স্মরণে স্মৃতিতে বরেণ্য এডভোকেট শেখ এস.আই. কামাল চৌধুরী

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২০

—-জিয়া হাবীব আহসান

সম্প্রতি বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ করোনাকালীন দুর্যোগ চলাকালীন সময়ে মাত্র দু’মাসের ব্যবধানে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন চট্টগ্রামের জেলা বারের ১৫জন বিশিষ্ট আইনযোদ্ধা । এর মধ্যে কেউ মারা গেছেন করোনা উপসর্গ নিয়ে, কেউ বার্ধক্যজনিত কারণে, আবার কেউ দুরারোগ্যব্যাধির কারণে । যাঁদের হারিয়েছি তাদের মধ্যে জেলা আইনজীবী সমিতির দু’দুবার নির্বাচিত সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি ও সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি শ্রদ্ধেয় সিনিয়র এডভোকেট শেখ এস.আই. কামাল উদ্দিন স্যার এর নামও উল্লেখ্যযোগ্য ।
তিনি গত ১লা জুন ২০২০ইং সোমবার আনুমানিক রাত ৯ ঘটিকার সময় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে কোতোয়ালী থানাধীন ৩৪নং, পাথরঘাটা ওয়ার্ডস্থ নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । মৃত্যূকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর । তাঁর ছোট মেয়ে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএল.এম পোষ্ট গ্র্যাজুয়েটস ফারজানা করিম ববি জানান, তাঁর বাবা ব্রেইন স্ট্রোক করে মাত্র ২০মিনিটের ব্যবধানে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান । এমন সুন্দর মৃত্যু তাঁর কাউকে কোন কষ্ট না দিয়ে চলে গেলেন । ভু্লবশত কোন কোন সংবাদে তার পিতার মৃত্যুকে করোনার উপসর্গ প্রকাশ করায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন । প্রকৃতপক্ষে তিনি সুস্থ ছিলেন এবং প্রায় কোর্ট চেম্বারে আসতেন । আইনজীবী সমিতির মূল ভবনের নিচে সোনালী ব্যাংকের দক্ষিণ পার্শ্বের প্রথম কক্ষটিই তাঁর চেম্বার । দীর্ঘকাল আমার ওকালতি জীবনের শুরু থেকে যাবত প্রায় প্রতিদিন যাওয়া আসার পথে তাঁর সাথে সালাম ও কুশল বিনিময় হতো । লম্বা, স্মার্ট, অত্যন্ত হাসি-খুশি সুদর্শন মানুষটিকে কখনো আগে সালাম দেয়া যেতো না । পুত্রতুল্য জুনিয়র আইনজীবী হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি আমাদের আপনি বলে সম্বোধন করতেন । সবসময় তাঁর কথাবার্তায় বিনয়, ন্ম্রতা, ভদ্রতা ও সভ্যতার ছাপ ছিল । প্রায় দেখতাম গরীব দুঃখীদের দু’হাতে অর্থ বিলাতে । মানুষটি বহু গরীব বিচারপ্রার্থীদের বিনামূল্যে আইনী সহায়তা দিতেন । আইনজীবী পরিবারের সন্তান হওয়ায় তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন । সবসময় আমার পরিবার পরিজনের খোঁজ খবর নিতেন । আমার আব্বা মরহুম এডভোকেট আবু মোহাম্মদ য়্যাহয়া ও আমার শ্বশুর আব্বাজান (চট্টগ্রাম আইন কলেজের সাবেক শিক্ষক) ব্যারিস্টার আমিনুল হকের সাথে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল । আমার মনে আছে আমার স্ত্রী প্রিন্সিপাল আশফা খানমের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের(সিভিএনএস)অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য(তদানিন্তন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী) জনাব নুরুল ইসলাম বিএসসি মহোদয়ের সুপারিশের প্রয়োজন হলে এডভোকেট এস আই কামাল স্যার আমাকে এম পি মহোদয়ের খাতুনগঞ্জস্থ অফিসে সাথে নিয়ে যান এবং তাঁর ভগ্নীপতি বিএসসি সাহেব’কে বলেন যে, এডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান আমার সিনিয়রের ছেলে ও বন্ধুর মেয়ের জামাই । আমার বন্ধুর মেয়ের স্কুলের জন্য একটা জোরালো সুপারিশ লিখে দিন । কতটুকু আন্তরিকতা থাকলে নিজের কাজ বাদ দিয়ে আমাকে সাথে নিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দিলেন ।’ আমাকে তিনি যে এইভাবে পরিচয় করিয়ে দিলেন তা কখনো ভুলতে পারবো না । কামাল স্যার সাবেক মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসির সহধর্মীনির আপন বড়ভাই । তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জেলা বারের দু’দুবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র সহ সভাপতি ছিলেন । তিনি ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বারে যোগ দেন । আমি তাঁর নির্বাচনকালে তাঁর সাথে কাজ করেছি, এমন দিলদরিয়া মানুষ অনেক কম দেখেছি । অত্যন্ত নিঃস্বার্থ ও নিরহংকারী মানুষটি সবসময় বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাংখীদের মাঝে নিজের অবসর সময় কাটাতে পছন্দ করতেন ।তাঁর চেম্বার থেকে কখনো চা-নাস্তা না খেয়ে আসা যেত না ।এডভোকেট শেখ এস.আই কামাল চৌধুরী একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক ছিলেন । উন্নত রুচি সম্পন্ন দরাজ দিলের মানুষটি অত্যন্ত মুক্ত চিন্তার মানুষ ছিলেন বিধায় তিনি দলমত নির্বিশেষে সকলের প্রিয়পাত্র ছিল । হক কথা বলতে কাউকে পরোয়া করতেন না । চট্টগ্রাম বারের উন্নয়নে তিনি বহু অবদান রাখেন । বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এডভোকেট আবুল হাশেম Adv Abul Hashem তাঁর মৃত্যুতে প্রদত্ত ফেইসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, “১৯৮৮ সালে গনতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচীতে যোগদানে চট্টগ্রামের লালদিঘীর জনসভায় আগমনে আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । তৎকালীন সময়ে সরকারের নির্দেশে সেদিন জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার জনসভা বানচালের চক্রান্তে বেপরোয়া গুলি চালিয়ে ২৪ জন হত্যা করে এবং আল্লাহর রহমতে নেত্রীকে রক্ষা করে নিয়ে আসা হয় চট্টগ্রাম বারে। সেদিন জননেত্রী দেশরত্ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার পাশে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার । সেই সময়ে চট্টগ্রাম বার সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জনাব জালাল উদ্দীন আহমেদ এবং জনাব এস, কে, কামাল উদদীন । চট্টগ্রাম বার সমিতির ইতিহাস, ঐতিহ্যের ধারক বাহক একে একে অনেক সিনিয়র আইনজীবীদরকে হারিয়ে দিন দিন নিঃস্ব আমরা ।” তিনি পাথরঘাটায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সেন্ট স্কলাষ্টিকা গালস হাই স্কুল এন্ড কলেজের বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত ৩ বারের মেম্বার ছিলেন । তিনি চট্টগ্রামস্থ হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকার অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা মরহুম ডাক্তার খলিলুর রহমান ছিলেন হাটহাজারীর প্রথম এম.বি.বি এস ডাক্তার । তিনি তাঁর মা-বাবার বড় সন্তান ছিলেন । মৃত্যুকালে তিনি ১ পুত্র, ২ কন্যা, নাতনী, জামাতা ও ভাইবোনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন । এডভোকেট শেখ এস আই কামালউদ্দীন সারাজীবন মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করে গেছেন । কেউ সাহায্যের জন্য গেলে তিনি কখনো কাউকে শূণ্য হাতে ফেরাননি।তিনি তাঁর সাধ্যমত মসজিদ, মাদ্রাসা ও গরীব দু:খীদের দান করতেন। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক । আমীন ।

Advertisement

লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী।