বিবাহ বিচ্ছেদ কোন সমাধান নয়–জুয়েল মৃধা

50548285_597012090743648_3304363901272981504_n.jpg

————————-
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের একটা বয়স আছে যখন কোন চিন্তা ছাড়াই বিবাহ করতে পারে।সে বয়স পেরোলে বিবাহ করতে দুঃসাহসিকতার দরকার হয়।কথাটা খুুব বাস্তব ও যৌক্তিক।

বিবাহ-বিচ্ছেদ কোন স্বাভাবিক ঘটনা না:-
বিয়ে এবং ডিভোর্স শব্দ দুটি পাশাপাশি শুনে অভ্যস্ত হলেও একটি আরেকটির সাথে সংঘর্ষিক।অতিরিক্ত রাগ,দ্রুত সিন্ধান্ত নেয়া,অবিশ্বাস, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না ভাবা ইত্যাদি কারনে স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। তবে এর সাথে আমি আরেকটি বিষয় যুক্ত করবো। সেটা হলো ছেলে মেয়ের অনুমিত না নিয়ে বা ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়া। বর্তমানে সবারই একটা না একটা সম্পর্ক থাকে। কেউ সম্পর্কটাকে ভবিষ্যৎ মনে করেন। আবার কেউ বা এটাকে ভবিষ্যৎ মনে করে না। তবে যারা সম্পর্কটাকে ভবিষ্যৎ মনে করেন। তাদের ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকগন ছেলে-মেয়েদের সম্পর্ক মেনে না নিয়ে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়ে দিলে।সেই বিয়ে বেশিদিন না টিকার সম্ভাবনা থাকে।অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে তার বিয়েকে মেনে নিতে পারে না।অর্থাৎ তারা স্বামী-স্ত্রীর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না।ফলে একটা সময়পর তারা তাদের সম্পর্কের ইতি টানেন। আবার অনেকেই আত্ম-হননের পথ বেছে নেন।যা বর্তমানে দিনদিন বেড়েই চলেছে। তাহলে কি আমাদের কি উচিৎ না ছেলে-মেয়েদের কথা চিন্তা করে, তাদের ইচ্ছা কে প্রাধান্য দেওয়া বা তাদেরকে বাস্তবতা কি সেটা বুঝানো।কিন্তু বিয়ে দেওয়াটা কোন সমাধান না। এর ফলে তিনটি জীবন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পশ্চিমাদের পাশাপাশি বাংলাদেশেওও বিগত কয়েক বছরে ডিভোর্সরে সংখ্যা কয়েকগুন বেড়ে গেছে। পারিবারিক বিয়ে হোক বা প্রেম করে উভয় ক্ষেত্রেই ডিভোর্সেরর পরিমাণ আশঙ্কাজনক। রেস্টুরেন্টে বসে কয়েকদিন আড্ডা দেওয়া,কয়েক ঘন্টার প্রেমালাপ বা কয়েকদিনের ফোনালাপ বা সপ্তাহে দু’দিন ঘোরাঘুরি করা। আর বিয়ের পর এক ছাদের নিচে থাকার মধ্যে বিস্তার ফারাক রয়েছে। তাই যতই পূর্ব পরিচিত হোকনা কেন তাকে বিয়ের পরই গভীরভাবে চেনা যায়। দাম্পত্য জীবনে যারা একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়,সঙ্গীর উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তারা সুখী হতে পারে না। অন্যদিকে পারিবারিকভাবে হওয়া বিয়ের ক্ষেত্রে দুজন অপরিচিত মানুষের স্বভাবগত পার্থক্য থাকে,পূর্বের প্রেমের সম্পর্ক,সত্য গোপন করা,সন্দেহ প্রবনতা,বোঝা পড়ার অভাব,অনীহা বা শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা থাকার ফলেও বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। তবে প্রেমের বিয়েতেই বেশি ডিভোর্স হয়ে থাকে। কারন তারা বাস্তবতা না বুঝে, একে অপরকে ভালো করে না জেনেই বিয়ে করে ফেলে।কিন্তু বিয়ের পর বাস্তবতা সামনে আসার পর তারা আর একসাথে থাকতে পারে না।তবে আমাদের জীবনের যান্ত্রিকতা ও ব্যস্ততা বাড়ার সাথে সাথে বিবাহ-বিচ্ছেদের সংখ্যা যেন বেড়েই চলেছে।শিক্ষা ও সচেতনতার হার বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে কি আমাদের সম্পর্কের বন্ধনগুলো হালকা হয়ে যাচ্ছে। যা আমাদের শিক্ষা ও সচেতনতার বিরুদ্ধে চলে যায়। কেননা শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে আমাদের সম্পর্কটার বন্ধন আরো অটুট হওয়ার কথা।কিন্তু তা হচ্ছে না।
কখনো একবার ভেবে দেখেছেন কি? এমন কি ঘটেছিল আপনাদের মধ্যে যার জন্য এতদিনের সম্পর্কের ইতি টানতে হলো? কি জন্য নিজের সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ টা নষ্ট করলেন? তার স্বাভাবিক ভাবে বেচে থাকার অধিকারটা হনন করলেন।কখনও কি ভেবেছিলেন একটা ডিভোর্সি পরিবারের সন্তানেরা কি ভাবে বেচে থাকে। কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়? হয়তো কখনও চিন্তা করেন নাই উপলদ্ধিও করেন না। যদি আপনার সাথে এমনটা হতো তাহলে হয়তো উপলদ্ধি করতে পারতেন।

