‘শিশুদের প্রতি আমাদের আরো বেশী দায়িত্বশীল হতে হবে’–জিয়া হাবীব আহ্‌সান

29216120_1799822453414068_2923514977744584704_n.jpg

 

শিশু অধিকার নিয়ে ‘একসেস টু জাস্টিস’ শীর্ষক সেমিনারের একটি মানবাধিকার প্রতিবেদন ‘ :

দেশ বরেণ্য মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট এলিনা খানের পরিচালনাধীন মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন- বিএইচআরএফ – এর উদ্যোগে ‘অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়া শিশু, কিশোর-কিশোরীদের অধিকার রক্ষায় মানবাধিকার কর্মীদের ভূমিকা’ – শীর্ষক এক সেমিনার গত ১০ মার্চ চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় । সকাল ৯.৩০ টায় শুরু হয়ে সেমিনারটি ২.৩০ টায় সমাপ্তি ঘটে । অনুষ্ঠানে বিচারপতি, বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রবেশন কর্মকর্তা, উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা, ভিকটিম, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জনপ্রতিনিধি, তৃতীয় লিঙ্গ, কারা পরিদর্শক, শিল্পদ্যোক্তা, চিত্র নির্মাতা, বিএইচআরএফ-এর বিভিন্ন শাখা প্রতিনিধি, এনজিও কর্মী, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ।

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকার কর্মী প্রবীণ আইনজীবী এডভোকেট সুনীল সরকার উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে সেমিনার শুরু হয় । এডভোকেট সুনীল সরকার আগত অতিথি ও উপস্থিত বি.এইচ.আর.এফ নেতৃবৃন্দকে স্বাগত জানান । তিনি উপস্থিত বিচারপতি এ.এফ.এম আবদুর রহমান ও সংগঠনের পৃষ্টপোষক পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সুফি মিজানুর রহমানকে কৃতজ্ঞতা জানান ।

সেমিনার মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন সংগঠনের প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারপার্সন এডভোকেট এলিনা খান । তিনি আগতঃ অতিথিদের স্বাগত জানান এবং সেমিনার সফল করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহবান জানান । সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের ডাইরেক্টর অর্গানাইজিং এবং চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি এডভোকেট এ এম জিয়া হাবীব আহ্‌সান । সেমিনারে একে একে বক্তব্য রাখেন মাননীয় বিচারপতি এ.এফ.এম আবদুর রহমান, আলহাজ্ব সূফি মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ -০১ ও শিশু আদালতের বিজ্ঞ বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস, অর্থ ঋণ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ও যুগ্ম জেলা জজ আবু হান্নান, পিরোজপুর ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যালের বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, ডি.সি.ডি.বি(সিএমপি)হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক সভাপতি এডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী, সাইক্রিয়াটিস্ট অধ্যাপক ড. শফিউল হাসান, বিএইচআরএফ ডাইরেক্টর অংশু আসিফ পিয়াল, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী মর্জিনা বেগম, সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর ও বেসরকারী কারা পরিদর্শক জেসমিন পারভীন জেসী, সমাজসেবা প্রবেশন অফিসার পারুমা বেগম, নারীকণ্ঠের সম্পাদিকা শাহারিয়ার ফারজানা, প্রতিবন্ধী সংগঠন সিডিসি’র পরিচালক লুৎফুন্নেচ্ছা রূপসা, সিএমপি ইপিজেড থানা পুলিশের এস.আই আসাদুজ্জামান, এস.আই ছন্দা ঘোষ, তৃতীয় লিঙ্গ সমাজের প্রতিনিধি মৌসুমি হিজড়া, শারীরিক প্রতিবন্ধী কবি আবছার উদ্দিন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ । ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন সংগঠনের চট্টগ্রাম শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এ.এইচ.এম জসীম উদ্দীন । আরও বক্তব্য রাখেন, এডভোকেট সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, এডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ হারুন, সাংবাদিক এয়ার মুহাম্মাদ, এডভোকেট আবুল খায়ের, মোহাম্মদ এরশাদ আলম, এডভোকেট প্রদীপ আইচ, এডভোকেট ফিরোজ দেওয়ান, এডভোকেট সাইফুদ্দিন খালেদ সহ আরও অনেকে । অনুষ্ঠানে সংগঠনের শাখা প্রতিনিধি ও প্যানেল আইনজীবীগণ উপস্থিত ছিলেন ।

