ঢাকা২০শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হারিয়ে যাওয়া একটি বাজারের আত্মকাহিনী

প্রতিবেদক
নিউজ ভিশন

ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১ ৯:৫০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মোঃ আবু সঈদঃ
এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী একটি বাজার বাংলা বাজার। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের গাগলী নারাইনপুর গ্রামের মধ্যবর্তী স্হানে সুরমা নদীর তীরে গড়ে উঠা প্রাচীনতম এই বাজারটি। বাজারটি পাকিস্তান আমলে গড়ে উঠেছিল বিধায় বাজারটির নামকরণ হয়েছিল পাকিস্তান বাজার। কালক্রমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাজারটি বাংলাবাজার নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। কালের বিবর্তনে সময়ের প্রয়োজনে গড়ে উঠা বাজারটির এখন আর অস্হিস্ত নেই। নেই বাজারের কোন চিহ্ন রেখা। সময়ের অকাল গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে বাজারটির সজীবতা। তখন সময়ে দিরাই-শাল্লার যাত্রীদের একমাত্র যাতায়াত পথ জয়কলস লঞ্চঘাটে আসতে-ফিরতে বাজারটি চোখে পড়ত দৃশ্যমান হয়ে। ঘাটে লঞ্চ লাগিয়ে যাত্রীদের উঠানামা ছিল চোখে পড়ার মত। শতবছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী জয়কলস উজানীগাঁও রশিদীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে বাজার সংলগ্ন গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীদের আসা-যাওয়া ছিল নদীপথের এই বাহন দিয়ে। বাজার সন্নিকটে লঞ্চ ঘাটটিও এখন আর নেই। নিকটতম গ্রামের লোকজন নিজেদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের নিত্য ব্যবহার্য্য দ্রব্য সামগ্রী কেনার জন্য উত্তাল তরঙ্গে স্রোতের বেগে নৌকা দিয়ে নদী পার হয়ে পথ চলত। ঘাটে বাঁধা খেয়া নৌকাগুলো এখন আর চোখে পড়ে না। যাত্রীদেরও নেই আনাগেনা। নদী শুকিয়ে এখন চৌচির মরুভূমির ধূসর বালুচরে ঘাস জন্মিয়েছে। হেমন্তে মরুভূমি দিয়ে পায়ে হেটে লোকজন এপার-ওপারে পথ চলতে পারে সমযের তালে তালে। ভরাট হওয়া নদীতে বর্ষায় স্রোতের বেগ পরিলক্ষিত হয় উপচে পড়ার মত। বাজারের গলিটি ছিল চোখে পড়ার মত সাজানো গোছানো। দু’পাশে দোকানের সারি সারি ঘর আর ডিজেল চালিত রাইচ মিলের আনাগোনায় বাজার সরগরম থাকত সর্বক্ষণ। রবিবার ও বুধবারে সাপ্তাহিক হাটে জমে উঠত মানুষের ভীড়। দুর-দুরান্ত হতে আসা খোলা দোকানগুলোর সারিতে চারদিক জমে উঠত কৌতুহলির আমেজে। সন্ধ্যায় আবার বাড়ি ফেরার পালা। বর্ষায় বাজারের চারপাশে বাঁধা নৌকাগুলোর সারি অপরুপ সৌন্দর্য্যের রুপ ধারণ করত। নদীর তীর সংলগ্ন মাঠে লঞ্চ ঘাটের সামনে জেগে উঠত কুশল বিনিময়ের দৃশ্যমান আয়োজন।একে অন্যের কোলাকুলি ভালবাসায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসত। লোকজনের আনাগোনাতে সন্ধ্যায় জ্বলে উঠত কেরোসিনের শিখা। নিবু নিবু বাতি জ্বালিয়ে রাতভর চলত গল্পের আসর। বিদ্যুৎ বিহীন যুগে হরিকেনের সলতা আর গ্লাসটির ছিল খুবই কদর। কেরোসিনের অভাব হয়তো অন্ধকারের জানান দিত। ছোট ব্যাটারী চালিত টর্চ লাইটগুলো সবার ঘরেই থাকত রাতে পথ চলার বন্ধু হয়ে। রাইচ মিলগুলোও ছিল কেরোসিন নির্ভর। অনেক দুর-দুরান্ত হতে বাজারে লোকজন আসত নৌকায়,পায়ে হেটে কিংবা সময়ের পথচলা বাহন দিয়ে। লোকে-লোকারণ্য বাজারে ব্যবসায়ীদেরও উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল আনন্দের আমেজে। কিন্তু কালের বিবর্তনে বাজারটি আজ লোকান্তরে পরিণত হয়েছে। হারিয়ে ফেলেছে পুরানো স্মৃতির গল্প। জমজমাট এই বাজরের স্হানটি দৃশ্যমান জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়ে হারিয়ে ফেলেছে তার অস্হিস্তকে। হার মানিয়েছে যুগের পরিবর্তনের কাছে। উজান-ভাটি লঞ্চের জন্য অপেক্ষমান যাত্রীদের গাছের ছায়ায় পুরনো একটি বসার সিড়ি বাজারটিতে নিশানা হিসেবে আজও দাড়িয়ে আছে। পথচারীদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আমি তোমাদের সেবার জন্য আজ ও অপেক্ষায় আছি। কিন্তু দেখার কেউ নেই,বসারও কেউ নেই। ঘরের নিশানাগুলো শূন্য কুঠির মত আকাশের দিকে ছেয়ে আছে শূন্য হৃদয়ে। সময়ের পূনঃরুত্থানে আবার বাজারটি সজীবতা ফিরে পাক,গড়ে উঠুক নতুন প্রাচীর। শূন্যতা হারিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করুক ঐতিহ্যবাহী এই বাজারটি।

সম্পর্কিত পোস্ট