আমাদের বিচার ব্যবস্থায় সাফল্য এনে দিতে পারে জুরি ট্রায়াল পদ্ধতি– জিয়া হাবীব আহ্‌সান

Screenshot-8.png

——–++————–
‘মানবাধিকার ও মার্কিন বিচার ব্যবস্থা’ শীর্ষক ইন্টারন্যাশন্যাল ভিজিটরস প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে সেখানকার বিচারব্যবস্থায় জুরি সিস্টেম সম্পর্কে এক চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। যা আমার কাছে নিরপেক্ষ বিচার পদ্ধতির সহায়ক মনে হয়েছে। আমেরিকার বিচার ব্যবস্থায় ‘জুরি’ সিস্টেম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। আইনের ছাত্র হিসাবে উপমহাদেশের লিগ্যাল হিস্ট্রি ও লিগ্যাল সিস্টেম অব বাংলাদেশ সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে গিয়ে দেখেছি প্রাচীন ভারতেও জুরি ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। তবে এটি আধুনিক জুরি পদ্ধতির মত সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল না। তৃতীয় শতাব্দীতে (এ.ডি) লিখিত ‘মৃচ্ছাক্তিতা’ তে জুরি ব্যবস্থার কথা উল্লিখিত ছিল। নারদ, শুক্র নীতি এবং বৃহস্পতি জুরিগণের কার্যাবলি ব্যাখ্যা করেছেন। তারা জুরির কার্যকে নির্ধারিত করেন। এগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সমপ্রদায়ের গণ্যমান্য সদস্যগণ বিচারকার্যে বিচারকগণকে সহায়তা করতেন। তাঁরা কেবল মোকদ্দমার দ্বন্দ্বের কারণ পরীক্ষা করে সত্য ঘটনা বিচারকদের নিকট উপস্থাপন করতেন, কিন্তু মামলায় সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন বিচারক নিজে। এভাবে দেখা যায়, কমিউনিটির সদস্যগণ ন্যায় বিচার প্রশাসনে সহায়তা করতেন। জুরিগণকে মনে করা হতো ঘটনার নিরপেক্ষ শ্রেষ্ঠ বিচারক । বিচারক শুধু জুরিদের কাছে আইনের ব্যাখ্যা করতেন । এর বেশী কিছু নয়। জুরিরা নিজেদের বিবেক ও বিবেচনা অনুযায়ী মতামত দিতেন । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচারপতি জুরিদের রায় মেনে আসামীকে খালাস করে দিতেন । অনেক সময় বহু প্রতাপশালী জজ সাহেবও তা ফেলতে পারতেন না। এই ৯ (নয়) ব্যক্তিকে বলা হতো জুরি এবং এদের মধ্যে যিনি জুরিদের রায় বিচারপতিকে জানাতেন তাঁকে বলা হতো ফোরম্যান অব দি জুরি । বিখ্যাত K. M. Nanavati v. State of Maharashtra মামলার পর ভারত বর্ষের জুরির মাধ্যমে বিচারের ধারা ১৯৭৩ সালে আইন সংশোধন করে তুলে দেওয়া হয়েছে । তবে জুরি বিচারের ধারা তার জন্মভূমি ইংল্যান্ডে আজও বিদ্যমান । আমেরিকার বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জুরি বিচার এখনো অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত । জুরিদের কেন্দ্র করে বহু মামলার রায় উলটপালট হয়ে গেছে । নতুন আইন সৃষ্টি হয়েছে এবং বহু ক্ষেত্রে বিচারকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ঘটেছে আমূল পরিবর্তন । কিন্তু মজার ব্যাপার হল, জুরি ব্যবস্থার প্রচলন কবে থেকে শুরু হল তার কোনো সঠিক ইতিহাস আজও পাওয়া যায়নি। এ সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত । তবে আধুনিক জুরি ব্যবস্থার উৎপত্তি যে ইংল্যান্ডে সে সম্বন্ধে সবাই একমত । ইংল্যান্ডে জুরি বিচার ব্যবস্থা কোন ধাঁচে করা