“নফল ও সুন্নত রোজা সমূহের গুরুত্ব ‘– ইঞ্জি: নূরুল ইসলাম

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:৩৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০১৯

ভূমিকা ঃ
মহান আল্লা সুবহানাহু অতালা স্বীয় বান্দাদের প্রতি সীমাহীন দয়ালু ও ক্ষমাশীল । তিনি যে কোন উপায়ে ক্ষমা করতে ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন। এ কারণেই আল্লাহ বান্দাদের জন্য বিভিন্ন আমলের বিনিময়ে অগনিত অসংখ্য পুরস্কার ঘোষনা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে আল্লাহ তাদের আমল করার সুযোগ দিয়ে তাদের নাজাতের ব্যবস্থা করেছেন। যেমন- আল্লাহ তালা রামজান মাসকে স্বীয় বান্দাদের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্বচন করেছেন। আবার রমজান মাসের শেষ দশ দিনকে আরো গুরুত্ব দিয়েছেন । শেষ দশ দিনের মধ্যে এমন একটি রাত রেখেছেন যা হাজার রাত্রির ইবাদতের চেয়ে উত্তম। রমজান মাসের সওম (রোযা) পালন করাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢাল স্বরূপ বলা হয়েছে। অনুরুপ ভাবে মহান আল্লাহ তালা বান্দাকে অগনিত সোয়াব ও পুরস্কার দানের জন্য এবং গুনাহ মাপের জন্য প্রিয় নবী মহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম এর মাধ্যমে অনেক সুন্নাত ও নফল সিয়ামের (রোযার) সুযোগ দান করেছেন। যেমন- মুর্হারাম ও সাবান মাসের অধিকাংশ দিন রোজা রাখা, আরাফাতের দিন রোজা রাখা এবং শাওয়াল মাসের ৬ দিন রোজা রাখা, প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা, প্রতি মাসের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখে রোযা।

* নীচে অতি সংক্ষেপে সুন্নাত ও নফল রোযা সমূহের ফযিলত ও গরুত্ব বর্ণনা করা হলো ঃ
সুন্নাত রোযা হচ্ছে- মুহাররাম ও শাবান মাসের অধিকাংশ দিন রোযা রাখা। অশুরার দিবস (মুর্হারম মাসের ১০ তারিখ) রোযা রাখা, আরাফার দিবস রোযা রাখা এবং শাওয়াল মাসের ছয় দিন রোযা রাখা এবং সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখা।
সর্বোত্তম নফল রোযা হচ্ছে- একদিন রোযা রাখা আর একদিন রোযা না রাখা। তারপর প্রতিমাসে তিন দিন রোযা রাখা-উত্তম হচ্ছে আইয়্যামে বীয তথা প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোযা রাখা।

* মাকরূহ রোযা হচ্ছে ঃ
শুধুমাত্র রজব মাসে রোযা রাখা। এককভাবে শুক্রবার ও শনিবার রোযা রাখা। সন্দেহের দিন রোযা রাখাও মাকরূহ অর্থাৎ শাবান মাসের ২৯ তারিখে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ তারিখকে সন্দেহের দিন বলা হয়।

* কখন রোযা রাখা হারাম?
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন রোযা এবং আইয়্যামে তাশরীফ তথা জিলহজ্ব মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ রোযা রাখা। তবে তামাত্তু বা কেরান হজ্জ কারীর উপর যদি দম বা জরিমানা ওয়াজিব থাকে তাহলে তার জন্য এই তিন দিন রোযা রাখা হারাম নয়। এখন আমরা সুন্নাত ও নফল সিয়াম গুলির বিশেষ বিশেষ ফযিলত নিয়ে আলোচনা করবো।
*শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা ঃ
আবু আয়ূব আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমযান মাসে সিয়াম পালন করলো, অতঃপর শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়াম পালন করলো সে যেন সারা বছর সিয়াম (রোযা) পালন করলো- মুসলিম-১৯৮৪।

