রোহিঙ্গাদের অতি শীঘ্রই তাঁদের বাস্তুভূমিতে ফেরত নেয়া হোক !–মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

unnamed-1.png

————————-
বাংলাদেশ মানবিকতার, সহানুভূতির, সহমর্মিতার পরিচয় দিতে গিয়ে, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সহায় সম্বলহীন অসহায় আবাল বৃদ্ধ বণিতাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। মায়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, গ্রামের পর গ্রামে জ্বালিয়ে দেয়া, রাখাইয়ান প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর জাতিগত নিধনের কারণে গত বছর আগষ্ট থেকে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দেয়া শুরু হয়। গত বছরে আসা ৬ লাখ সহ গত কয়েক দশক ধরে আসা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। “রোহিঙ্গা বসতির কারণে ৬ হাজার একর বন উজাড়। জ্বালানি জোগার করতে রোহিঙ্গারা বনের গাছ কাটছে। এভাবে চললে উখিয়া ও টেকনাফের বন উজাড় হয়ে যাবে, বলছে বন অধিদপ্তর’”।{সূত্রঃ প্র/ আলো, ১৭ সেপ্টেম্বর’ ১৮}। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘রোহিঙ্গাদের চাপে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফের পরিবেশ, বনভূমি ও জীব বৈচিত্র্যে হুমকির মুখে পড়েছে। রোহিঙ্গা বসতির কারণে গত এক বছরে প্রায় ৬ হাজার বন ধ্বংস হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ ৫৪৯ কোটি ৬০ লাখ’।

আমরা জাতিগতভাবে প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশ ধবংসে বড়ই নির্দয়, আগ্রাসী, বিধ্বংসী, বেপরোয়া। প্রকৃতির আশীর্বাদকে আমরা শুভ সুন্দরভাবে কাজে না লাগিয়ে তাকে ধবংসে উন্মত্তায় মেতে আছি। আমরা সবুজ সুন্দর বন জংগল কেটে সাবাড় করে দেই, পাহাড় কাটি, সবুজ বন প্রান্তর দখল করি, বাদ যায়না দিঘী পুকুর ডোবা জলাশয় খোলা প্রান্তর কখনো দেশের উন্নয়নের নামে কখনো বৈধ বা অবৈধভাবে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে, কিছু অংশের অনুমতি নিয়ে পুরো পাহাড় সাবাড় করে ফেলছে প্রভাবশালীরা কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে। আবার ১০ ট্রাক গাছের পারমিট নিয়ে বনবিভাগের ২০/ ৩০ ট্রাক গাছ লোপাট হয়ে যায় প্রজাতন্ত্রের কিছু লোভী কর্মকর্তাদের কারণে। বৈধ বা অবৈধভাবে অপরিকল্পিত ভাবে খাল বিল নদী নালা দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। যত্রতত্র যেনতেন ভাবে কোন সুষ্ঠু নীতিমালা ছাড়াই গড়ে উঠছে আবাসিক এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানা। যার কারণে শহরে সৃষ্টি হয় অল্প বৃষটিতে জলাবদ্ধতা, ঘটে পাহাড় ধ্বসে করুণ শোচনীয় প্রানহানী। তারপরেও আমাদের হয়না বোধোদয়। নিজেদের স্বার্থে মানুষ প্রকৃতি পরিবেশ আর প্রতিবেশ ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত। এই যখন আমাদের মন মানসিকতা এবং দেশের সার্বিক অবস্থা। তখন আরেকটি খবর দেশ ও জাতিকে উদ্বিগ্ন উৎকণ্ঠিত শঙ্কিত না করে পারেনা। বলছি সাময়িক আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গা বসতির জন্য ৬ একর বন ইতিমধ্যেই উজাড় হয়ে গেছে। সবাই রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন ধরণের ত্রাণ দিচ্ছে কিন্তু রান্নার জন্য জ্বালানির ব্যবস্থা করছে না কেউই। ফলে রান্নার জন্য তাঁরা প্রতিদিন বনের গাছ কাটার পাশাপাশি শিকড়ও তুলে ফেলছে। এভাবে চলতে থাকলে উখিয়া আর টেকনাফের বন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে বলে বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে। এক তথ্যে থেকে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ নিয়ন্ত্রণাধীন উখিয়া ও টেকনাফের ৫ হাজার ৮৩৫ একর বনভূমি ব্যবহৃত হচ্ছে,যার পুরোটাই উজাড় হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৪ একর সৃজিত বন ( প্রধানত সামাজিক বনায়ন) এবং ৩ হাজার ৮১১ একর প্রকৃতিক বন। এ পর্যন্ত ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮৮০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী বনাঞ্চলে স্থাপন করেছে। অপরদিকে রোহিঙ্গা শিবির স্থাপন নিয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলের (ইউএনডিপি) ‘দ্রুত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিংজ্ঞাদের শিবিরগুলো প্রতিবেসগত সংকটাপন্ন স্বীকৃত তিনটি এলাকার প্রকৃতি ধ্বংস করছে। এগুলো হচ্ছে টেকনাফ উপদ্বীপের উপকূল এলাকা, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপ। এছাড়া শিবিরগুলোর কাছে আরো দুটি সংরক্ষিত এলাকা – হিমছড়ি ন্যাশনাল পার্ক ও টেকনাফ অভয়ারণ্য। প্রস্তাবিত ইনানি ন্যাশনাল পার্কও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শুধু তাই নয়, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, কক্সবাজার এলাকার পাহাড়গুলো প্রধানত নরম দোআঁশ মাটি দ্বারা গঠিত। তাই মাটির বন্ধন, কাঠিন্যতা এবং দৃঢ়তা কম। ফলে কয়েকদিনের বৃষ্টির ফলে মাটি নরম এবং আলগা হয়ে যাওয়ায় পাহাড় ধ্বসের শঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে। রোহিঙ্গা জন বসতির কারণে পাহাড় ন্যাড়া ও বন উজাড়, বন্য জন্তুর আবাসস্থল, বিচরণ ক্ষেত্র এবং অভয়ারণ্য ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে যার ফলে হাতির আক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলছে। বাড়ছে মানুষের সাথে হাতির সংঘাত। হাতির আক্রমণে এ পর্যন্ত ১২ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে জানা যায়। রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যেই তাঁরা নিজদের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষে ২২ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। মামলা হয়েছে ৪ শতাধিক। তাঁরা অস্ত্র মাদক ব্যবসা সহ নারী পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে আশ্রিত রোহিঙ্গারা। ফলে স্থানীয়দের উপর কুপ্রভাব পড়ার আশংকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ওরা মিশে যাচ্ছে যা দেশের শান্তি শৃংখলা স্থিতিশীলতার নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

