জার্মানীর সোশ্যাল বিজনেস সামিট থেকে ফিরে এসে–জিয়া হাবীব আহসান

Zia-Habib-Pic-1.jpg

————–
অনুষ্ঠানের গুড মর্নিং জানান জার্মান ক্রিয়েটিব ল্যাবের আলুম্নি লেওনহার্ড নিমা, বিল্ডিং এ নিউ সিবিলায়জেশন সম্পর্কে বলেন মেম্বার অফ দ্যা বোর্ড অফ ম্যানেজমেন্ট অফ বুলস ওয়াগন এজি গুন্নার কিলিয়ান, অফিসিয়াল কে নোট ফ্রম জার্মান গভারমেন্ট সম্পর্কে বলেন, পার্লামেন্টারী স্টেট সেক্রেটারি অফ দ্যা ফেডারেল মিনিস্টার ফর ইকনমি কপারেশন এন্ড ডেভলাপমেন্ট ড. মারিয়া ফ্যালেচ বেথ, দ্যা কনসাল্টেশন- দ্যা হান্ড্রেট ইয়ার জার্নি থ্রো স্পেস সম্পর্কে বলেন ফর্মাল নাসা স্ট্রোনাট রন গেরান । ২০২০ অলিম্পিকের প্রধান নিবার্হী তোশিরো মুতোরও বক্তব্য রাখেন । প্লাস্টিক এন্ড সার্কুলার ইকোনমী সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন প্রিসিয়াস প্ল্যাস্টিকের ফাউন্ডার ডেইব হ্যাক্কেনস, সলিডারিটি সম্পর্কে ব্যক্তব্য রাখেন এক্সপার্ট প্যানাল প্রফেসর ড. ইউনুস (মডারেটর), প্যারালাল সিজন ও এক্সপেরিয়েন্স জার্নিস সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন প্যারালাল সিজন এন্ড এক্সপেরিএন্স জার্নিস-২ থেকে ইউনুস স্যোসাল বিজনেসের সি.ই.ও কেরিন হিথসচেক, নিউ ডেভলাপম্যান্ট গ্রামীণ শক্তি । ফিউচার ইমপ্লাস সেভেন সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন গ্রামীণ শক্তির ম্যানেজিং ডিরেক্টর সোহেল আহম্মেদ, বিল্ডিং এ নিউ সিভিলাইজেশন সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন ফিউচার পার্সপেক্টিভ হেন্স রিটজ (মডারেটর), স্যোসাল বিজনেস এন্ড কো-অপারটিভস সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন গ্রামীণ কিন্টওয়ার লিঃ ম্যানেজিং ডিরেক্টর কাজী মঞ্জুরুল ইসলাম, মোবাইলিটি ইনোভেশন ফর লার্জ সিটিস সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন প্রোগাম লিড ম্যান ইমমেক্ট এসিলেডেটর মি-রা থাই, সলিডারিটি হাবঃ রিফিউজি একশন ট্যাংক সম্পর্কে বলেন পেগাসাস টস্টেন সেচিরিভার- এর কো-ফাউন্ডার এঞ্জিয়া এন্ড ফ্রিদ্রিচ কিইসিঞ্জার, হাউ টু কো-ক্রিয়েট ইন দ্যা ফুড সেক্টর সম্পর্কে বলেন জেন বার্নু কন্সাল্টিং করনি বাজনিয়ার প্রেসিডেন্ট এন্ড ফাউন্ডার জেন বার্নু, স্যোশাল বিজনেস সলিউশন ফর প্ল্যাস্টিক সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন ওয়েস্ট বেঞ্চার ইন্ডিয়ার কো-ফাউন্ডার রোউশান মিরান্ডা, ডিজিটাল ডিসরুপশান ফর সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট সম্পর্কে বলেন এইজ ফাইভ- এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর এন্ড পার্টনার সিউন ডববিন, বিল্ডিং কমিউনিটিস অফ চেঞ্জমেকার উইথ ইন ইউর অর্গানাইজেশন সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন মেইক্সেন্স এবং আরো অনেকে । ওলফ্‌সভবার্গ কারখানায় অটোষ্ট্যাড এলাকাটি বিশাল । ৬ মাইল দৈর্ঘ্য, ৬ মাইল প্রস্থ। বিকেলে চা বিরতীর এক ফাঁকে পার্শ্বের হার্বারে ক্রুজ এ এক ঘন্টা ভ্রমণের সুযোগ মিস করলাম না । জিয়া উদ্দিন খালেদ ভাই দ্রুত টিকেট কেটে আমাকে নিয়ে ক্রু-তে উঠে পড়লেন । আরো ১০/১৫ জন বাংলাদেশী সঙ্গী পেয়ে গেলাম সাথে । নদীর স্বচ্ছ জলের উপর ডাহুক ডাহুকিও দেখলাম । আরও কত হরেক রকমের পাখি । এদের কলগুঞ্জন পুরো এলাকাটি মুখরিত করে রেখেছে । আমাদের দেশে শিল্প