শুক্রবার ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
আমাদের সম্পর্কে
যোগাযোগ

সমাজ সংস্কারে বরেণ্য আইনজীবী আলহাজ্ব বদিউল আলমের অবদান

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১ 55 Views নিউজ এডিটর

এ, এম জিয়া হাবীব আহসান, এডভোকেট

ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি ভালবাসার মূর্ত প্রতীক এডভোকেট আলহাজ্ব বদিউল আলম স্যার এর নাম সর্বজন বিহিত । দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ও বিশেষজ্ঞ ফৌজদারী আইনজীবী বদিউল আলম স্যার একজন আলোকিত মানুষের প্রতিকৃতি । মুক্তিযুদ্ধ, গ্রাম উন্নয়ন ও সমাজ সংস্কারে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় । মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট সংগঠক, কলামিস্ট, বহু গ্রন্থের প্রণেতা, সাদালাপী, বিনয়ী, ন্ম্র, ভদ্র, ধার্মিক, মানবতাবাদী বয়সে প্রবীন অথচ চিন্তা চেতনায় আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ও একজন নিবেদিত প্রাণ সমাজ সংস্কারক । তিনি ১০ই ফ্রেব্রুয়ারী ২০০৩, ২৮শে মাঘ ১৪০৯ বাংলা বহদ্দারহাটস্থ নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করেন। (ইন্না……রাজেউন)।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বৎসর। তাঁর মৃত্যুর দিন ছিল পবিত্র ‘হজ্বে আরাফাতের দিন’। পবিত্র ঈদুল আজাহার আগের দিন। দিনের সর্বশেষ এশার নামাজ জামায়েতে আদায়ের পূর্বে তিনি স্রষ্টার আহবানে চলে গেলেন। কবে যাবেন কাউকে বুঝতে দিলেন না। কাউকে কষ্ট দিলেন না। ঐ দিন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেন, মক্কেলদের মামলা পরিচালনা করলেন, সতীর্থদের সাথে বেশ খোশ গল্প করলেন। কোন আলামতই দেখা যায়নি যে, তিনি ঐ দিনই আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। মৃত্যুর আগের দিনও তাঁর সাম্প্রতিক চীন সফর ও নেভাল একাডেমীর একটি অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু কথা কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে তুলে ধরেন। আইনজীবী ভবনের ফুট ওভারব্রীজে দাঁড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কিছু বক্তব্য আসা দরকার বলে অভিমত প্রকাশ করেন। প্রায়ই তিনি আমাকে আদালত ভবনের চেম্বারে ডেকে তাঁর মনের কথা ও চিন্তাগুলো শুনাতেন। ধৈর্য্য ধরে শত ব্যস্ততার মাঝেও শুনতাম। কেননা তাঁর কথাগুলো খুবই মূল্যবান, দূর দৃষ্টি সম্পন্ন, দিক নির্দেশক এবং পরিপক্ক। তাঁকে তাঁর কথাগুলো লিখতে বললে তিনি ছোট শিশুর মতো লিখে পরদিন দেখাতেন। আমি সেগুলো দেখে টাইপ করে পত্রিকায় ছাপাতে পাঠাতাম। অনেক সময় সরাসরি আমাদের চেম্বারে এসে নিজেই চায়ের অর্ডার দিয়ে উপস্থিত সকল সহকর্মীদের নিয়ে খেতেন। দেশ গঠনমূলক বিভিন্ন আলোচনা করতেন। এ স্মৃতি কিভাবে ভুলা যায়। এতো বড় আইন ব্যক্তিত্ব, দেশবরণ্যে বিশিষ্ট নাগরিক ও চিন্তাবিদ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মাঝে কখনো দাম্ভিকতা ও অহংকার দেখিনি। এটা তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁকে কেউ খোঁচা মেরে কথা বললেও তিনি উত্তেজিত হতেন না, হাসি মুখে কূতর্ক এড়িয়ে চলতেন। তিনি একাধারে ধার্মিক, মানবপ্রেমিক, দেশপ্রেমিক ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী নিরহংকারী মানুষ ছিলেন। সকল শ্রেনীর সকল মতের মানুষ তাঁর সান্নিধ্যে আসতো, তিনি সকলকে ভালোবাসতেন। এজন্যে তাঁর দু-দফা জানাজায় দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষের সরব উপস্থিতি দেখেছি। তাঁর বহু অমুসলিম ভক্তকে কাঁদতে দেখেছি। এটা কোন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। ফতেহ নগরের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক স্মারক গ্রন্থে তাঁকে তাঁদের সুখ, দুঃখের নিয়ত সাথী