প্রধান অতিথি বিচারপতি এ.এফ.এম আবদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের চিন্তা করতে হবে, নেক্সট জেনারেশনের জন্য আমরা কি রেখে যাচ্ছি ।’ সুপ্রীম কোর্ট সমাজে শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করে যাচ্ছে । আক্ষেপ করে তিনি বলেন, কোথাও হারিয়ে গেলো আমাদের আদর্শ লিপি ? যেখানে লেখা ছিল -‘সকালে উঠিয়া আমি, মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি ।’ তিনি প্রশ্ন করেন, মানুষ হিসেবে আজ আমরা কোথায় আছি ? শুধুমাত্র পুলিশ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না – উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যেককে আল্লাহ্‌র বান্দা হিসেবে গড়ে উঠতে হবে । তিনি আরও বলেন, ‘ধর্মীয় অনুশাসন থেকে আমরা দূরে সরে গেছি । পরিবারে সর্বত্র সালাম প্রচলন করুন, ইসলামের বিধি-বিধান প্রচলন করুন । এ পরিবেশে যে শিশু বেড়ে উঠবে সে বিপথে যাবে না । থানায় থানায় শিশু আইনের বিধান পালনের জন্য ভালো অফিসারের ব্যবস্থা করতে হবে । শিশু অধিকার আইনে কোন জটিলতা থাকলে তা প্রাঞ্জল করতে হবে । বিচারপতি আবদুর রহমান আরও বলেন, শিশুদের কোনো অবস্থাতেই কারাগারে নেয়া যাবে না । বিচারকালীন শিশুকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়া সর্বনিকৃষ্ট পন্থা  । সেফ কাষ্টোডিতে নেয়া যাবে না । প্রত্যায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে । থানায় জামিন না পেলে করেকশান হোমে পাঠাতে হবে । তিনি বলেন, আইনের ৫২(৫) ধারা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে পাঠাতে হবে । কোন অবস্থাতেই কারাগারে পাঠানো যাবে না ।

 

পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সুফি মিজানুর রহমান বলনে, আগেকার ছোটবেলার শিক্ষায় ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে’ ; ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি; সারদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ কোথায় হারিয়ে গেছে । আজকালকার শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’ নীতি অবলম্বন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, শিশুদের ভালভাবে গড়ে তুলতে হলে বাবা মাকে ভালো মানুষ হতে হবে । আজকাল মানুষ যা বলে, তা আমল করে না । আমরা ভালো হলেই সন্তানরা ভালো হবে । তারা যাতে চরিত্রবান হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে । তাদের মধ্যে মানবিকতা, দেশপ্রেমের মতো শিক্ষাগুলো ইনঞ্জেক্ট করতে হবে । সন্তানরা আল্লাহ্‌র নেয়ামত । শিশুদের খারাপ বিষয় নিয়ে তাদের সামনে মন্তব্য করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদেরকে আস্থাশীল হতে শেখাতে হবে । বাবা-মার মধ্যে ভালোবাসা থাকলে, তা শিশুদের মাঝে ভালো প্রভাব পড়ে । জনাব মিজান বলেন, শিশুদের সামনে বাবা-মার ঝগড়া করা উচিত নয় । শিশুদের মেহমানদারী শেখাতে হবে । তাদের হাতে টাকা পয়সা দেয়া উচিত নয় । প্রতি সপ্তাহে একবার শিশুদের স্কুলে তাদের পড়াশোনার খবর নিতে হবে’ । পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে একটি বিশ্বমানের আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার ঘোষণা দেন ।

 

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বি.এইচ.আর.এফ এর ডাইরেক্টর (অর্গানাইজিং) ও চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি এডভোকেট জিয়া হাবীব আহ্‌সান । মূল প্রবন্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু কিশোরদের মানবাধিকার বাস্তবায়নে তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ১৪ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয় । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ চিহ্নিত করা ; সমাধানের উপায় খোঁজা ; বয়সের সংজ্ঞা’র জটিলতার অবসান ; এ সংক্রান্ত ফৌজদারী আইনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা ; তাদের থানা ও জেলা হাজতে দাগী আসামীদের সাথে রাখা যাবে না; বয়স নির্ধারণে মাননীয় বিচারকের স্ব-প্রণোদিত ডাক্তারী পরীক্ষার নির্দেশনা প্রদান ; নানামুখি হয়রানী ও পুলিশী নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পরিবারের জিম্মায় তুলে দেয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি ।

 

