিবসের সূচনা করছে সূর্য মামা । নীল জলরাশি রুপান্তরিত হয়ে মৃদ্যু রঞ্জিত। পাহাড়ের সবুজতা আর রঞ্জিত জলরাশি মনে হতে পারে কৃত্তিম বাংলার পতাকা । কেমন লাগবে আপনার । কখনো কি হয়েছে এরকম। ব্যস্ততা হয়তো আমাদের এমন দিন নাও দিতে পারে ; তবে মন্দ কিসে জলদি যদি চলে আসুন সবুজের অরণ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই কিংবা রাঙ্গামাটিতে। উপভোগ করুন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে ছোট বড় পাহাড়, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, ঝর্ণা আর জলের সাথে সবুজের মিতালী। একদিকে যেমন পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্ভার তেমনি লেকের অথৈ জলে রয়েছে বহু প্রজাতির মাছ ও অফুরন্ত জীববৈচিত্র। সেই সাথে তৈরী করে নিতে পারেন কল্পিত দৃশ্যের সাথে নিজের প্রতিচ্ছবি ।

আসবেনতো ! আাসার আগে জেনে নিন নীল জলরাশির বুকে দন্ডায়মান পাহাড়ের আড়ালে থাকা সেই জনগোষ্ঠির ইতিহাস । যাদের কল্যানে আজকের কাপ্তাই ,রাঙ্গামাটি অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম । ও ভুলে গেছি ; তারাতো ঘর ছেড়েছে , কেউতো দেশও ছেড়েছে । কেউ কেউ দুমুটো আহারের সন্ধানে ছুটেছে একপ্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে।গত ৫৭বছরে এই কান্নার গল্প তরুন প্রজন্মের ইতিহাস হয়ে গেলো। নামেমাত্র বেঁচে আছে গুঁটিকয়েক সাক্ষী । কিন্তু আজকের বাংলাদেশ তাদের ত্যাগের একটি অংশে গঠিত অনায়াসে বলা যায় । তাইতো একটু না হয় পুরাবিত্তি করি সেই ইতিহাসের ;

সালটা ১৯৫৬ইং। ক্ষমতায় পাকিস্তান সরকার। আমেরকিার অর্থায়নে শুরু হয় বাঁধের নির্মাণ কাজ। ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট যৌথভাবে বাঁধটি নির্মাণ করে। বাঁধটির উচ্চতা ৫৪.৭ মি এবং ৬৭০.৬ মিটার দীর্ঘ । এ বাঁধের পাশে ১৬টি জলকপাট সংযুক্ত ৭৪৫ ফুট দীর্ঘ একটি পানি নির্গমন পথ বা স্প্রিলওয়ে রাখা হয়েছে। এ স্প্রিলওয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক ফিট পানি নির্গমন করতে পারে। এ প্রকল্পের জন্য তখন প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হলেও পরে তা ৪৮ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ছয় বছরের ব্যবধানে ১৯৬২ শেষ হয় বাঁধের নির্মাণ কাজ।

প্রথমে ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ১ ও ২ নম্বর ইউনিট স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার কিলোওয়াট। ৫ বছর পরে ১৯৬৯ সালের ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিটের কাজ শুরু হয়ে ১৯৮৭সালে আরও দুটি ইউনিট স্থাপন করে বর্তমানে পাঁচটি ইউনিটে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট।

ইতিহাসটা এখান থেকে শুরু। দেশ এখন উন্নতির দিকে । কথা ছিল পাহাড়ির ঘরে ঘরে বিদ্যুতের বাতি জ্বলবে। কিন্তু ৫৬ বছর পরেও বিদ্যুতের আলো পৌঁছায় নি ৩০% ঘরে। পাহাড়ের চাহিদা না মিটিয়ে চলে আসে শহরের দিকে। এই কাপ্তাই বাঁধে লুকিয়ে আছে লক্ষাধিক পাহাড়ির নিরব কান্না। প্রায় ৫৪ হাজার একর প্রথম শ্রেণীর ধানী জমি,যা মোট চাষযোগ্য জমির ৪০% পানির নীচে চিরদিনের মত হারিয়ে গেল। লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্ত হলো। উদ্বাস্তদের পূনর্বাসনের জন্য কাচালং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি অংশ উন্মুক্ত করার পরও যোগাড় করা গেল মাত্র ২০ হাজার একর জমি, তাও নিম্ন মানের। এই পরিমাণ জমির সাহায্যে পানির নীচে তলিয়ে যাওয়া জমির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্রতিস্থাপন করা গেছে। প্রতি পরিবারের জন্য বরাদ্দ হলো ৩ একর জমি যা তাদের পুর্বের জমির পরিমাণের তুলনায় অর্ধেক । ক্ষতি পূরণের জন্য নির্ধারিত ছিল ৫১ মিলিয়ন ডলার কিন্তু প্রদত্ত ক্ষতিপূরণের পরিমান ছিল ২.৬ মিলিয়ন ডলার। জনশ্রুতি আছে, প্রায় এক তৃতীয়াংশ উদ্বাস্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত থেকেছে।