ও কল্যাণ মূলক কাজে প্রেরণার উৎস কলে অভিহিত করা হয়েছে। এ অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব বদিউল আলম এডভোকেট, যাঁকে সকলেই ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর সান্নিধ্য লাভকারীদের সকলেরই মনে হতো যেন, স্যার আমাকেই বেশী ভালোবাসতেন। এটা তাঁর বিরাট গুণ ছিল। ধর্মীয় কাজে তাঁর বদান্যতা অতুলনীয়। নিজ গ্রামে এবং আদালত ভবনের মসজিদ সংস্কার তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আদালত মসজিদের ওজুর পানির সমস্যা ও মুসল্লিদের বিভিন্ন অসুবিধার জন্য তাঁকে প্রায়ই চিন্তিত দেখতাম। নিজ গ্রাম ফতেনগরে তিনি শরীফুন্নেছা নাজিরুদ্দিন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও একটি প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজ গ্রামে নিজ পাড়ায় একটি মাদ্রাসা ও তৎসংলগ্ন লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন। জনাব বদিউল আলম ছাত্রাবস্থা থেকেই সমাজ কল্যাণমূলক কর্মকান্ডের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত ছিলেন। চন্দনাইশের ফতেনগর গ্রামে কবর জিয়ারত করতে গিয়ে তাঁর বহু বদান্যতা ও ভালো কাজের প্রমাণ পেয়েছি। মায়ের নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা, মসজিদ, মাদ্রাসা, গণপাঠাগার, কবরস্থান প্রতিষ্ঠা,পুকুর খনন, নিজ খরচে রাস্তা মেরামত এসব দৃশ্য না দেখলে বুঝা যাবে না। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি রাজনীতি সমাজ সেবার সাথে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় ছাত্র ফেডারেশন জেলা কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় দক্ষিন পটিয়া থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি, ১৯৬৫-১৯৭২ চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন মরহুম এম.আর সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মরহুম এম.এ. আজিজ। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতির ক্রান্তিলগ্নে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিখ্যাত ৬১ জামাল খান রোডের বাসাটি মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অনেকের আশ্রয় কেন্দ্র ছিল। তাঁর নিজ গ্রাম ও শ্বশুরবাড়ি আনোয়ারা থানার পিরখাইন ও হাইলক চট্টগ্রামের অনেক পরিবারের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর জামালখানস্থ চেম্বার মুক্তিসংগ্রামীদের যোগাযোগের গোপন ঠিকানা ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের পর এডভোকেট বদিউল আলম ১৯৭৩ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এ যোগ দেন এবং দক্ষিণ জেলা সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। রাজনৈতিক কারনে তিনি দু’বার কারাবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়েতে তাঁর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাক হানাদারদের দৃষ্টির আড়ালে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রেরণের কিছু দুর্দান্ত ঘটনা তাঁর মুখে শুনেছি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যুদ্ধের শুরুর সময় তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুরোধে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে বাঙ্গালী সেনা অফিসারদের স্ত্রী পুত্রদের উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যের জন্য কোলকাতায় মিসেস নেলী সেন গুপ্তার কাছে পত্র লিখেন। উল্লেখ্য অবিভক্ত ভারতের কংগ্রেস এর সাবেক সভাপতি নেলি সেন গুপ্ত (চন্দনাইশ এর বিখ্যাত জে এম সেন এর স্ত্রী) জামালখান রোডে তাঁর প্রতিবেশী ছিলেন।

