স্বাস্থ্য খাতের একাল-সেকাল ও আমাদের কথা

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৯:১২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

—————————-

স্বাধীনতার স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির জনক, বাংলার আপামর জনতার হৃদয়ের স্পন্দন, বাংলার আকাশের শ্রেষ্ঠ সূর্য সন্তান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত ও কপর্দকহীন দেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ও গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করেন। জাতীয় পুষ্টি পরিষদ গঠন, চিকিৎসকদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান ও গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসহ বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কিন্তু কিছু বিপথগামী সামরিক ঘাতকের কারণে তাঁর পরিকল্পনাগুলো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয় নি। তাঁর স্বপ্নগুলো মানবতার মা, বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাছিনা বাস্তবায়ন করার জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কিন্তু সাহেদ, সাবরিনা আর মালেকের মত দুর্নীতিপরায়ণ ব্যাক্তিরা বঙ্গবন্ধুর সোনার স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হতে দিচ্ছে না। তাদের কারণে বরাবরই প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে স্বাস্থ্য খাত।

৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজীয়নতা অন্য যে কোন সময়ের থেকে বেশি দেখা দেয়। কিন্তু চিত্রকল্প দাঁড়ায় ঠিক উল্টো। হাসপাতালের পর হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা যায় নি। এমন চিত্র আমরা প্রতিদিনই দেখতাম। এমনকি দুদক পর্দা কেলেঙ্কারিসহ স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ১১ টি অভিযোগ এনেছিল। এন ৯৫ মাস্ক এবং পিপিই এর ব্যাপারে টিআইবি এর নির্বাহি পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “সুরক্ষা সামগ্রীতে দুর্নীতি থেমে থাকেনি। এখানেও দুর্নীতি উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।” ২০১৭ সালে টিআইবির জরিপে অংশ নেওয়া ৪২.৫ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য সেবা নিতে এসে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুধু স্বাস্থ্যখাতের যন্ত্রপাতি কেনায় এক হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি হয়। যা খুবই উদ্বেগজনক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি যে এর চেয়েও খারাপ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ” কোভিড এর কারণে স্বাস্থ্য খাতে দুই ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে। প্রথমত: সেবা খাতে দুর্নীতি এবং দ্বিতীয়ত: অবকাঠামো খাতে দুর্নীতি।” কিছু দিন আগে এক বৈঠকে স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নান বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে। এসব বন্ধে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি।” সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাত কতোটা ভেঙ্গে পরেছে।

সংবিধানের ১৫(ক) ও ১৮(১) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি চিকিৎসা সেবা ও জনগণের পুষ্টি স্তর উন্নয়ন রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। আবার, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা হলো মানুষের মৌলিক অধিকার। একটি স্বার্থান্ধ মহল যখন মানুষের এই মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে খেলা করা শুরু করে তখন সাধারণ মানুষের নিরব দর্শক হওয়া ব্যতীত অন্য কিছুই করার থাকে না। স্বাস্থ্য খাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর অসাধু কর্মচারীদের ব্যাপারে অর্থ আত্মসাৎ করার যে চিত্র আমরা দেখতে পাই, তাতে বুঝা যায় এখানে পুকুর চুরির চেয়েও অনেক বড় কিছু হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের একটি মূল অভিযোগর জায়গা হচ্ছে নকল ওষুধ সরবরাহ করা। করোনাকালেও রাজধানীর মিটফোর্ডে র‌্যাব-১০ নকল ওষুধ, নকল স্যাভলন ও নকল ডিটারজেন্ট তৈরি এবং বিতরণের বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করে পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা ও আড়াই লক্ষ টাকা মূল্যের নকল ওষুধ জব্দ করেন। কিন্তু দুই-একটি সফল অভিযান পরিচালনা করলেও নকল ওষুধ সরবরাহ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয় নি। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা মাপিক কঠোর পদক্ষেপ। এছাড়াও বর্তমানে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো বেড়ে উঠছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এগুলোতে নেই কোন দক্ষ চিকিৎসক ও ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা। অনেক হাসপাতালের আবার লাইসেন্সও নাই। এগুলোতে মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে হিতে বিপরীত হচ্ছে। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা দেখতে পেয়েছি অনেক রোগী ভুল চিকিৎসার কারণে মৃত্যুর মুখেও পতিত হয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্য সেবার ব্যাপারে মানুষ ধীরে ধীরে আস্থা হারিয়ে ফেলছে।

