সিলেটে পাহাড় টিলা কাটা হুমকিতে পরিবেশ-জীববৈচিত্র!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৯

রফিকুল ইসলাম জসিম :

বাংলাদেশে খুব কমসংখক এলাকা জুড়ে রয়েছে পাহাড়।

এদেশ মূলত সমতল ভূমি— সারা দেশে পাহাড় টিলার সংখ্যা সত্যিকার অর্থেই কম। সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় টিলাগুলো দেশের পরিবেশকে বৈচিত্র্যময় করেছে। দেশের অন্যান্য জায়গার মতো সিলেট বিভাগের সর্বত্র পাহাড়, টিলা কাটা হয় তোয়াক্কা ছাড়াই। পাহাড় ও টিলার অপরূপ দৃশ্যে বিমোহিত হন পর্যটকরা। এসব পাহাড়, টিলা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সৌন্দর্যের আধার সিলেটে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পাহাড় ও টিলা আজ হারাতে বসেছে তার জৌলুস। পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন, যে হারে টিলা কাটা হচ্ছে তাতে সিলেট অচিরেই টিলাশূন্য হয়ে পড়বে।

সিলেটে অবাধে চলছে পাহাড়-টিলা কাটার মহোৎসব। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে পাহাড়-টিলা কাটা অবাধে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে নিরব। পাহাড়-টিলা কাটা বন্ধে প্রশাসনের উদ্যোগ না থাকায় ‘পাহাড়-টিলা খেকোদের’ আগ্রাসন দিন দিন বাড়ছে। এতে করে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে অন্যদিকে বন্যপ্রাণীরা হারাচ্ছে আবাসস্থল। যার কারণে অনেক সময় বাঘ, বানরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসে এবং প্রাণ হারায়। তবে মাঝে মধ্যে পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসনের টনক নড়ে কিছু দিন বন্ধ থাকে। এর পরেই আবার শুরু হয়ে যায় পাহাড় কাটার মহোৎসব। তবে এসব পাহাড়-টিলা ধ্বংস করা হচ্ছে এলাকার প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়।

আজকে সিলেট থেকে প্রকাশিত একটি অনলাইন পত্রিকা

সিলেট টুডে শিরোনামে সংবাদ আমার দৃষ্টি কাড়ে। মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গলে টিলা কেটে কবরস্থানের মাটি ভরাট! – সংবাদটি পরিবেশন করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক। তাকে ধন্যবাদ। সচিত্র প্রতিবেদনসহ খবরটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সরেজমিনে দেখা যায়, বিষামনি এলাকায় কয়েকজন স্থানীয় লোক কোদাল দিয়ে টিলার মাটি কেটে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে করবস্থানে ফেলছেন। বিষামনি মসজিদের সাথের কবরস্থান। টিলা যেখান থেকে কাটা হচ্ছে তার ঠিক উপরেই বিষামনি উচ্চ বিদ্যালয়। সেখানে স্কুলের কয়েকটি ঘর রয়েছে। এই স্কুলে সাড়ে পাঁচশোর মত শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। টিলা কাটার ফলে সেখানে ধসের আশংকা দেখা দিয়েছে ৷ এদিকে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে মাটি কাটার শ্রমিকরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন ৷নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, স্কুল কম্পাউন্ডের এত কাছের এই টিলা কাটার ফলে স্কুলের ক্ষতি হতে পারে। যেখানে টিলা কাটা হচ্ছে তার সাথে স্কুলের কয়েকটি ঘর রয়েছে ৷ বিষামনী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুপুর রাণী সেন বলেন, টিলা কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে।

একশ্রেণীর অসাধু লোক, ভূমিদস্যু ও লোভী ব্যক্তি বিভিন্ন উপায়ে নির্বিচারে পাহাড় ও টিলা কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করছে। নির্বিচারে পাহাড় ও টিলা কাটার ফলে দ্রুত প্রাকৃতিক বির্পযয় ঘটছে। ফলে পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। ভারসাম্য হারিয়ে মানুষের জীবন যাত্রা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বিলীন হচ্ছে জীববৈচিত্র এবং পরিবর্তন হচ্ছে ভূমির মানচিত্র। এছাড়া পাহাড় ও টিলা কেটে পাদদেশে নির্মাণ করা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি-ঘর। ফলে বর্ষা মৌসুমে সিলেটে পাহাড় ধসে ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা আমাদের মৌলভীবাজারে বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশিত আমার দেখা সংবাদ, ২০১৫ সালের জুন মাসে জেলার রাজনগর উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের করিমপুর চা বাগানে টিলা ধসের ঘটনায় এক শিশু নিহত হয়েছিল। এ সময় আহত হয়েছিলেন আরো দুইজন। ২০১৪ সালের ১০মে ভোররাতে বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর চা বাগানে পাহাড় ধ্বসে একই পরিবারের তিনজন মারা যান।