* আরাফা দিবসের সিয়াম (রোযা) ঃ
নবী করিম (সা:) কে আরাফা দিবসের সওম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: আরাফা দিবসের সওম সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আমি আশা করি যে, তাকে বিগত ও আগত বছরের পাপের কাফফারা হিসাবে গ্রহণ করা হবে-মুসলিম-১৮৯৫। তবে যারা পবিত্র হজ্জ পালনরত আছেন তারা এ দিবসে রোযা রাখবে না।

* মুহাররম মাসের সিয়াম (রোযা) ঃ
নবী করিম (সা:) বলেন, রমজান মাসের পর সর্বোত্তম সওম হলো আল্লাহর মাস মুহাররামের সওম। আর ফরজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত রাতের সালাত-মুসলিম-১৯৮২।

* শাবান মাসের সিয়াম ঃ (রোযা) ঃ
হাদীসে এসেছে আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল (সা:) কে শাবান মাস ব্যতিত অন্য কোন মাসে এত অধিক পরিমাণে নফল সিয়াম পালন করতে দেখিনি-বুখারী-১৮৩৩। উসামা বিন যায়েদ (রা:) এর এক প্রশ্নের উত্তরে নবী (সা:) বললেন, শাবান মাস রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস যাতে মানুষ সিয়াম সম্পর্কে উদাসীন থাকে।

* প্রতিমাসে তিনদিন সিয়াম পালন করা ঃ
হাদীসে এসেছে-আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল (সা:) সম্পর্কে বলেন, আমার বন্ধু নবী (সা:) আমাকে তিনটি বিষয়ে উপদেশ দিয়েছেন: প্রত্যেক মাসে তিনটি সিয়াম পালন করা, দ্বি-প্রহরের পূর্বে ২ রাকাতা সালাত আদায় করা এবং নিদ্রার পূর্বে বিতির সালাত আদায় করা- বুখারী-১৮৪৫। হাদীসে আছে এতিনটি সিয়াম প্রতিমাসে আদায় করলে পূর্ণ এক বছর সিয়াম আদায়ের সাওয়াব লাভের কথা এসেছে। যেমন-প্রত্যেক হিজরী মাসের ১৩. ১৪ ও ১৫ তারিখ সিয়াম পালন করলে এক রমজান থেকে আরেক রমজান পর্যন্ত পূর্ণ এক বছর সিয়াম পালনের সমপরিমাণ সাওয়াব ধরা হয়-মুসলিম-১৯৭৬। ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন রাসূল (সা:) সফর ও দেশে থাকা অবস্থায় আইয়্যামে বীযের সিয়াম অর্থাৎ হিজরী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোযা ত্যাগ করতেন না-নাসায়ী-২৩০৫।

* আশুরার সিয়াম (রোযা) পালন ঃ
আবু কাতাদা (রা:) থেকে বর্ণিত যে রাসূল (সা:) বলেছেন: আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি, আশুরা দিবসের রোযা আল্লাহ তা’য়ালার কাছে বিগত এক বছরের গুণাহের কাফফারা হিসাবে গৃহীত হবে-মুসলিম, তিরমিযী)। এখন প্রশ্ন হলো আশুরার সিয়াম কিভাবে পালন করা যাবে?

মুহাররম মাসের নবম ও দশম তারিখে সওম পালন করা উত্তম। কারণ রাসূল করীম (স:) এভাবেই আশুরার রোযা পালনের সংকল্প করেছিলেন। তবে মুহাররম মাসের দশম ও একাদশ দিবসে সওম পালনের পদ্ধতি ও হাদীস দ্বারা সমর্থিত।