গল্পটা আর দীর্ঘ করিনা । কাপ্তাই বাঁধ ঘিড়ে বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়েছে সম্ভাবময় পর্যটন শিল্প হিসেবে। মনোমুগদ্ধকর অপুরূপ সৌন্দয্যে হারিয়ে যার চোখ। জেনে নেওয়া যাক কয়েকটি পার্কের কথা যেগুলো সৃষ্টি ও বিস্তার কাপ্তাই হ্রদকে ঘিরে।

ঝুলন্ত সেতু : পর্যটন কর্পোরেশনকে পাঁচ টাকা দিয়ে রাঙ্গামাটি শহরের প্রধান আকর্ষন ঝুলন্ত সেতু দেখতে হবে ।সাধারণত রাঙ্গামাটি গিয়ে ঝুলন্ত সেতু না দেখে ফেরত আসেন এমন পর্যটক পাওয়া দুষ্কর । রাঙ্গামাটি শহরের শেষ প্রান্তে কাপ্তাই লেকের একাংশে ৩৩৫ফুট লম্বা এই ব্রিজটি পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় স্পট । এ সেতুকে বলা হয় ‘ ঝুসনড়ষ ড়ভ জধহমধসধঃর’ । নয়নাতিরাম- বহুরঙা এই সেতুটি দুইটি বিচ্ছিন্ন পাহাড়ের মধ্যে গড়ে দিয়েছে হৃদ্দিক সম্পর্ক । সেতুটি পারাপারের সময় সৃষ্ট কাঁপুনি আপনাকে এনে দিবে ভিন্ন দ্যোতনা ।এখানে দাঁড়িয়েই কাপ্তাই হৃদের মনোরম দৃশ্য অবলোকন করতে পারবেন।ওপারেই রয়েছে অধিবাসি গ্রাম । ইচ্চে হলে দেখতে পারেন আদিবাসী জীবনযাপনের ক্ষয়িষ্ণু চালচিত্র।

ডিসি বাংলো
: রাঙ্গামাটি শহরের জিরো পয়েন্টে কর্ণফুলী হ্রদের গা ঘেঁষে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলো। সংযোগ সড়ক ছাড়া বাংলোর তিনদিকেই ঘিরে রেখেছে হ্রদের বির্তীর্ণ জলরাশি। বাংলোর পাশে ছোট টিলার উপরে রয়েছে একটি বাতিঘর ও কোচপানা নামক ছাউনী, যা সেতু দ্বারা বাংলোর সঙ্গে সংযুক্ত। সেতু এবং ছাউনী থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীরা অকাতরে হ্রদের রূপ-সুধা অবগাহণ করতে পারে। রাঙামাটি শহরের যে কোনো স্থান হতে অটোরিকশাতে এখানে আসা যায়। তবে বাংলো এলাকায় প্রবেশের জন্য অনুমতি আবশ্যক।

সুবলং জলপ্রপাত: হাড়ি ঝরনার শীতল জলধারার আকর্ষণ বোধ করে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণি। সুবলং ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব নৈসর্গিক সৃষ্টি। এটি রাঙামাটির বরকল উপজেলায় অবস্থিত। সুবলং ঝরনা ৩০০ ফুট উঁচু। বর্ষাকালে জলধারার অবিরাম পতনে সৃষ্ট ধ্বনি সবাইকে কাছে টানে।

টুক টুক ইকো ভিলেজ: হৃদে দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অতিথির জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি রেস্তোরায় রকমারি খাবারের স্বাদ। কাঠ এবং বাঁশের কারুকাজে তৈরি এ রেস্তোরায় দেশিয় ও পাহাড়ি মজাদার সব খাবার-দাবার পাওয়া যাবে। ৫০ একর জায়গা জুড়ে বহু টিলা-উপটিলায় পুরো ইকো ভিলেজটিতে সুদৃশ্য বেশ কয়েকটি কাঠের কটেজ। জানালার ফাঁক গলিয়ে দূরে পাহাড়ের ঢালে কাপ্তাইয়ের পানিতে চাঁদের প্রতিচ্ছবি অসাধারণ। রাতগভীরে বন-বনানী থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকা, নাম জানা-অজানা নিশাচর পশু-পাখির বিচিত্র ডাকে অজানা রাজ্য এসে সামনে দাঁড়ায়। আছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