এলাকা মানে দূষিত এলাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কিন্তু ওখানে আমাদের আমাদের সম্পূর্ণ বিপরীতে অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ । হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মস্থলে কোন প্রকার শব্দ দূষণ নেই, নেই কোন কোলাহল, ওয়াকওয়ে, গার্ডেন, লেইক, গাড়ির টাওয়ার বলতে বিশাল কার শো-রুমের মত প্রায় ২০তলা বিশিষ্ট ষ্টীল স্ট্রাকচার এবং গ্লাস ফিটিং নিজ থেকে উপর পর্যন্ত গাড়ি সাজানো বাহির থেকে স্বচ্ছ ফাইবার গ্লাস দিয়ে দেখা যায়, এইটা অন্যরকম একটা সৌন্দর্য্যের বিষয় মনে হয় যেন গাড়ী গুলো শূন্যে ভাসছে। হারবাল, সুউচ্চ গাড়ির টাওয়ার সব মিলিয়ে এক নান্দনিক পরিবেশ । অটোষ্ট্যাড টাউন সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত একটি এরিয়া । বড় ভবনগুলি কর্পোরেট ফোরআম, জেইট হাউস, হোটেল রিট-কার্লটন, ওলফসবার্গ এবং কার টাওয়ার গুলির সাথে গ্রাহক কেন্দ্র এবং নতুন প্রস্থান-মার্কেনপ্যাভিলস গুলোর সাথে পার্ক এবং লেগুন আড়াআড়ি ভাবে কাঠামো গঠন করা হয় । ওখানে আরো রয়েছে ফার্স্ট এইড, রেস্টুরেন্ট, পোশাক শপ, কার শো-রুমের মধ্যে রয়েছে ভিডাব্লিউ কমার্শিয়াল কার, পোর্শি, প্রভৃতি । ক্রুজের ক্যাপ্টেন এলাকাটির ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারা বিবরনী ও আমাদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন । মাঝে মাঝে চোখে পড়ে পাইন বৃক্ষের জঙ্গল । শীতকালে এই এদেশে সব গাছেরই তো পাতা প্রায় ঝরে গিয়েছে । কিন্তু পাইন গাছগুলি দারুণভাবে শীতের সঙ্গে সংগ্রাম করে তার পত্র রাজিকে মহা সমারোহে সাজিয়ে রেখেছে । কবি জসীম উদ্দিনের ভাষায়, “এরা যেন বন বিজয়ী সেনাদল, শাখায় শাখায় পতাকা উড়িয়ে বলছে “তোমাকে আমরা মানি না, মানি না।” ওখানে স্কেটিং এর দৃশ্য খুবই মনোমুগ্ধকর । ছেলে মেয়েরা এক ধরনের জুতা পায়ে দিয়ে একটি লাটি দিয়ে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে । এটি শীত প্রধান দেশে একটি খুবই জনপ্রিয় খেলা, যার নাম এস্কিং । বরফের উপর দিয়ে তারা চারিদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে । আমাদের ক্রুজটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত । ইনার পেন্ট, লম্বা গাউন, কোর্ট টাই মাঝে মাঝে গরমের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে । গাউন খুলে হ্যাঁগারে ঝুলিয়ে রাখলাম । তবে বাইরে তাপমাত্রা ৬/৭ ডিগ্রীর নিচে নামেনি । শূন্য ডিগ্রি এখনও অনুভব হয়নি । ঘোষক হিটলার, মুসোলিনি, জার্মানীর অনেক ইতিহাস বলতে লাগলেন । তিনি বললেন, জার্মানিতে ইতিপূর্বে যুদ্ধ সংঘাতে বহু রক্ত ঝরেছে । এখন জার্মানিরা শান্তি চায় । প্রতিবেশীদের সাথে স্বদ্ভাব চায় । পুরো অটোষ্ট্যাড এলাক ঘুরে এলাম। নদীর এপাড় ওপাড়ে অনেকগুলো ব্রীজ আছে । ওপাড়ে রেল এর মেইন ষ্টেশন । ভক্সওয়াগান কোম্পানির এ কারখানাকে ঘিরেই শহরটি গড়ে উঠেছে । রিভার ক্রুজ শেষ করে আবার প্যানেল ডিসকাশনে ফিরে এলাম । সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রফেসর ড. ইউনুস সারা বিশ্বের পরিবর্তন ও উন্নয়ন নিয়ে আবেগময়ী বক্তব্য রাখলেন । প্রফেসর ইউনূস সামাজিক ব্যবসা কীভাবে অ্যাথলেটদের ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে এবং সমাজ কিমিউনিটির নেতা হিসেবে কীভাবে তাদেরকে রুপান্তারিত করতে পারে তা ব্যাখ্যা করেন । তিনি বলেন, ‘তোমরা শুধু একটি বিষয় অর্থাৎ খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে পৃথিবী জুড়ে মানুষকে সংগঠিত করতে পারো । তোমরা পরিবর্তনের অগ্রদূত, অগ্রপথিক । তোমরা তোমাদের এলাকা, তোমাদের সমাজ ও গোটা বিশ্বকে বদলে দিতে পারো ।’ তাঁর ভাষণের পরেই ‘ইউনূস স্পোর্টস হাব’- এর আয়োজনে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে তরুণদের দ্বারা পরিচালিত দান-নির্ভর সামাজিক প্রকল্পগুলোকে কীভাবে সামাজিক ব্যবসায়ে রুপান্তারিত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয় । প্রফেসর ইউনূস ইয়ং চেঞ্জ মেকার্স কর্মসূচির মাধ্যমে কীভাবে তরুণদের ক্ষমতাকে কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা এবং প্যারিস ২০২৪-সাথে কাজ করে যাচ্ছে । প্রফেসর ইউনূস তাঁদের নিকট সামাজিক ব্যবসা কীভাবে সমাজে স্থায়ী ও ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে তা ব্যাখ্যা করেন । তিনি আরো বলেন কল্যাণমুখী অর্থনীতি বিশ্বকে অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করতে পারে । জার্মানির উলফসবার্গে দুইদিন ব্যাপী সামাজিক ব্যবসার বৈশ্বিক সম্মেলন গতকাল শেষ হয়েছে । এর আগে একই স্থানে ইয়ং চ্যালেঞ্জারস মিটিং এবং সোশ্যাল বিজনেস একাডেমিয়া কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় । চট্টগ্রাম সোশ্যাল বিজনেস সেন্টারের একটি প্রতিনিধি দল সহ জার্মানিতে সম্মেলনে বিশ্বের ৫০টিরও বেশী দেশের সাত শতাধিক প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন । গতকাল শেষ হওয়া বৈশ্বিক এই সম্মেলনের এবারকার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বিল্ডিং এ নিউ সিভিলাইজেশন । সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা বিভিন্ন কোম্পানির মালিক ও প্রধান নির্বাহীরা অংশ নিয়েছেন । একটি নতুন বিশ্ব গড়ার জন্য পৃথিবীর অর্থনীতিকে সবার আগে ঠিক করে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতের কথাও বলা হয়েছে । ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা এবং উৎসব উৎসবমুখর পরিবেশে এবার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার , ইউনূস সেন্টার এবং সামাজিক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ব্যবসার কর্মকাণ্ড সম্মেলনে উপস্থাপন করেন । বাংলাদেশ সময় গতরাতে বৈশ্বিক এই সম্মেলনের পর্দা নামে । অনুষ্ঠানের শেষ প্রান্তে মনিকা ইউনুসের নেতৃত্বাধীন শিল্পী গোষ্ঠী সোশ্যাল বিজনেসের থিম সঙ্গীত পরিবেশন করেন । সামাজিক ব্যবসার পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গে ২০১৯ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয় । জার্মানির বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগান-এর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নবম সোশ্যাল বিজনেস সামিট এর সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো । আমরা হোটেলের দিকে রওনা হলাম । ইন শা আল্লাহ্‌ পরদিন সকালে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো । পরবর্তী সংখ্যায় এ নিয়ে আলোচনা করার আশা রাখি । (চলবে)

লেখকঃ আইনজীবী,কলামিস্ট,মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

Top