সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীর ভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে কাঁদছে ওরা।

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:২৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

বাপ্পী রাম রায়,
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধিঃ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়ন যেন পরিত্যক্ত এক জনপদ। গত দুই মাসে তিস্তা নদীর ভাঙনে এই বাজারের চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করলেও সরকারি কোনো কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধি তাদের খোঁজ নেননি।
সরেজমিনে দেখা যায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার এলাকায় গত দুই মাসে তিস্তা নদীর ভাঙনে চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। হুমকিতে আছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ওয়াফদা বাঁধ। ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ বি-এল উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ দাখিল মাদরাসা ও ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কাশিমবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এখন হুমকির মুখে। তিস্তা নদীর ভাঙনে নিঃস্ব মানুষগুলো মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

উপজেলার ১১ নং হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজারের বাসিন্দা রওশন আরা বেগম। জন্মের পর বাবাকে দেখেননি। অনেক কষ্টে বড় করা মেয়েও এক দুর্ঘটনায় তাকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমায়। মেয়ের মরদেহ বাড়ির উঠানে কবর দেয়া হয়। কষ্টের মাঝে মেয়ের কবর দেখে মনে সান্ত্বনা পেতেন রওশন আরা। মনে করতেন আদরের মেয়ে তার পাশেই আছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাসে মেয়ের কবরসহ তার ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারা রওশন আরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মনে অনেক কষ্ট। কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। আমরা কোন দেশে আছি।

নদীভাঙনের শিকার আলেয়া বেগম বলেন, আমাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। সরকারি কোনো কর্মকর্তা তো দূরের কথা আমরা যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি; তারাও খোঁজ নিতে আসেনি।

ভাঙনের শিকার আবু তালেব বলেন, ভিটেমাটি সব নদীতে গেল।বিপদে কেউ আসে না।

হরিপুর ইউনিয়নের রওশন আরা, আলেয়া আর আর আবু তালেবের মতো গত দুই মাসে ভিটেমাটি হাড়িয়ে নিঃস্ব হয়েছে চার শতাধিক পরিবার। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরবাড়ি সরাতে ব্যস্ত সবাই। কারও সঙ্গে কথা বলার যেন সময় নেই তাদের।

হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, আমরা বার বার যোগাযোগ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি, কিন্তু তারা নেয়নি। গাইবান্ধায় যোগাযোগ করলে বলে কুড়িগ্রামের কথা, আর কুড়িগ্রামে যোগাযোগ করলে বলে গাইবান্ধার কথা। আমরা কোন জেলার বাসিন্দা এখনও বুঝতে পারছি না।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসা শিক্ষক মঞ্জুরুল হক বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে কুড়িগ্রাম অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছুটা কাজ করলেও তা ছিল লোক দেখানো।

কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার গ্রামের আব্দুল করিম মিয়া। তার অভিযোগ,‘হামরা এমপিকে সবসময় টকশোতে দেখি, এলাকায় দেখি না।’

মাদারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মমতাজ বেগম বলেন, নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে নাজিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাজিমাবাদ বি-এল উচ্চ বিদ্যালয়, নাজিমাবাদ দাখিল মাদরাসা ও কাশিমবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হবে।

হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুস ছাত্তারের সঙ্গে কথা হলে তিনি সব দোষ দেন ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমির।
তিনি বলেন, দুই চরের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণে ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি কখনো কাশিমবাজারে আসেন না। চেয়ারম্যান না চাইলে আমি কিভাবে জনগনের পাশে দাঁড়াব। এব্যাপারে হরিপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমির সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আসেন কী কী কাজ করেছি দেখে যান। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো.মোখলেছুর রহমান বলেন,গাইবান্ধার মানচিত্রে হরিপুরের কাশিমবাজার থাকলেও গাইবান্ধা থেকে ওই এলাকা অনেক দুরে। ওই এলাকার দেখাশুনার দায়িত্ব কুড়িগ্রাম পানি বোর্ডের। ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি।
গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন,আমি কয়েকবার কাশিমবাজারে গেছি। সেখানে একটি মসজিদের জন্য ১০ লক্ষ টাকাও দিয়েছি। রাস্তার জন্য টাকা দিয়েছি। ভাঙন কবলিত জায়গাটি উলিপুর – কাশিমবাজার বর্ডার এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিফ ইন্জিনিয়ার ও বিভাগীয় প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। কাল – পরশু ডিজির সাথে কথা বলবো। আশা করি জিও ব্যাগ ফেলবে। কাশিমবাজার সরেজমিন যাব।