বাংলাদেশে শিক্ষায় মাতৃভাষা–আহমেদ সজিব

46387811_2112944495702482_8096125116598976512_n.png

:

সাধারণত মায়ের মুখের ভাষাকেই আমরা মাতৃভাষা বললেও প্রকৃত অর্থে যে ভাষা মানুষ সব থেকে বেশি বুঝে,জানে,বলতে পারে,লিখতে পারে,সাহিত্য রচনা করতে পারে তাই ই মাতৃভাষা।মায়ের কাছে যেমন আমাদের ঘনিষ্ঠ আবেগানুভূতির সম্পর্ক থাকে,তেমনি মাতৃভাষা আমাদের আপনজন। এই ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা নিরন্তর। দেশের উন্নতি, সমৃদ্ধিতেও মাতৃভাষা অনন্য ভূমিকা রাখে।মাতৃভাষায় এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য থাকে,সৃজনশীলতার স্বাতন্ত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির শক্তিশালী হাতিয়ার হল মাতৃভাষা।মায়ের মতো এরও অসংখ্য গুনের কথা যত বলা হবে ততই কম মনে হবে।
‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’র এই দেশের মানুষ অবলীলায় আভিজাত্য পছন্দ করে।জাত্যাভিমান না থাকলেও অহমিকার শেষ নেই।স্বাধীনতার পূর্বাপরের ইতিহাস তার সাক্ষী। বাঙালির বিদেশী ভাষা-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের শেষ নেই।হয়তো এজন্যই কোন বিদেশী আসলে তাকে ঘিরে ধরে অসংখ্য জোড়াচোখ।তামাশা বৈকি।মধুসূদন তাঁর স্বাতন্ত্র্য ছেড়ে পরবাসে গিয়ে অপদস্থ হয়ে মাতৃভূমির মাতৃভাষায় শস্য ফলিয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন। বাংলাদেশের জন্ম, বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে মাতৃভাষার প্রবল স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনে। এদেশের ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’, ‘ইউসুফ জুলেখা’র জন্ম মাতৃভাষায়।বাঙালী স্বজাতি প্রীতি, স্বজাত্যবোধ মাতৃভাষায়।মাতৃভাষায় আমরা প্রতিযোগিতা করি।সৌভাগ্যের বিষয় এই যে,মাতৃভাষাকেও আমরা প্রতিযোগিতায় নামিয়েছি।তাইতো এর বিকল্প খুঁজে পেয়েছি আমরা।ইংরেজি না শিখলে নাকি কাউকে উচ্চশিক্ষিত বলা যায় না।কর্মক্ষেত্রে ইংরেজি রপ্ত না থাকলে যোগ্য ব্যক্তিরাও কর্মহীন থাকে।বিদেশী বইগুলোর অনুবাদ বাংলায় হলে পাপ হয়।দোকানপাটের নামফলক ইংরেজিতে না লিখলে অভিশাপ আসে।ভালো উপস্থাপক হতে হলে ইংরেজি লাগে।বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ইংরেজদের পীর দরবেশ ধরে নিয়েছে। মোবাইলের খোশগল্পে ইংরেজিতে বাংলা লিখলে সময় বাঁচে।আরও কত উপকার!
শিক্ষা মানুষের মননে উল্লেখযোগ্য স্থায়ী কল্যাণকর পরিবর্তন আনে।কিন্তু মননে কালিমা আমাদের বারংবার অনুভূতির রস আস্বাদনে পরাভূত করেছে।জ্ঞান, বিজ্ঞান,সাহিত্য চর্চা করতে গেলে ইংরেজিতে দক্ষতা অত্যাবশ্যক।সাহিত্যের বইয়ের উপরের মলাটে লিখা থাকে ‘অমুক পাবলিকেশন্স’, ‘প্রকাশনা’ শব্দটা এখানে বেমানান। বিদ্যালয় ভিত্তিক মূল্যায়নকে এদেশে ‘এসবিএ’ বলে।বুদ্ধি যাচাই প্রশ্নকে এদেশে ‘আইকিউ’ বলে।জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে এদেশে ‘এনসিটিবি’ বলে।পরিভাষা সৃষ্টিতে যে পরিমাণ সম্পদ প্রয়োজন তা আমাদের নেই।আমরা অতি দরিদ্র। আমরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধকতাকে ‘অটিজম’ বলে জানি অথচ আমরা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী জাতি।বাংলাভাষাকে অন্য ভাষার বিকল্প না করে অন্য ভাষাকে বাংলা ভাষার বিকল্পে পরিণত করেছি আমরা।এ সমস্যার প্রতিকার সবার আগে দরকার,তারপর প্রতিরোধ। জাতির লজ্জা বর্ধনে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।জাতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে,জনগনকে জনসম্পদে পরিণত হতে হবে।তাহলেই এ ধরনের বিকৃতির স্থায়ী সমাধান আসবে।সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বলার সবকিছুই বলা হয় না।তবে ইংরেজি(?)তেই একটা কথা আছে -‘ব্রেভিটি অব এক্সপ্রেশন’ তো হয়।শিক্ষায় মাতৃভাষা আমাদের এই শিক্ষাই উপহার দিয়েছে।
লেখক
আহমেদ সজিব
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top