হয়েছিল সে সম্বন্ধেও মতভেদ আছে। কারো কারো মতে এর বীজ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ট্রাইবুন্যালে নিহিত নরম্যানরা বৃটেন জয় করার পর ঐ দেশে এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন । তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে জুরি ব্যবস্থার ধারণা এসেছে গ্রীস ও রোমের বিচার ব্যবস্থা থেকে । আড়াই হাজার বছর আগে গ্রীসের নগররাষ্ট্রে সিনেটের মতো বিচারসভা বসত । বিচারসভাগুলো পরিচালনা করতেন এক একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং গণ আদালতের ন্যায় বিচারকের সংখ্যা থাকত ২০১ থেকে ১৫০১ এর মধ্যে । সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে রায় ঘোষণা করা হত । এমনি এক বিচারসভায়, ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের বিচার হয় । বিচারকের সংখ্যা ছিল ৫০১ । সক্রেটিসের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল যে তিনি গ্রীক দেবদেবীর অবজ্ঞা করেন, গণতন্ত্রের প্রতি সন্দিহান এবং যুবসমাজকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছেন । অভিযোগের উত্তরে সক্রেটিস আত্মপক্ষ সমর্থনে তাঁর সওয়াল শেষ করার পর বিচারকরা ২৮১-২২০ মতামতের ভিত্তিতে সক্রেটিসকে দোষী সাব্যস্ত করেন । বিচারকরা ভেবেছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত ও গনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ সক্রেটিস তাঁর দোষ স্বীকার করে বিচার সভার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন । কিন্তু সক্রেটিস তো তা করলেনই না বরং বললেন, গণতন্ত্রে গণতন্ত্রবিরোধী চিন্তাধারাও পোষণ করা যায়, অন্তত গনতন্ত্রপ্রেমীরা তাই প্রচার করে থাকে । তিনি প্রাণের বিনিময়েও যা সত্য মনে করেন তা ভুল বলতে পারবেন না । সক্রেটিসের ঐ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বিপুল সংখ্যাধিক্য রায়ে বিচারসভা সক্রেটিসকে প্রাণদণ্ডের হুকুম দিলেন । ইতিহাসে প্লোটোর বর্ণিত সক্রেটিসের এই বিচার থেকে আমরা জুরি বিচারের প্রথম ছবি পাই । ইতিহাস ঘাঁটলে জুরি ধাঁচের বিচার ব্যবস্থা আমরা বহু দেশে পেয়ে থাকি । প্রাচীন মিশরে এই ধরণের বিচারসভা বসত । বিচারকের সংখ্যা ছিল প্রায় তিরিশ । সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে এদের নির্বাচিত করা হত । এরাই বিরোধের নিষ্পত্তি করতেন। সাজা দেবার ভার থাকত সম্রাটের উপর ভারতবর্ষে পঞ্চায়েতি বিচারব্যবস্থা প্রাচীণকাল থেকে প্রবহমান এবং আদিবাসী সমাজে এখনো জনপ্রিয় ।

পঞ্চায়েত বিচার ব্যবস্থায় বাদী বিবাদী, উভয় পক্ষ দুজন করে বিচারক মনোনীত করে থাকেন এবং ঐ চার বিচারক পঞ্চম বিচারককে নির্বাচিত করেন। পঞ্চম বিচারক হলেন বিচারসভার মুখপাত্র । তাঁর মাধ্যমে রায় ঘোষণা করা হয় । উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলোতেও দশম শতাব্দী থেকে বার জন জুরি দ্বারা বিচারের ধারা আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই । সেই সময় জুরিরা ঘটনার বিচার ও আইনের ব্যাখ্যা দুই-ই করতেন । পরবর্তীকালে আইনের ব্যাখ্যা বিচারকরা করতেন, জুরিরা শুধু ঘটনা প্রবাহ সম্বন্ধে তাদের