মূল প্রবন্ধে ১৮ দফা সুপারিশও উপস্থাপন করা হয় । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের অপরাধ তদন্তে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদান; সংবিধান স্বীকৃত অধিকারসহ শিশু অধিকার সনদ প্রতিষ্ঠা ও সম্মুন্নত রাখতে ‘শিশু ন্যায়পাল’ নিয়োগ এবং এজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করতে হবে ; সকল সরকারী ও বেসরকারী অফিসে ও থানায় থানায় শিশু ও কিশোরদের অধিকার সংক্রান্ত তথ্যাবলী টাঙ্গানোর উদ্যোগ নিতে হবে, তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা ইত্যাদি । শৈশবকে মানবিকতার একটি সুন্দর সকাল উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে প্রত্যাশা করা হয়,  সেই সকালকে ধরে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য ।’’ শিশুরা কখনো খারাপ অবস্থার শিকার হবে না’ আমাদের সবার স্লোগান হওয়া দরকার ।

 

 

শিশু আদালতের বিজ্ঞ বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, শিশুর বয়স নির্ধারণে বিচারক, আইনজীবী ও পুলিশকে একযোগে কাজ করতে হবে । তিনি উল্লেখ করেন, কোন শিশু আর কারাগারে যাবে না । তিনি কিছু সুপারিশ উল্লেখ করেন । অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের ব্যাপারে মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে – বাচ্চাদের সবসময় মনিটরিং করতে হবে, তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে ; জিপিএ ৫ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা ঠিক নয় ; মানবিকতা, ভালোবাসা দিয়ে আইনের প্রয়োগ করতে হবে ; অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের ভালো মানুষ হতে পরিবেশ দিতে হবে ; সুস্থ চিন্তা, মানবিক গুণবলী, কাউন্সেলিং করে শিশুদের অপরাধ থেকে মুক্ত রাখতে হবে ; পিতামাতাকে সৎ চরিত্রবান হতে হবে, তাহলেই শিশুরা চরিত্রবান হবে ; কেবল আইন দিয়ে শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধ করা যাবে না ; আমাদের সবাইকে শুদ্ধাচারী-সত্যাচারী হতে হবে ; মোবাইল ফোনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে ; যেকোন ভাবেই হোক, খেলার মাঠ উম্মুক্ত রাখতে হবে ।

 

বিজ্ঞ বিচারক যুগ্ম জেলা জজ মোহাম্মদ আবু হান্নান বলেন, শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া থেকে বাঁচতে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর নীতি অবলম্বন করতে হবে । অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুরা অপরাধ সংগঠিত করাকে বিনোদন, এডভেঞ্চার, এমেচার কাজ মনে করছে উল্লেখ করেন । বিজ্ঞ বিচারক আক্ষেপ করে বলেন, আমরা তাদের ভালো মানের শিক্ষা দিতে পারছি না । সমাজে এক সময় ফেন্সিডিল, গাঁজা সেবন, মাদক ছিল । এখন বাবা (ইয়াবা) তার স্থান দখল করেছে । ইয়াবায় আসক্ত হয়ে শিশু কিশোররা পর্নোগ্রাফিতেও আসক্ত হচ্ছে । এভাবে কোথায় যাচ্ছে আমাদের সমাজ ? কোথায় যাচ্ছে এ প্রজন্ম ? আমরা চিন্তাও করতে পারছি না । তিনি কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন । এগুলো হলো- সবাই মিলে শিশু কিশোরদের বাঁচাতে হবে ; শিশু-কিশোরদের খেলার স্পেস নষ্ট করা যাবে না ; শিশু আইনকে যুগোপযোগী করতে হবে ইত্যাদি ।

 

বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান তার নিজের পুরস্কার প্রাপ্তিতে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সমাজে ব্যাপারটা এমন হয়েছে, স্বাভাবিক কাজ করলে সেটা অস্বাভাবিক হয়ে যায়, আমি স্বাভাবিক কাজ করেছি । আইনে যা আছে তাই অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি । মনে হয় না, বেশী কিছু করেছি । কেবল আইন দিয়ে শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধ করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, বিচারাধীন কোন মামলায় শিশুদের কারাগারে পাঠানো যাবে না , এক সময় এই নিয়মটা ছিলও না ।

 

ডি.সি.ডি.বি(সিএমপি) জনাব হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে শিশুরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে । শিশুরা নিজে থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে । এজন্য সবার সচেনতা দরকার । সি.এম.পি থেকে শিশু কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া থেকে বাঁচাতে প্রচারণা সহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ।

 