২০১৭ সালে জুনে মাসে মৌলভীবাজারে পাহাড় ধ্বসে ৪জন মারা যায়। একে ধ্বংস হতে দেয়া হলে যেভাবে পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটছে পরিণতি তার চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মক হতে পারে। পাহাড়ের অবস্থান না থাকলে ভূমিকম্পের প্রকোপ বাড়বে জীবন ও সম্পদ বিনষ্ট হবে। তাই প্রকৃতি বা পাহাড়কে প্রাকৃতিকভাবেই থাকতে দিতে হবে।

এক জরিপে দেখা গেছে, সিলেটের শতকরা ১১ ভাগ ভূমি পাহাড়। এর মধ্যে প্রায় ১৮ ভাগ উঁচু ভূমি। এখানে রয়েছে ৬৬ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল। এর মধ্যে শতকরা ২৩ ভাগ এই পাহাড় ও টিলার ওপর অবস্থিত। অথচ এসব টিলা কেটে ধ্বংস করা হচ্ছে বনাঞ্চল। সিলেট অঞ্চলে ১৯৯৭ সালে ছিল ৩৮ হাজার ২৭৭ হেক্টর পাহাড়ি অঞ্চল। ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার বনাঞ্চল উজাড় করা হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে সিলেট অঞ্চল পাহাড়-টিলা শূন্য হয়ে পড়বে।

২০০৭ সালের ১০ জুলাই পরিবশে ও বন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সকল ধরণের পাহাড় কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন করা হয়। এতে বলা হয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত মালিকানায় বা বক্তি মালিকানায় পাহাড় ও টিলা কাটা যাবে না। আইন হয়েছে কিন্তু দুখের বিষয় হচ্ছে, প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব কর্মকাণ্ড হয়ে চলেছে। গত পাঁচ বছরে পরিবেশ অধিদফতর সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে পাহাড় টিলা কাটার অভিযোগে ৯২টি মামলা এবং ৭টি অভিযান পরিচালনা করে ২৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা আদায় করলেও এ তত্পরতাকে আইওয়াশ বলে অভিহিত করলেও অত্যুক্তি হবে না। কারণ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা ছাড়া পাহাড় টিলা কাটার দায়ে তারা দৃশ্যত নীরব। নদী থেকে পাথর উঠানোর ক্ষেত্রেও বিরাজ করছে একই ধরনের নীরবতা। সিলেটের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষায় পাহাড় টিলা কাটা এবং মেশিন দিয়ে পাথর উঠানো বন্ধ করতে হবে। এসব ব্যাপারে আইনপ্রয়োগকারীরা দায়বোধের পরিচয় দেবেন এমনটিই কাঙ্ক্ষিত।

বাংলাদেশে খুব কমসংখক এলাকা জুড়ে রয়েছে পাহাড়। দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানে প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ দেশ হিসেবে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যে কোনো বড় ধরণের জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিকম্পে তলিয়ে যাবে আমাদের এ অঞ্চল । এমন পূর্বাভাস অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে যেখানে কোটি কোটি ডলারের প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে সেখানে আমাদের দেশে প্রকৃতির লীলাভূমি ও ভূ-পৃষ্ঠ রক্ষাকারী পাহাড়কে নিয়মিত নিঃশেষ করা হচ্ছে।

আমরা জানি এবং বিশেষজ্ঞরাও বলে থাকেন, পাহাড়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। পাহাড়গুলো পৃথিবীর ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাহাড়/টিলা নির্মূল করা হলে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়।

সবুজ বনবনানী, চা বাগান শোভিত সিলেটের পাহাড় টিলাগুলো বৈশিষ্ট্য হারাতে বসেছে প্রশাসনের দেখেও না দেখার অবিমৃষ্যকারিতায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে সিলেটের যে পরিচিতি রয়েছে তা ব্যাহত হবে। পর্যটন আকর্ষণের ক্ষমতা হারাবে এ জনপদ। প্রতিবছর পরিবেশ দিবস আসলেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক ঘণ্টার শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা ছাড়া পরিবেশ রক্ষাসংক্রান্ত আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। যার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতার সৃষ্টি হয়নি।

রফিকুল ইসলাম জসিম

গণমাধ্যমকর্মী ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি সদস্য