মতামত জানাতেন । জুরিদের রায় সর্বসম্মতিক্রমে না হলে, নতুন জুরি নিয়োগ করে আবার গোড়া থেকে বিচার শুরু হতো । তখনকার দিনে জুরিরা কোন বিশেষ শ্রেণি থেকে আসতেন না । জনসাধারণের মধ্য থেকে কোন বাছবিচার না করেই জুরিদের নিয়োগ করা হতো। এ সকল অনিয়ম ও দুর্বলতা দূর করে মার্কিন বিচারব্যবস্থায় জুরি পদ্ধতি এখনো দেদীপ্যমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় ‘জুরি’ সিলেকশান পদ্ধতি অত্যন্ত চমৎকার ও বিজ্ঞান সম্মত। নিম্নে এ সম্পর্কে আমার অর্জিত অভিজ্ঞতা পাঠকদের সামনে সংক্ষেপে তুলে ধরছি। জুরি সিলেকশান পদ্ধতি : জুরি বোর্ডের সদস্যদের জুরর (Juror) বলে। ডি.পি.এস বা ডিপার্টম্যান্ট অব পাবলিক সেইফটি বিভাগের কাজ হলো আদালতের নির্দেশেজুরি সিলেকশান করা। স্টেইট আই.ডি এবং ড্রাইভারস লাইসেন্স ইস্যু করাও এই ডিপার্টম্যান্ট এর অন্যতম কাজ। ২০০-৩০০ লোককে জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে মেশিনে রেনডম সিলেকশান করা হয়। ওদেরকে চিঠি বা সমন মারফত ন্যূনতম ৩০ দিন সময় দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোর্ট হাউজ (দেওয়ানী ও ফৌজদারী ) এ হাজির হতে অনুরোধ করা হয়। যে কোন নাগরিককে এজন্যে ডাকা হতে পারে। প্রথমে তার কি যোগ্যতা আছে তা বিবেচনা করা হয় না। তবে যদি কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারী অভিযোগ তদন্তাধীন বা বিচারাধীন থাকে কিংবা কেউ যদি সাজা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন অথবা মানসিকভাবে অসমর্থ হয়ে থাকেন তবে তিনি জুরি সিলেকশানের প্রথম পর্যায়েই বাদ পড়ে যান। ৬০ জনকে উক্ত সংখ্যা থেকে বাছাই করা হয়। তাদেরকে বিচারকের (জাজ্‌) এর সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাদী ও বিবাদী পক্ষ এবং তাদের বিজ্ঞ কৌসূলী ও সরকারি আইন কর্মকর্তাগন দুই দিকে উপস্থিত থাকেন। জাজ্‌ দু’পক্ষের এটর্নিদের সুযোগ দেন ২৪ জনকে সিলেকশান করার জন্য। দু’পক্ষের আইনজীবীগণ তাদের কিছু ছোটখাটো প্রশ্নের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে ২৪ জন সিলেকশান করেন। সেখান থেকে ২০ জন থাকবেন নিয়মিত এবং ৪ জন এডিশনাল জুরের থাকবেন। ২০ জনের মধ্য থেকে কেউ যুক্তিসংগত কারণে (যেমন- অসুস্থতা, দেশে অনুপস্থিত থাকা, কিংবা পক্ষপাতদুষ্টতা ইত্যাদি) বাদ পড়েন তবে অতিরিক্ত ৪ জনের থেকে তা পূরন করা হয়। (এসংখ্যা বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন হতে পারে। যেমন ১২, ৬ ইত্যাদি)। সাধারনত অন্য কোন ছোটখাটো অজুহাতে জুরর অনুপস্থিত থাকতে পারেন না। অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। জুড়ি বোর্ডের সদস্য তিনি যত বড় সরকারী, বেসরকারী, সামরিক, বেসামরিক দায়িত্ব পালনরত থাকুক না কেন তাকে দেশে থাকলে অবশ্যই বিচারের দিন স্ব স্ব নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সবেতন ছুটি দিতে বাধ্য। কোন কোন জুরির মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালতে অবস্থান করতে হয়। তা ছয় দিনও হতে পারে ছয় মাসও হতে পারে। যেমন- ক্যালিফোর্নিয়ায়, ১৯৯৪ সালের দিকে বরেণ্য ফুটবলার কৃষ্ণাঙ্গ মিঃ ওজেসিম্‌সন এর শ্বেতাঙ্গ স্ত্রী হত্যার মামলায় জুরররা মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি যেতে পারেনি। বিশেষ কোন কারণ ছাড়া, যেমন- পরিবারের নিকটতম কারো মৃত্যু, বা জুরর এর স্বাস্থ্যগত কোন সিরিয়াস কারণ ছাড়া তারা বাড়ি যেতে পারেন না। তাদের এসময় নিউজ পেপার পড়া, টি.