এস আই আসাদুজ্জামান বলেন, শিশুর প্রকৃত বয়স নির্ধারণ করা অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্ভব হয় না । অপরাধে জড়িয়ে পরা শিশুর সাথে কেউ না থাকলে তার কাছ থেকে বয়স জিজ্ঞাস করা হয় কিংবা তার সাথে কেউ থাকলে তার কাছে জিজ্ঞাসা করে এজাহারে বয়স লিখা হয় । পরবর্তীতে স্থানীয় থানা হতে ইনফরমেশন স্লিপ এর মাধ্যমে রিপোর্ট তলব করা হলে সেখানে দেখা যায় ভিন্ন বয়স । যার কারণে এজাহার কিংবা চার্জশীটে বয়সটা ঘষামাজা হয়ে থাকে । পুলিশ যে সব সময় খারাপ কাজে লিপ্ত থাকে তা নয় । পুলিশ অনেক ভাল কাজও করে থাকে । ভালো কাজের পুরস্কার স্বরূপ তিনি বিএইচআরএফ এর কাছ থেকে ক্রেস্ট এর প্রত্যাশা করেন । তিনি আগে বলেন, এ কারণে ক্রেস্ট প্রদান করলে পুলিশ ভাল কাজ করতে আরো আগ্রহী হবেন । অন্তত এই পুরস্কারের জন্য হলেও ভালো কাজ করতে আগ্রহী হবে ।

 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন অফিসার পারুমা বেগম একটি শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে থানায় জি.আর.ও’র কাছ থেকে দুর্ব্যবহারের মুখোমুখি হয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, শিশুদের ব্যাপারে সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে ।

 

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী উল্লেখ করেন, আইনের প্রয়োগ ; সরকারী ডিপার্টমেন্ট সব আছে । কিন্তু বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া যায় না । শিশুদের আদালতে আনা নেয়ার ক্ষেত্রে আছে প্রিজন ভ্যানের সংকট । সর্ব জায়গায় সমস্যা আছে । এসবের মাঝেও এগুতে হবে । তিনি কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন । এগুলো হলো – শিশু কিশোরদের খেলার মাঠগুলো রক্ষা করতে হবে, স্কুলের হেড মাষ্টারসহ উক্ত স্কুলের সকল শিক্ষকদের সন্তানদের সে স্কুলেই পড়াতে হবে, প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিগণের সন্তানদের নিজস্ব এলাকার স্কুলে পড়াশুনা করাতে হবে, যাতে করে তারা এবং তাদের অধঃস্থন ব্যক্তিরা মাঝে মধ্যে স্কুল পরিদর্শনে যাবেন এবং পড়ালেখার খবর নেবেন । তাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিশুদের পড়াশুনার ব্যাপারে সজাগ থাকবে । অফিস থেকে স্কুলের পড়াশোনার খবর নিতে হবে, সন্ধ্যার পর সন্তানরা বাসায় ফিরছে কিনা এ জন্য অভিভাবকদের খবর নিতে হবে ।

 

জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রচলিত শিশু আইন পরস্পর বিরোধী । এ আইনে শিশুদের বিচারের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। শিশুদের সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে ।

 

সেমিনারের সভাপতি ও সঞ্চালক এডভোকেট এলিনা খান অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু–কিশোরদের প্রতি পুলিশের ভালো ব্যবহার প্রত্যাশা করেন । শিশু–কিশোরদের বয়স নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রায়শঃ তা করা হয় না । বিএইচআরএফ বিভিন্ন প্রজেক্টে পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য এডভোকেট এলিনা খান দেশের প্রখ্যাত শিল্পপতি ও চিন্তাবিদ আলহাজ্ব সুফি মিজানুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

 

ধন্যবাদসূচক মন্তব্যে সংগঠনের চট্টগ্রাম জেলা শাখার সম্পাদক এডভোকেট এএইচএম জসীম উদ্দীন আগামীর সব শিশু মানবাধিকার শিশুতে পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা করেন এবং সেমিনারে অংশ নেয়া প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানান ।

 

এর আগে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান, বিজ্ঞ বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস, বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, বিজ্ঞ বিচারক আবু হান্নান ও পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সুফি মিজানুর রহমানকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয় ।

 

এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিএইচআরএফ’র শাখা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্যানেল আইনজীবী, স্টুডেন্ট কাউন্সিল সদস্যদের পরিচয়পত্র প্রদান করেন প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান এডভোকেট এলিনা খান । তিনি আগামীতে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিএইচআরএফ কর্মীদের করণীয় সম্পর্কে ব্রিফিং দেন ।

 

সভা শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় । এতে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনান বিজ্ঞ বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস ও আঞ্চলিক কবি আসহাব উদ্দিন আহমদ । সঙ্গীত পরিবেশন করেন এডভোকেট এহশেশামুল হক জুয়েল, কাজল মজুমদার, প্রিয়স্মিত সরকার সহ আরও কয়েকজন ।

 

লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী ।                                                             

Top