করোনার মহা দূর্যোগকালে জেকেজি আর রিজেন্ট হাসপাতাল কেলেঙ্কারি স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে আমাদের অনেক ভাবিয়ে তুলেছিল। রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমের করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে অনেকটা বেকপুটে চলে যেতে হয়। আর জাতি হিসেবে আমরাই সর্বপ্রথম করোনা টেস্টের ভুয়া সার্টিফিকেটের দায় ভার নিতে বাধ্য হই। এছাড়া ৩০০ কোটি টাকার কাজ পাওয়ার লোভে বৈধ অনুমতি পাওয়ার পরেও সাবরিনা-আরিফ দম্পতি যে ১৫ হাজার করোনার ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করে তা স্বাস্থ্য খাতকে নাজুক করে দেয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এদেরকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। আমরা ভেবেছিলাম স্বাস্থ্য খাতের এই বেহাল দশা এখানেই শেষ। কিন্তু না, এখানে প্রযোজ্য হলো রবী ঠাকুরের ছোট গল্পের সংজ্ঞা। “শেষ হয়ে হইল না শেষ।” বেরিয়ে আসলো আব্দুল মালেক সহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ৩৫ জন ব্যক্তির নাম। যারা সবাই কোন না কোন দুষ্ট চক্রে জড়িত। আর আব্দুল মালেক তো রীতিমতো দেশে শোরগোল পাকিয়ে দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও তুরাগ থানায় ৭ তলা বিশিষ্ট দুটি বিলাসবহুল ভবন, ধানমন্ডিতে নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবন, ১৫ কাঠা জমিতে ডেইরি ফার্ম এবং ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল টাকার মালিক হয়ে অদৃষ্টপূর্ব ভাগ্যের পরিচয় দিয়েছেন। আমারা আশা করি এই ধরনের ভাগ্যবান ব্যক্তিদের এখানেই ইতি গঠবে।

স্বাস্থ্য খাতে এতো ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে এক দল নিরলস চিকিৎসক, নার্স ও মেডিক্যাল স্টাপ আমাদের সেবা দেওয়ার জন্য তাঁদের মূল্যবান জীবনকে বাজি রাখছেন। তারা হলেন এই সময়ের ফ্রন্ট ফাইটার বা সম্মুখ যোদ্ধা। অনেক চিকিৎসক রোগীর সেবা দিতে গিয়ে ইতোমধ্যেই আমাদের থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। তাদের প্রতি আমাদের শত সালাম আর স্যালুড। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসা খাতে প্রনোদনা আর চিকিৎসকদের জন্য যে পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এছাড়াও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ সহোযোগিতায় ২০০০ ডাক্তার এবং ৫০৫৪ নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যা ছিল সময় উপযোগী পদক্ষেপ। আগে যতবারই স্বাস্থ্য খাতের কথা আলোচনায় এসেছে বলা হয়েছে এখানে আর্থিক বাজেট খুবই কম। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সেটারও নিরসন করা হয়েছে। সরকার এই খাতে আগের চেয়ে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ করেছে। যার ফলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমান দাঁড়িয়েছে ২৯,২৭৪ কোটি টাকা। যা স্বাস্থ্য খাতকে সত্যিই বেগবান করবে। এখন স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ঠেকাতে আমাদের সকলকে দায়িত্ব নিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতের সমস্যাগুলো নিরসনের জন্য শুধু অর্থ সংস্থান করলেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা, অর্থের সঠিক বণ্টন করা, নিয়ন্ত্রণকৌশল স্বচ্ছ করা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা করা।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২২ টি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যা স্বাস্থ্য খাতের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে খুবই কার্যকর হবে বলে আমরা আশাবাদী। এছাড়াও সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর হবেন এবং আমাদেরকে একটি দুর্নীতিমুক্ত, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ উপহার দিবেন- এমটাই প্রত্যাশা আমাদের সবার।
———————–
মুবাশ্বিরুজ্জামান হাসান
শিক্ষার্থী,
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।