উপার্জন-ইসলামী দৃষ্টিকোণ—নুরুল আলম ফারুকী

43663425_180826929461344_3067699568196976640_n-1.jpg

(পার্ট–০১)

♦উপার্জনের পরিচয়:

উপার্জনের আভিধানিক অর্থ আয়, রোজগার, কামাই, লাভ, প্রাপ্তি, সংগ্রহ, অর্জন ইত্যাদি। আরবি শব্দ হচ্ছে الكسب ও ইংরেজীতে Income বলে।
পরিভাষায় উপার্জন হলো মানব জীবনের চাহিদা পুরনের জন্য কিংবা জীবন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পন্থায়, পদ্ধতি বা মাধ্যমে সম্পদ -অর্থ অর্জন করা। ” Income is the monetary payment received for goods or services or from other sources as tents or investment.”

ইসলামে উপার্জনের গুরুত্ব: হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে-
عن المقداد ابن معدي كرب قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أكل احد طعاما قط خير مامن أن يأكل من عمل يديه وان نبي الله داود عليه السلام كان يأكل من عمل يديه ( رواه البخاري)
অর্থ হলো- হযরত মিকদাম ইবনে মাদীকারব (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, নিজ হাতের উপার্জন দ্বারা প্রাপ্ত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য খেতে পারেনা। নিশ্চয় আল্লাহর নবী হযরত দাউদ (আ:) নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্য দ্বারাই আহার করতেন। (বুখারী শরীফে বর্ণিত)
উক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাজ করে খেতে কোন অপমান বা আপত্তি থাকতে পারেনা। নিজে পরিশ্রম করে পরিশ্রমলব্ধ অর্থে নিজের ও নিজের পরিবারবর্গের আহার যোগানোর জন্য সংগ্রাম করা অতিশয় সম্মান ও পুন্যের কাজ।
উপার্জনের নিয়ম নীতিকে অর্থনীতি বলে, আর এ অর্থনীতি মানুষের জীবন নির্বাহের অন্যতম চালিকাশক্তি সমাদৃত ও মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংগ হিসেবে পরিগণিত।
তাই আল্লাহ বলেছেন
فاذا قضيت الصلواة فانتشروا فى الارض وابتغوا من فضل الله (سورة الجمع 10)
অর্থ- সালাত বা নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করবে। (সুরা আল জুমআ:১০)
বস্তুত : খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও শরীয়ত অনুমোদিত বিনোদন মানুষের মৌলিক অধিকার। এগুলোর যোগান দেয়ার জন্য নিজ হাতের উপার্জনের গুরুত্ব ইসলামে অপরিহার্য করেছে।

(পার্ট–০২)

♦মানবজীবনে উপার্জনের প্রয়োজনীয়তা:

ক) জীবন পরিচালনার জন্য উপার্জন আবশ্যকীয় বিষয়:
মানবজীবনে নিজ নিজ যোগ্যতানুসারে জীবিকা অন্বেষণের জন্য পরিশ্রম ও চেষ্টা -তদবীর করা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন রিজিকদাতা। তবে তিনি রিজিক অন্বেষণ করার দায়িত্ব বান্দার উপর অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তা’লা বলেন-
فابتغوا عند الله الرزق واعبدوه واشكروا له (سورة العنكبوت: 17)
অর্থ- কাজেই আল্লাহর কাছে রিযিক অন্বেষণ কর, তাঁর এবাদত কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। (সুরা আল- আনকাবুত) অতএব, বৈধ জীবিকার কোন একটি অবলম্বন করা প্রত্যেক মানুষের একান্ত প্রয়োজন।
খ) পৃথিবী উপার্জন করার একমাত্র ক্ষেত্র:
মানবজাতীর প্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাদ্য, শিল্প-পণ্য ও কাচা-মাল ভুমি হতে উৎপন্ন। আর তা খুঁজে বের করতে এবং উপার্জন অন্বেষণ করতে মহান আল্লাহ তা’লা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর বাণী –
هوا الذي جعل لكم الارض ذلولا فامشوا في مناكبها وكلوا من رزقه (سورة الملك :15)
অর্থ- তিনিই তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা এর দিক- দিগন্তে বিচরণ কর এবং তার প্রদত্ত জীবনোপকরণ হতে আহার্য কর। (সুরা মুলক:১৫)
গ) পারিবারিক দায়িত্ব পালনকরা:
প্রত্যেক ব্যক্তিই পরিবারের সদস্য। তাই পারিবারিক দায়িত্ব পালনে তাকে উপার্জন করতে হয়। পরিবারে খদ্য-বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থান সহ অন্যান্য মৌলক চাহিদা রয়েছে যা উপার্জন করে মেটাতে হয়। যেমন আল্লাহ বলেন-
وَعلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ(سورة البقرة:233)
অর্থ- আর সন্তানের পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মায়েদেরকে খাবার ও পোষাক প্রদান করা। (সুরা আল- বাক্বারা: ২৩৩)
ঘ) উপার্জন করার ক্ষমতা দুনিয়াবি কল্যাণকর :
উপার্জন করার যোগ্যতা মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। তিনি আমাদেরকে চিন্তা-বুদ্ধি, বিবেক ও হাত-পা দিয়েছেন স্বাবলম্বী হয়ে যেন অপরের কাছে হাত পাততে না হয়। উপার্জন করার মত কল্যাণকর বিষয়ে দোয়া করার ভাষা তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (سورة البقرة :201)
অর্থ- হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর (সুরা আল-বাক্বারা:২০১)
ঙ) স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যম:
অপরের উপর নির্ভর করে স্বাবলম্বী হওয়া যায়না এ টা ইসলাম স্পষ্ট করে বলেদিয়েছে। এ মর্মে প্রিয় নবী (সা:) বলেছেন-
لا تزال المسالة باحدكم حتي يلقي الله وليس في وجهه مضعة لحم (رواه البخاري والمسلم)
অর্থ- তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে চেয়ে বেড়ায় সে কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় আগমন করবে যে তার মুখমণ্ডলে একটুকরো মাংস ও থাকবেনা। (বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত)
চ) উত্তরাধিকারীদের স্বচ্ছল রেখে যাওয়ার মাধ্যম:
এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে- হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:) বলেন, নবীকরিম (সা:) আমাকে এভাবে বলেছেন,
نك ان تدع ورثتك اغنياء خير من ان تدعهم عالة يتكففون الناس في ايدهم (رواه البخاري)
অর্থ- তোমাদের সন্তান-সন্তুতিদেরকে সক্ষম ও স্বাবলম্বী রেখে যাওয়া অভাবী ও মানুষের কাছে হাতপাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চাইতে উত্তম। (বুখারী শরীফে বর্ণিত) তাই বুঝা যাই যে, উত্তরাধিকারীদের স্বাবলম্বী করতে উপার্জনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

লেখক : নুরুল আলম ফারুকী
অধ্যক্ষ
গারাংগিয়া রাব্বানী মহিলা ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।

Top