বাংলদেশের বনাঞ্চল উজাড় বা পাহাড়কে ন্যাড়া করে প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস এবং ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে তা শুধুমাত্র সামাজিক বনায়নের মাধ্যেমে পূরণ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। কেননা শুধু গাছ লাগালেই এর সমাধান হবেনা কেননা পরিবেশের পাশাপাশি ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিবেশ ও জীব বৈচিত্র ফিরিয়ে আনা অসাধ্য একটি ব্যাপার। কেননা প্রকৃতিকে সবকিছু সুন্দরভাবে দিয়ে সৃজন করেছেন সৃষ্টিকর্তা। ধ্বংস বা হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন বিরল প্রজাতির কীট পতঙ্গ, জীব জন্তু, জলজ ও বন্যপ্রাণী সহ বিভিন্ন প্রজাতিগুলোকে কারো পক্ষেই পূরবাস্থায় ফিরিয়ে আনা অবাস্তব ও অসম্ভব বিষয়। জ্বালনির জন্য বনাঞ্চলের ক্ষতির পরিমাণ টাকার অঙ্কে ৫৪৯ কোটি ৬০ লাখ হলেও প্রাকৃতিক ভাবে এর ক্ষতির পরিমাণ অসীম এবং অপূরণীয়। একটি দেশের ৬০০ একর বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। যার বিরূপ রুদ্র রুঢ় কুপ্রভাব পড়বে দেশের প্রকৃতির উপর। ভারসাম্যহীন আর অসিষ্ণু হয়ে উঠবে প্রকৃতি। বাংলাদেশ এই প্রাকৃতিক ঝুঁকি এবং সমস্যার মোকাবেলা তার সীমিত সম্পদ এবং সুযোগ সুবিধা নিয়ে কিভাবে করবে বা এর মূল্য কিভাবে দিতে হবে তা ভাবনারও অতীত।

মোটা দাগে বলা যায় দেশের পক্ষে রোহিঙ্গাদের বোঝা বহন করা কোনভাবেই আর সম্ভবপর নয়। গত ২৯ সেপেট্মবর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে “বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমার সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কথা জাতিসংঘে তুলে ধরে এক বছরেও প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে, তাই এর সমাধান সেখানেই হতে হবে”। আশা করি বিশ্ব জনমত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাঁদের বাস্তুভূমি মায়ানমারে ফেরৎ নিতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে। চীন, ভারত, রাশিয়া যারা মায়ানমারের পক্ষে তাঁদেরকে বাংলাদেশের পক্ষে আনতে কূটনৈতিকভাবে সচেষ্ট হতে হবে। তা নাহলে বাংলাদেশ বনাঞ্চল, পাহাড়, প্রাকৃতিক ভারসাম্য যা ইতিমধ্যেই প্রায় ধ্বংস হওয়ার পর আর যা অবশিষ্ট আছে তা রক্ষা করা সম্ভব হবেনা। সামাজিক মানবিক নৈতিক অবক্ষয় রোধ করার পাশাপাশি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধরাকে রক্ষা করা এবং দেশের শান্তি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য রোহিঙ্গাদের তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো অত্যন্ত জরুরী। জাতির প্রত্যাশা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সংকট সমাধানে বিশ্ববাসী মানবিক বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে। রোহিঙ্গারা নিঃসংকোচে, নিরাপদে ফেরৎ যাবে তাঁদের দেশে।

Top