* নফল সিয়াম (রোযার) ফজিলত ঃ
রাসূল (সা:) বলেন, আল্লাহর কাছে (নফল সিয়ামের) মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সিয়াম হলো দাউদ (আ:) এর সিয়াম। তিনি একদিন রোযা রাখতেন আর একদিন রোযা ত্যাগ করতেন-মুসলিম-১৯৬৯। আবু উসামা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা:) নিকট আগমন করি, অতঃপর তাকে আমি বলিঃ আপনি আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিন, যা আমি আপনার থেকে গ্রহণ করবো, তিনি উত্তরে বললেন, তুমি সওম আকড়ে ধর, কারণ তার সমক্ষ কিছু নেই-সুনানে নাসাঈ-২২২০।

* বছরের সর্বোত্তম দশদিন ঃ
রাসূল (সা:) বলেছেন, জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে কৃত নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আর কোন আমল নেই-সহীহ-আল বুখারী। জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশদিন মুমিন গণের জন্য অধিক বরকতময় ও কল্যাণময় সময়। অতএব, আমাদের সকলের এই বরকত ময় দশটি দিন ও রাত বেশী পরিমাণে নেক আমল এবং পূন্যময় কাজের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করা একান্ত প্রয়োজন। যেমন ঃ-

 জিলহজ্ব মাসের প্রথম নয় দিন সিয়াম (রোযা) পালন করা।
 আরাফর দিনে রোযা পালনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রাসূল (সা:) বলেছেন আরাফার দিন সিয়াম পালনের দ্বারা বিগত বছরের এবং আগামী বছরের গুণাহ মাফ হয়ে যায়- সহী মুসলিম।
 অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করা। অতিব সহজ ও অত্যন্ত মূল্যবান কিছু যিকির নীচে উদৃত করা হলো।
 তাকবীর পাঠ করা (আল্লাহ আকবর)
 তাহমীদ পাঠ করা (আলহামদুলিল্লাহ)
 তাহলীল পাঠ করা (লাইলাহা ইল্লাল্লাহ)
 তাসবীহ পাঠ করা (সুবহানাল্লাহ)
 আস্তাফফিরুল্লাহ/ আল্লাহুম্মাগফির লি অথবা সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পাঠ করা।
 লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ-যাকে জান্নাতের মনিমুক্তা বলা হয়েছে।
 তাকবীর-এ তাশরীক পাঠ করা (আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর ওয়া লিল্লাহিল হামদ ইত্যাদি।
 ফরজ নামাজের পাশাপাশি প্রতিদিনের মোট বারো/দশ রাকাত সুন্নাত সালাত আদায় করা।
 বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াত করা।
 বেশী পরিমাণে দোয়া-দরূদ পাঠ করা এবং তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা।
 মানুষের কল্যাণে আল্লাহর রাস্তায় দান-সাদকা করা।
 আরফার দিন হতে আইয়্যামে তাশরীকের দিন পর্যন্ত (জিলহজ্ব মাসের ৯ হতে ১০ তারিখ আসর ওয়াক্তের পর পর্যন্ত) প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা।
 সৎ এবং কল্যাণ কর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখা এবং অসৎ কাজ হতে দূরে থাকা ইত্যাদি।


* সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযা ঃ

সপ্তাহে দু’দিন সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখা সুন্নাত। হাদীসে এসেছে সাহাবী আবু কাতাদা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) কে সোমবার সিয়াম (রোযা) পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো- তিনি বললেন, এই দিনে আমার জন্ম হয়েছে এবং এই দিনে আমাকে নবুয়্যাত দেয়া হয়েছে বা আমার উপর কুরআন নাযিল শুরু হয়েছে -মুসলিম-১৯৭৭/১১৬২।

* হযরত আয়শা (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী (স:) সোমবার ও বৃহস্পতিবার এর রোযার প্রতি বেশি খেয়াল রাখতেন-তিরমিজি-৭৪৫।

* হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত নবী করিম (সা:) বলেন প্রতি সোমবার এবং বৃহস্পতিবার মানুষের আমলনামা আল্লাহ পাকের নিকট পেশ করা হয়। অতএব রোযা অবস্থায় যেন আমার আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়-এটাই আমার পছন্দনীয়-তিরমিজি ৭৪৭।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও গবেষক