চলুন ডিভোর্স সংত্রান্ত জটিলতার কারন ও সমাধান নিয়ে কথা বলা যাক:
ডিভোর্স এর কারন গুলো জানা থাকলে ডিভোর্সের দিকে ধীরে ধীরে এগোনো সম্পর্কগুলো চাইলে হয়তো তাদের সম্পর্কটাকে রক্ষা করতে পারবেন।কারনগুলো হলো:
১| টিনএজে কিংবা ৩২ বছরের পর বিয়ে করা: যারা ২৭-৩০এর মধ্যে বিয়ে করেন তাদের দাম্পত্য জীবন তুলনামূলক বেশি স্থায়ী হয়ে থাকে।অন্যদিকে যারা টিনএজে (১৩-১৯) বা ৩২+ বয়সে বিয়ে করেন। তাদের ডিভোর্স বেশি হয়। কম বয়সে বিবাহ করা আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের বেশি ফারাক থাকার ফলেও ডিভোর্স হয়।
২|স্বামীর ফুল টাইম জব না থাকা: ১৯৭৫ সালের পর হওয়া বিয়ে গুলোর উপর গবেষনা করে অ্যালেকজান্ডার কিলওয়্যাল্ড দেখেছেন,যাদের স্বামী ফুল টাইম কাজ করে তাদের ডিভোর্স এর হার ২.৫% আর যাদের ফুল টাইম কাজ নাই তাদের ডিভোর্সের হার ৩.৩%
৩|সঙ্গীর প্রতি নেতিবাচক ভাব প্রদর্শন: মনোবিজ্ঞানীরা এর পিছনে চারটি কারনকে দায়ী করেছেন। যথা: ১| সঙ্গীকে অবজ্ঞা করা ২|সঙ্গীর স্বভাব-চরিত্র নিয়ে সমালোচনা করা ৩| একে অন্যের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া
৪|যে কোন সংকটে নিজেকে নির্যাতিত বা ভুক্তভোগী মনে করা।
৪|রোমান্টিকতা : যেসব দম্পতি বৈবাহিক জীবনে অতিরিক্ত রোমান্টিকতা দিয়ে শুরু হয়।তাদের মধ্যে ডিভোর্সের প্রবনতা বেশি দেখা যায়।কারন এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন। তাই বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য যে, যাদের দাম্পত্য জীবনের শুরুতে তুলনামূলক কম হলিউড রোমান্স থাকে। তাদের সম্পর্ক মজবুত হয় বেশি
৫| নীরবতা পালন করা: কোন বিষয়ে ঝামেলা বা ঝগড়া হে সেটা নিয়ে কথা বলে মিটমাট করে নেওয়া।যদি চুপ করে থাকেনন তাহলে সমস্যা বাড়বে।ফলে ডিভোর্স হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যা ২০১৩ সালের ৩০৫ টি দাম্পতির সাক্ষাৎকার এর উপর ভিওি করে বলা হয়।
এছাড়াও ১। একে অন্যের প্রতি ভাললাগা,ভালবাসার অভাব ২।নেতিবাচক কথার পরিমান ৩। বিয়ে নিয়ে হতাশা ৪।যৌতুক,যদিও বর্তমানে যৌতুকের সমস্যাটা কমেছে ৫। পারিবারিক অশান্তি ইত্যাদি

ডিভোর্স থেকে সরে আসুন:-
১। বিয়ের আগে বিভিন্ন দিকের কথা চিন্তা করুন।আবেগের বশবর্তী হয়ে বা শারীরিক চাহিদার তাড়নায় বিয়ে করবেন না।
২।কাউকে ভালোবাসলে তাকে বিয়ে করার আগে কিছুদিন অপেক্ষা করুন বা তাকে বুঝার চেষ্টা করেন।
৩।যাকে বিয়ে করবেন তর সম্পর্কে ভালো করে জেনে নিন। প্রয়োজনে সময় নিন।
৪।আপনার সঙ্গীকে সঠিকভাবে বুঝার চেষ্টা করুন।
৫। কোন সিন্ধান্ত একা নিবেন না।
৬। মিথ্যার উপর সম্পর্ক বেশিদিন টিকে না। তাই মিথ্যা বলবেন না।
৭। কথা বলুন, গল্প করুন, সময় দিন, সময়
করে বেড়াতে যান।
৮। কোন কিছুর জন্য জোর করবেন না।
৯। ঝগড়া হতেই পারে। তবে সেটা আপোষ করার মনোভাব পোষন করুন।
১০। বাহ্যিক সৌন্দর্যের মোহে পড়ে বিয়ে করবেন না। কেননা কিছুদিন পরে সেই মোহটা থাকে না।
১১। সঙ্গীর শারীরিক ও মানসিক উভয়ই বিষয়কে ভালবাসতে হবে।
আসুন ডিভোর্সকে না বলুন, পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে সচেষ্ট হোন।

——-
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা কলেজ,ঢাকা

Top