২৫ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নির্ভীক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী স্মরণে

Zia-Habib-Pic.jpg

এ এম জিয়া হাবীব আহসান
আজ ১১ জানুয়ারী ২০১৯ দেশপ্রেমের বাতিঘর খ্যাত নির্ভীক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীর ২৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী । ১৯৯৪ সালের এদিনে জাতির বিবেক, দেশ প্রেমিক জনগোষ্ঠীর অভিভাবক, জাতীয় ঐক্য- সংহতি, রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা, স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্ত্বের অতন্ত্র প্রহরী বিচারপতি চৌধুরী ইন্তেকাল করেন । তিনি একাধারে মানবাধিকার আন্দলনের সোচ্চার কণ্ঠস্বর, ভাষা সৈনিক, অনলবর্ষী বক্তা, সুলেখক, বিচক্ষণ ও নির্ভীক বিচারপতি ছিলেন । নতুন প্রজন্ম এ ধরণের দেশপ্রেমিক মহামানবদের ভুলে গেলে তা হবে জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক । জনাব চৌধুরীর জীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি বরিশালের জমিদার খান বাহাদুর আব্দুল লতিফ চৌধুরী সাহেবের পুত্র-যিনি ‘কাউন্সিল অফ স্টেট অফ ইন্ডিয়া’ এবং ‘বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’-এর সদস্য ছিলেন । বিচারপতি চৌধুরী ১৯২৬ সালের ১ ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুল থেকে জুনিয়র কেম্ব্রিজ এবং ১৯৪২ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ষ্টার মার্ক সহ প্রথম বিভাগে ইংরেজিতে প্রথম হওয়ার জন্য ‘ডিসিলভা’ স্বর্ণপদকসহ ম্যাট্রিক পাশ করেন । তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ‘আই.এ’ এবং ‘বি.এ’ পাস করে । ১৯৪৬ মুসলিম লীগের গণভোটের সংগঠক হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন । ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পরে এম.এ, এলএল.বি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সেশনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন ।
১৯৪৮ সালের ২৭ শে নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষ থেকে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানকে যে অভ্যর্থনা স্মারকলিপি প্রদান করা হয় তা ইংরেজিতে লিখিত ছিল । সেই ঐতিহাসিক দলিলের রচয়িতা ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী । তিনি ভাষা আন্দোলনের স্থপতি অধ্যক্ষ আবুল কাশেমের ঘনিষ্ঠ ও স্নেহভাজন ছিলেন। । ভাষার দাবিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় ও মিছিলে তিনি অংশ নেন ও বক্তব্য রাখেন । ১৯৪৮ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনুষ্ঠিত ছাত্র যুব সম্মেলনে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । একই বছরে ১৯৫৫ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সাল হতে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন । তিনি ১৯৬৬-১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারী জেনারেল এবং ১৯৬৯ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন । ১৯৬৯ সালে তিনি ন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশনের পরিচালক নির্বাচিত হন । ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৮৩ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই পদে বহাল থাকেন। তৎকালীন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াকু সৈনিক বিচারপতি চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত সরকারের রোষানলে পড়ে চাকরি হারাতে হয় । বিচারপতি ১৯৭৭-৭৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন । তখন বাংলাদেশ প্রথমবারের মত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয় । জাপানের মত একটি শক্তিশালী দেশকে পরাজিত করে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিচারপতি চৌধুরী মূখ্য ভূমিকা পালন করেন । দেশের আদর্শ সচেতন বুদ্ধিজীবী, কূটনীতিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক সহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে তিনি ‘লিবার্টি ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১ম চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন । বিচারপতি চৌধুরী ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান রাইতোস এ্যান্ড লিগ্যাল এ্যাফেয়ার্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট । তিনি বসনিয়া সলিডারিটি ফ্রন্টের প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হন । তিনি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের প্রেসিডেন্ট ও বাংলা একাডেমীর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৯৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব আরবিট্রশনে হিসেবে