লেক ভিউ আইল্যান্ড
: সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেখানে তৈরি করা হয়ছে দৃষ্টিনন্দন কটেজ। নাগরিক কোলাহল ছেড়ে আপনি ইচ্ছে করলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ঘুরে আসতে সেখানে।নৌকা নিয়ে হ্রদের পানিতে ঘুরতে বের হলে চোখে পড়বে পাহাড়ি টিলার গায়ে বড় আকারের ইংরেজি অক্ষরে লেখা ‘লেক ভিউ আইল্যান্ড’। পানি থেকে টিলার উপরে যাওয়া ইট কংক্রিটের তৈরি সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই দেখা মিলবে চারপাশে সবুজ গাছে ঘেরা কটেজ। নামকরণ হয়েছে ‘রিসোর্ট কর্ণফুলী’। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কিংবা সাধারণ যেকোনো কটেজে থাকা যাবে ।পাশাপাশি দুটি টিলার চার একরের অধিক এলাকা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে পর্যটন এলাকাটি। ইয়েলো ও অরেঞ্জ জোন নামে দুটি টিলায় শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়ছে কিডস কর্নার। রয়েছে গাছের উপর মাচাংঘর (ট্রি হাউস)। একটি মাচাং থেকে অন্য মাচাংয়ে যেতে তৈরি করা হয়েছে ঝুলন্ত সেতু। শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে অ্যাডভেঞ্চার পার্ক।লেক ভিউ আইল্যান্ড ছাড়াও কাপ্তাই হ্রদের ঐতিহাসিক বাঁধের সাথে লাগোয়া টিলায় রয়েছে ‘হিলটপ রিসোর্ট’ নামে একটি কটেজ। সেখানেও থাকা যাবে। হিলটপের জানালা দিয়ে দেখা যাবে কাপ্তাই বাঁধের স্লুইস গেট, কাপ্তাই বাঁধ আর হ্রদের জলরাশি। ইচ্ছে করলে রিসোর্টের পাশে সুইমিংপুলে ডুব দেওয়া যাবে।

লেকশোর রিসোর্ট : সুইমিং পুলের সামনেই রয়েছে বিশাল কাপ্তাই লেক। পূর্বে মোটা গ্লাস দিয়ে সুইমিং পুলের পানি ধরে রাখা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে সুইমিং পুলের পানি গড়িয়ে কাপ্তাই লেকে পড়ছে। আসলে পানি গড়িয়ে সুইমিং পুলের পাশেই নির্মিত রিজার্ভারে জমা হচ্ছে। সেই পানি আবার সুইমিং পুলে এসে পড়ছে। সুইমিং পুলের নিচে সাদা মার্বেল পাথর থাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পানির ঝিলিক চোখে পড়বে। পানির নিচে রংবেরঙের বাতি রয়েছে। রাতে বাতির আলোর মূর্চ্ছনা যে কাউকে মুগ্ধ করবে। সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত যে কোন সময় সুইমিং পুলে এসে আনন্দ উপভোগ করা যাবে। চতুর্দিকে সেনাবাহিনী পরিবেষ্টিত হওয়ায় শতভাগ নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে থাকবে সুইমিং পুলটি।

লোভ সামলাতে পারছেন না , তবে জেনে নিন কিভাবে যাবেন ।ঢাকার সায়েদাবাদ কিংবা কমলাপুর থেকে বিভিন্ন মানের বাসে করে সরাসরি কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি যাওয়া যায় এক্ষেত্রে প্রায় ৭-৮ ঘন্টা সময় লাগে।এছাড়া আপনি চাইলে চট্টগ্রাম থেকেও কাপ্তাই যেতে পারেন । বদ্দারহাট বাসস্ট্যন্ট থেকে প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর অন্তর কাপ্তাই উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায় ,ভাড়া ৬৫ টাকা, সময় লাগবে ২ঘন্টার মত।চট্টগ্রাম অক্সিজেন হতে রাঙ্গামাটি যেতে পারেন বাসে কিংবা অটোরিক্সায় ভাড়া হবে ৮০-১২০টাকা।রাঙ্গামাটি আসাম বস্তি হয়ে ঘন্টা খানেক অটোরিক্সা চড়ে আসতে পারেন কাপ্তাই।

দেরি কেন , চলে আসুন । উপভোগ করুন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে ছোট বড় পাহাড়, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, ঝর্ণা আর জলের সাথে সবুজের মিতালী।
আপনার অপেক্ষায় ; স্বাগত জানাতে প্রস্তুুত পার্বত্য চট্টগ্রাম ।

Top