ভি দেখা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এমনকি জুররগণ পরস্পর ব্যতিত পরিবারিক আপনজনদের সাথেও মামলা নিয়ে আলোচনা করা নিষেধ। তাদের কোন হোটেল বা বাসা ভাড়া দেয়া যাবে না। আদালত ক্যাম্পাসে বা নির্দিষ্ট সরকারি বাসায় তারা অবস্থান করবেন। শুধু থেংস গিভিংস ড্থেতে তারা রাষ্ট্রীয় ছুটির দিনে ফ্যামিলির সাথে উক্ত মামলায় দেখা করতে পেরেছিলেন। ডিপার্টম্যান্ট অব জাস্টিস এর নির্দেশনা অনুযায়ী তারা মামলায় শুনানী পর্যবেক্ষণ করেন এবং শুনানী শেষে নিজদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে কোন্‌ বিষয়টা সন্দেহজনক কিংবা সত্য তার সম্পর্কে মন্তব্য করেন। কোন কোন সিদ্ধান্ত একই দিনে হয়ে যায়। এটা মামলার মেরিট ও ধরনের উপর নির্ভর করে। কোন কোন মামলা ৬ মাস ১ বছরও লাগতে পারে। সমাজের উপর জুরি ব্যবস্থার সুফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। কেননা ১ জন বিচারক বিচারের রায় প্রদানকালে শুধু নিজস্ব অভিমত দিয়ে থাকেন, কিন্তু জুরি ব্যবস্থায় সমাজের বিভিন্ন চিন্তা চেতনার ও স্তরের মানুষের সম্মিলিত বিবেচনা প্রাধান্য পায়। বাছাইকৃত জুরিদেরকে জাজ আইন ও এর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও ধারণা দিয়ে থাকেন। তারা মনোযোগ সহকারে নীরবে পুরো ট্রায়েল পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। জরিপে দেখা গেছে ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে জুরিরা অপেক্ষাকৃত দ্রুত সিদ্ধান্তে বা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছেন। প্রশিক্ষণকালে জাজ জুরিদের এধারণা প্রদান করেন যে, মামলা প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্র পক্ষের এবং বিচারে অপরাধ প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত একজন নিরাপরাধ নাগরিক। জুরিদের ঐকমত্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জাজ্‌ রায় প্রদান করে থাকেন। যদি ১২ জন কিংবা ততোধিক বোর্ডের জুরিদের মধ্যে একজনও বিন্দুমাত্র দ্বিমত পোষণ করেন তাহলে পুরো ট্রায়েলটা ঝুলন্ত (হ্যাংগ) হয়ে যাবে। যা পুনরায় আয়োজন করা হতে পারে। সব মামলায় জুরি নিয়োগ করতে হয় না। যেসব মামলায় কোন পক্ষ জুরি বোর্ড গঠনের আবেদন জানায় সেক্ষেত্রে আবেদনটি গ্রহণযোগ্যতা পায়। অথবা বিচারক এব্যাপারে অপসন বা বিকল্প দিয়ে থাকেন। মার্কিন ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থায় অভিযুক্তকে সুযোগ দেয়া হয়। তিনি কোন ধরনের ট্রায়েল (বিচার) চান। তিনি কি একজন বিচারক দ্বারা পরিচালিত বেঞ্চ ট্রায়েল চান, নাকি জুরি পদ্ধতির বিচার চান। জুরি পদ্ধতির বিচার চাইলে তারপর শুরু হয় জুরর নির্বাচন। পোটেনশিয়াল জুররস গ্রুপ নির্বাচনের জন্য আদালতে হাজির হতে সমন জারী করা হয়। তারা হাজির হলে প্রকাশ্য আদালতে প্রসিকিউটর ও ডিফেন্স এটর্নিগণ সাধারণ এবং সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মাধ্যমে জুররসগণ উক্ত সার্ভিসের জন্য যোগ্য কিনা যাচাই করে থাকেন। যেমন- তারা উক্ত রাষ্ট্রের নাগরিক কিনা? ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে তাদের ধারণা আছে কিনা? তিনি কখনো ফৌজদারী অপরাধের কারণে বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন কিনা? আলোচ্য মামলা সম্পর্কে তার কোন আগাম ধারণা আছে কিনা? ইত্যাদি। বিচারকালে জুররদের ভূমিকা হবে পরোক্ষ। তারা মনোযোগ সহকারে এটর্নিদের যুক্তি তর্ক সাক্ষীদের সাক্ষ্য জেরা ইত্যাদি শ্রবণ করেন। সাধারনত তারা সাক্ষী ও জাজ্‌কে কোন প্রশ্ন করতে পারেন না। এমনকি কোর্ট প্রসিডিংস এর কোন নোটও নিতে পারেন না। এটা আমেরিকার আদালতের প্র্যাকটিস ও ট্রেডিশন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে জুরি ব্যবস্থা বিভিন্ন রকম হলেও এর মৌলিক কোন পার্থক্য নেই।
মার্কিন সংবিধানে একে সমর্থন করা হয়েছে। আমার বন্ধু মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী চট্টগ্রামের পটিয়ার মালিয়ারা গ্রামের বিশিষ্ট সমাজ সেবক আলহাজ্ব খলিলুর রহমান চৌধুরীর বড় সন্তান। তিনি ১৯৮৭ সন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী একজন ইনভেস্টম্যান্ট ব্যাংকার। ট্যাক্সাসের হিউষ্টনে বসবাসকালে পর পর ৩ বার তার নাম জুরি বোর্ডে আসে। তার অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় জুরি সিস্টেম একটি চমৎকার ব্যবস্থা। এর ফলে বিচার ব্যবস্থার উপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, প্রতিদিন আমি জুরর হিসেবে সম্মানী পেয়েছি ৪৬ ডলার, কিন্তু গাড়ি পার্কিং চার্জ দিয়েছি প্রতিদিন ১৮ ডলার। এতদ সত্ত্বেও এই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নিজেকে সম্মানিত মনে করেছি। আমেরিকার সিকিউরিটি/ সেইফটি ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আমার ফুফাত ভাই কাশেম সেও নিউইয়র্কে একবার জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে একটি মামলার দায়িত্ব পালন করেন। যা ৩ দিনে শেষ হয়। এটি একটি মটর এক্সিডেন্টের মামলা। সেখানে ইচ্ছাকৃত খুন হয়নি। তবে ইন্সুরেন্স কোম্পানীকে ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। সেদেশে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় ক্ষেত্রে জুরি ব্যবস্থা বিদ্যমান। উপরের আলোচনায় আমেরিকায় বিচার ব্যবস্থায় সাধারণ জুরি প্রসেস আলোচিত হলো। আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় জুরি পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। কেননা একজন বিচারকের মন-মেজাজ অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না। সেক্ষেত্রে এপদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ। বিষয়টি নিয়ে এদেশের আইনবিদ, আইন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা নতুনভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করতে পারেন । কারণ এর সাফল্য সুদূরপ্রসারী ।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট এবং মানবাধিকার কর্মী।

Top