নিযুক্ত হন এবং মৃত্যুকাল পর্যন্ত ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন । বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের একজন অবিস্মরনীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁকে বাংলাদেশের বিবেক বলা হত। সত্য ও ন্যায়ের কথা উচ্চারিত কণ্ঠে নির্ভয়ে যাঁরা বলে গেছেন মরহুম চৌধুরী তাদের অন্যতম। সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলার অদম্য সাহস ছিল এ অসাধারণ ব্যক্তিত্বের। এ সাহস সবার থাকে না। বহু বিশাল ব্যক্তিত্বকেও অন্যায়ের সাথে, মিথ্যার সাথে আপোষ কিংবা আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়। মরহুম বিচারপতি রহমান ছিলেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ জন্যই তার প্রতি জাতির এত শ্রদ্ধাবোধ ও গভীর ভালোবাসা। রোগাক্রান্ত অবস্থায়ও মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বলে গেছেন সত্যের কথা, দেশপ্রেম, ইমান, ইসলাম, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের কথা। চেসনিয়া, বসনিয়া, কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তানসহ দেশে-বিদেশে সকল প্রকার নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তিনি ছিলেন সোচ্চার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। আজীবন তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের সাধক। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন সত্য উচ্চারণে উদ্দীপ্ত। তারপর কর্মক্ষেত্রে এসেও মরহুম চৌধুরী একজন সফল আইনজীবী ও পরবর্তীতে সফল বিচারপতি হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় ভূমিকা রাখেন। বিচারপতি হিসেবে তাঁর প্রদত্ত রায়সমূহে তার সূক্ষ্ম মেধা, বিচক্ষণতা, মনন, যুক্তিবোধ, ইনসাফ ও সত্য-নিষ্ঠতারই পরিচয় মেলে। তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। বিচারপতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে যথা- বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, আদালত অবমাননা, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, চাকরি আইন, ফৌজদারী আইন, সরকারি আমলার ভাড়া বাড়ি সম্বন্ধে বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে অতি স্বল্প সময়ে তার মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাই এসব রায় আইনজীবী ও বিচারকদের জন্য অমূল্য সম্পদ। ১৯৭৫-১৯৮৩ সালের ডিএলআর-এ তার বহু গুরুত্বপূর্ণ রায় নজির হিসেবে আছে। শুধুমাত্র ১৯৮২ ইংরেজির ডিএলআরএ তার ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় নজির হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক মহামান্য প্রধান বিচারপতি এটিএম আফজাল সাহেব তখন তার একই বেঞ্চে সহকারী বিচারপতি ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রক্ষী বাহিনী নিয়ে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক প্রদত্ত এক মামলার রায় রক্ষীবাহিনীর আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হলে অন্ধকারে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে ‌। ১৯৭৪ সালে তিনি রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি রায় ঘোষণা করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেন। ১৯৭৩ সালে রক্ষীবাহিনী ৫ জন মেয়েকে মাদারীপুরের কোনো এক এলাকা থেকে ধরে আনে। ২ সপ্তাহের ওপর তাদের ক্যাম্পে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। প্রায় ২০ দিন পর মেয়েগুলোকে সর্বহারা পার্টির সদস্যা হিসেবে পুলিশের কাছে তুলে দেয়া হয়, যাদের বয়স ১৮-২২। সরকারের বিরুদ্ধে মেয়েদের পক্ষে দায়েরকৃত মামলায় তিনি মেয়েগুলোকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন এবং রক্ষীবাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের বর্ণনা শুনেন। তিনি ‘৭১-এর হানাদার বাহিনীর ন্যায় এ নির্যাতনের কাহিনী শুনে তা রেকর্ড করেন এবং তাদের আটকাদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন। তিনি রক্ষীবাহিনীকে নর্মলেস বাহিনী বলে আখ্যায়িত করেন। কেননা প্রতিটি বাহিনীর নিজস্ব একটি রুলস ফোরাম থাকে, যার অধীনে তারা পরিচালিত। কিন্তু রক্ষীবাহিনীর তা ছিল না। তারা কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনেও ছিল না। এ রায়ের পর তাকে টেলিফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। এতে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। কেননা তার নৈতিক শক্তি ছিল অসাধারণ। রক্ষীবাহিনীর প্রধানকে তিনি ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় মহামান্য আদালতে হাজির হতে বাধ্য করেছিলেন । সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রফেসর নুরুল ইসলাম (পরবর্তীতে জাতীয় অধ্যাপক) বনাম বাংলাদেশ সরকার শীর্ষক মামলায় তাঁর প্রদত্ত রায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক সাড়া তোলে। ভারতের বহু কোর্টে তা পরবর্তীতে অনুসরণ করা হয়। সরকার পিজি হাসপাতালের পরিচালক পদ থেকে প্রফেসর নুরুল ইসলামকে অপসারণ করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে তাঁকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। উক্ত মামলায় সাংবিধানিক বহু প্রশ্ন ও বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা । তাঁর প্রদত্ত রায়গুলোর মধ্যে রক্ষীবাহিনী, কিং ফিসারিজ, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, ডিআইটি প্রভৃতি মামলার রায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মরহুম বিচারপতি জীবনে কখনো কোনো মৃত্যুদন্ডের রায় দেননি বা বহাল রাখেননি। কেননা বহু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন সাজানো সাক্ষীর কারণে অনেকের মৃত্যুদন্ড হয়। তিনি বিচারের ক্ষেত্রে মানবিক দিক বেশি বিবেচনায় আনতেন। একবার ফৌজদারী আদালত থেকে দেওয়ানী আদালতে তিনি ট্রান্সফার হচ্ছেন শুনে কারাগার থেকে ফাঁসির আসামীরা তাকে চিঠি লিখেন, ‘স্যার আপনার বদলির আগে আমাদের মামলাগুলো শুনে যাবেন। আপনার রায়ে আমাদের ফাঁসি হলেও আপত্তি নেই’, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এর আগেই তিনি ট্রান্সফার হন। এ দুঃখ তিনি জীবনে ভুলতে পারেননি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য তিনি সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। দেশকে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতেও তিনি আমৃত্যু লড়াইয়ে অবতীর্ণ ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্বে সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করে বিশ্বের কোটি কোটি নির্যাতিত মানুষকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হবে ও জাতিসংঘ সনদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে এদেরকে জাতিসংঘ থেকে বহিষ্কার করতে হবে’। অনেক বিচারপতি আছেন কিংবা অনেক শীর্ষ ব্যক্তিত্ব আছেন যারা কর্মজীবনে কিংবা অবসর জীবনে গা বাঁচিয়ে চলতে ইচ্ছুক। কর্ম জীবন কিংবা অবসর জীবনে তারা সহসা সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব বোধ অনুধান করেন না । কিন্তু বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী ছিলেন এর ব্যতিক্রম। অগাধ জ্ঞান ও সুতীক্ষ্ণ বাগ্মীতার অধিকারী বিচারপতি চৌধুরী প্রচুর পড়াশোনা করতেন । আপন বলয়ের বাইরের প্রতিপক্ষের বলয়েও বিচারপতি ছিলেন সমান আলোচিত-সমালোচিত সদালাপী সুসংস্কৃত এবং বন্ধুবৎসল। বিচারপতি চৌধুরী তাঁর অদ্ভুত পাণ্ডিত্যে বিচিত্র শব্দচয়নে উচ্চমানের হিউমার রচনা করে কথা বলতেন। ঘরোয়া মজলিসে কিংবা সভা সেমিনারে তিনি শ্রোতাদের যেমন উদ্দীপ্ত করতে পারতেন তেমনি হাসাতেও পারতেন সমান দক্ষতায়। গুরুগম্ভীর বক্তৃতায় হাস্যরসের মিশেল দিয়ে তিনি শ্রোতাবর্গকে ধরে রাখতে জানতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বহু জনের নানা ধরনের বক্তব্য এর পরও সবাই ধৈর্য ধরে প্রধান অতিথির ভাষণের অপেক্ষায় বসে থাকতেন। জনাব চৌধুরী বক্তৃতা দিয়ে, বিবৃতি দিয়ে পয়সা উপার্জন করেননি । তিনি জাতীয় প্রয়োজনে জাতিসত্তা নির্মাণের দেশে যেখানে ডাক পড়েছে ছুটে গেছেন । রুঢ় সত্য কথা তিনি এভাবে উচ্চারণ করতে একটুও এদিক ওদিক তাকাতে না। রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠার সুযোগ লাভ করেছিলেন ।এমনকি তার বোনেরাও উচ্চ শিক্ষা লাভে অনুমতি পেয়েছিল পরিবার থেকে । আধুনিক শিক্ষার প্রভাব এবং পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বিচারপতি চৌধুরী মন মানসিকতাকে বিশাল করে তুলেছিলেন । রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতি এ দুটো পদে একই সময়ে অধিষ্ঠিত থাকা সংবিধানবিরোধী । এ প্রসঙ্গে বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে স্বপদে ফিরে যাওয়ার জন্য বার বার সংবিধান সংশোধনের তিনি তীব্র সমালোচনা করেন । পারিবারিক দিক দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ধনাঢ্য-বনেদী-সংস্কৃতিমনা, সমাজ সচেতন উলানিয়ার জমিদার বাড়ির সন্তান হিসেবে তিনি বেড়ে উঠলেও পারিপার্শ্বিকতাবোধ, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবিক অনুভূতি কখনো তাঁর ব্যক্তিত্বের ভারিক্কিকে আচ্ছন্ন করেনি । এ অকুতোভয় বিচারপতি ছাত্র হিসেবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে, আইনজীবী, বিচারক ও সর্বোপরি মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাধারণ ও সফলতার শীর্ষে। আইন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার বিষয়ে তিনি দেশে-বিদেশে বহু সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেন। পরিণত বয়সে তিনি বহুবার চট্টগ্রামে আসলে লেখকের সাথে তার দেখা ও পরিচয়ের সূত্রপাত হয়। চট্টগ্রামের মানুষের প্রতি ছিলো তাঁর বিশেষ দুর্বলতা । চট্টগ্রামে যখনই তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে তিনি চট্টগ্রাম বাসির ডাকে সাড়া দিয়েছেন । চট্টগ্রামে বহু সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে তাঁর মূল্যবান ব্যক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে । তাঁর মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম থেকেই প্রকাশিত হয় ‘বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী স্মারক গ্রন্থ।’ আমি ঐ স্মারক গ্রন্থ ও স্মরণ সভা কমিটির একজন ক্ষুদে সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম । আজকের দিনে তাঁর কথা বার বার মনে পড়ছে । ১৯৯৪ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি ঢাকার সিএমএইচ-এ মৃত্যুবরণ করেন। তাকে বনানী গোরস্থানে দাফন করা হয়। তার স্ত্রী মিসেস সিতারা বেগম সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট জেনারেল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট মরহুম আলহাজ্জ মোহাম্মদ জানে আলমের একমাত্র কন্যা । মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, দুই কন্যা, অসংখ্য আদর্শ সচেতন গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বর্তমানে তার সুযোগ্য পুত্র জাস্টিস জুবাইর রহমান চৌধুরী মহামান্য হাইকোর্টের সম্মানিত বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বড় কন্যা মিসেস রুসেলী রহমান চৌধুরী ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান হতে এম.এস.সি- পাশ করেন । তিনি চট্টগ্রাম মহিলা কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন । তিনি বাংলাদেশ গ্র্যাজুয়েট উইমেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইউনিভার্সিটি উইমেন এর সভাপতি এবং ‘ইনার হুইল ক্লাব’ চট্টগ্রাম মেট্রো শাখার সাবেক প্রেসিডেন্টও হিসেবে জনহিতকর কর্মকান্ডে ব্যাপক অবদান রেখে যাচ্ছেন। রুসেলি রহমান চৌধুরীর সাথে আমার নিজ গ্রাম হাটহাজারীর গুমানমর্দন ইউনিয়নের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব মরহুম সিরাজুল ইসলাম মাহমুদের পুত্র ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার আনিসুল মাহমুদ এর ছোট ভাই ডা. মাইনুল ইসলাম মাহমুদ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । রুসেলি মাহমুদ ইঞ্জিনিয়ার শাদার মাহমুদ ও ব্যারিস্টার সাজিদ মাহমুদের জননী । জাস্টিস আব্দুর রহমানের অপর পুত্র প্রফেসর রিয়াজুর রহমান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব একাউন্টিং-এর চেয়ারম্যান । ছোট মেয়ে ওয়সিফা রহমান স্বপরিবারে আমেরিকার শিকাগো শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন । মরহুম আব্দুর রহমানের বক্তব্যে, কথায় ও কাজে চরিত্র মাধুর্য, যুক্তিবোধও সত্য নিষ্ঠতাই প্রকাশিত হতো। জাতির একজন প্রজ্ঞাবান অভিভাবক হিসেবে তিনি জাতির দুর্দিনে জাতিকে সুষ্ঠু, আদর্শিক ও রাজনৈতিক এবং দেশপ্রেম গড়ে তোলার মধ্যেই তিনি দেশের উন্নয়নে ও শক্তির ঠিকানা খুঁজে নিতে জাতিকে বার বার পথ নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। একটি পরিচ্ছন্ন যুক্তিবাদী আধুনিক মন ও মনন ছিল বিচারপতির চৌধুরী। সবচেয়ে বড় কথা সব কিছুকে মানবিকতার মূল্যবোধে যাচাই করে গ্রহণ করতে তিনি ছিলেন চিরআগ্রহী। আমাদের দুর্ভাগ্য জাতীয় জীবনে তাঁর মত প্রজ্ঞা ও সাহসী ব্যক্তিত্বের যে নেতৃত্ব আমাদের প্রয়োজন ছিল তা থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম। ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য বিচারপতি চৌধুরীকে ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয়। ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ও অবদানের জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৮ নম্বর সড়কটি “ভাষা সৈনিক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী সড়ক” নামকরণ করেন । ভাষা আন্দোলনে তাঁর বিরাট অবদান সত্ত্বেও তিনি অদ্যাবধি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি । ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে মরণোত্তর একুশ পদক প্রদান করা হোক । একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এ দেশের মানবাধিকার কর্মকান্ডে সোচ্চার কণ্ঠস্বর মরহুম জাস্টিস রহমানকে তার ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশেষভাবে স্মরণ করছি। আল্লাহ রাববুল আলামীন এই মহান ব্যক্তিত্বের সকল খেদমত কবুল করুন। আমীন।
-লেখক: আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকারকর্মী
ক্যাপশন- বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছিলেন বিচারপতি মরহুম আব্দুর রহমান চৌধুরী ।

Top