জনাব বদিউল আলম চন্দনাইশ এর ফতেনগর গ্রামে ১৯২৬ সনে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতাঁর নাম মরহুম জলিলুর রহমান এবং মাতার নাম শরীফুন্নোছা, দাদার নাম ওবেদুল্লাহ। ৪ ভাই ১ বোনের মাঝে তিনি সবার ছোট ছিলেন। পিতার মৃত্যুকালে স্যারের বয়স ছিল মাত্র ৬ মাস। তাঁর মা জোয়ারা গ্রামের পেশকার বাড়ীর আজগর আলী পেশকার সাহেবের একমাত্র কন্যা। তিনি ১৯৪২ সনে প্রবেশিকা ও ১৯৪৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন। ১৯৪৬ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করেন। ছাত্র জীবন শেষ করে আবগারী ও শুল্ক বিভাগে চাকুরী করেন। তিনি ১৯৫৪ সনে ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বারে যোগদান করেন। আইয়ুব খানের আমলে তিনি সাবেক পটিয়ার ১৮নং জোয়ারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭২ সনে তিনি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি ও ১৯৮১ সনে সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং পরবর্তী কালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সাসদ-এর দক্ষিণ জেলা সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। তিনি চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু ল চেম্পলে (আইন কলেজ) বছরাধিকাল অবৈতনিক শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করেন। সমাজ সেবা মূলক কাজের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে ১৯৫৬-৬২ পর্যন্ত পটিয়া কলেজ সাংগঠনিক কমিটির সদস্য, ১৯৭৪-৮২ পর্যন্ত অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম শোলকবহর মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সম্পাদক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি, ১৯৪৩-৪৪ সালে জোয়ারা ইউনিয়ন রিলিফ কমিটির সম্পাদক, ১৯৫৯-৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি একাধিকবার হজ্বব্রত ও ওমরাহ পালন করেন এবং এশিয়া ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনি ‘ন্যাশনাল সলিডারিটি কাউন্সিলের’ সভাপতি, ‘ইসলামী আইন মূল্যবোধ ও সমাজসেবা’ নামক সংগঠনের চেয়ারম্যান এবং ‘লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি, মুললিম এডুকেশন সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি কদম মোবারক মুসলিম এতিমখনার ১০ বছরের অবৈতনিক সম্পাদক ছিলেন। কাউন্সিল ফর ওয়ার্ল্ড মুসলিম এফেয়ার্স এর তিনি ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। জাতীয় ও স্থানীয় বহু সেমিনার, আলোচনা সভায় গঠনমূলক আলোচনা করে জাতিকে দিকনির্দেশনা দেন। জনাব বদিউল আলম সহজ সরলভাবে তাঁর সফর অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেন। তিনি মানুষের অধিকার রক্ষায় এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক দিক নির্দেশনামূলক অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। এসব গ্রন্থে ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, আইন ও সামাজতান্তিক বহু তত্ত্ব ও তথ্য রয়েছে। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে “মুক্তিযুদ্ধের চেতন ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ”, “রাজনীতির সেকাল-একাল (প্রসঙ্গঃ বাংলাদেশের রাজনীতি)”, “বাংলাদেশঃ জাতীয়তা ও জাতীয়তাবাদ”, “যা কিছু মনে আছে”, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ও আজকের মুসলিম সমাজ”, “আইন ও সমকালীন প্রসঙ্গ”, “বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ”, “যৌতুক একটি সামজিক অভিশাপ”, “রক্তের আখরে বালাকোঠ”, দেশ হতে দেশান্তরে (ব্রিটেন ও সৌদিআরব)” “ফ্যাসাদ-ফেতনা চেতনা নয়, আত্মপ্রতারণা”, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি?” “কত স্মৃতি কত কথা”, প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল “ফৌজদারি মামলায় জেরার কলাকৌশল, ” “জননেতা শেখ মুজিব,” “আবহমান গ্রাম বাংলার চাল-চিত্র,” “উপমহাদেশের বিভক্তি ও আজকের বাংলাদেশ” ইত্যাদি উল্লেখ্যযোগ্য। বিভিন্ন জাতীয়, স্থানীয় দৈনিক ও ম্যাগাজিনে তাঁর বিপুল সংখ্যক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে তিনি লেখনির মাধ্যমে সংগ্রাম চালিয়ে যান মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ”, প্রন্থটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানটি আমাকে পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। মরহুম ইসলামী মূল্যবোধ ও সাম্যের সমাজ কায়েমের সৈনিক ছিলেন। মানুষে মানুষে হানাহানি, শত্রুতা ও নাগরিক জীবনে প্রকৃত দেশপ্রেমের অভাব তাকে ব্যথিত করে তুলতো। বিচার ও আইন বিষয়ে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ লিখা লিখেন যা জাতীয় ও স্থানীয় বহু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রামে হাইকোর্ট বেঞ্চের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রায়ই আমাদের বলতেন এবং এ ব্যাপারে তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন। মৃত্যুর পূর্বে কলকাতা সফর শেষে তিনি কর্ণফুলী নদীর উপর কলকাতার হাওড়া ব্রীজের মতো টানা ব্রীজের দাবীতে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। কেননা টানা ব্রীজ ছাড়া পিলার ব্রীজের মাধ্যমে কর্ণপূলী ভরাট হয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। এই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন দেশ প্রেমিক ব্যক্তিটি সর্বদাই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সোচ্চার, উদগ্রীব, উৎকন্ঠায় থাকতেন এবং নাগরিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন “আমরা সংখ্যায় কম হতে পারি কিন্তু কোন অন্যায়কেই বিনা প্রতিবাদে ছাড়া দেয়া উচিৎ নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঈমানী ও নাগরিক দায়িত্ব। আমাদের বলিষ্ট আওয়াজ জাতির বিবেক ও চেতনার সাগরে একটি ছোট ঢিল হতে পারে”। “কন্যা সন্তান আপদ নয়, সম্পদ”- শ্লোগানের প্রবক্তা ২ পুত্র ও ৮ কন্যা সন্তানের জনক জনাব বদিউল আলম, তাঁর প্রতিটি পুত্র ও কন্যাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশের ১ম মহিলা চার্টার্ড একাউন্টেন্ট রয়েছেন। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন প্রভৃতি দেশে সংসার জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে তাঁর পুত্র কন্যারা সাফল্যের পরিচয় দিয়ে স্ব স্ব গুনে প্রতিষ্ঠিত । একজন অভিজ্ঞ পেশাজীবী হিসাবে, একজন প্রতিশ্রুতিশীল ধার্মিক মুসলমান হিসাবে, একজন সমাজ দরদী চিন্তাবিদ হিসাবে তাঁর মধ্যে ত্রিমুখী দায়িত্ববোধের সমাবেশ ঘটেছিল। দীর্ঘদিন আইন ব্যবসায় নিয়োজিত থেকে এর জনস্বার্থ বিরোধী দিকসমূহ চিহ্নিত করে আইনের সংস্কারে তিনি তাঁর লেখনিতে দাবী জানিয়ে এসেছেন। ইংরেজ আমলে গোলামী যুগে প্রচলিত আইন সংশোধন করা তাঁর বিদেহী আত্মার দাবী। তিনি আজীবন যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতন, বেকারত্ব, ভিক্ষাবৃত্তি, ধর্মী গোঁড়ামী ও কুসংস্কার, যুব সমাজের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রকোপ, নগরবাসীদের মধ্যে গ্রাম বিমুখতা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অপচয়, ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী ছিলেন এবং এসবের সমাধানে ইসলামী শিক্ষা ও ঐতিহ্য গ্রহণে জাতিকে আহবান জানান। প্রফেসর ডঃ আব্দুল নূরের ভাষায় “জনাব বদিউল আলম লেখনীর মাধ্যমে গুই সাপের গর্তের মুখে দাঁড়িয়ে উম্মার জন্য মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন।” মরহুম বদিউল আলম চট্টগ্রামের অন্যতম সিনিয়র এডভোকেট মরহুম আবদুল লতিফ সাহেবের জুনিয়র ছিলেন। বদিউল আলমের শিষ্য আইনজীবীর সংখ্যা অগণিত। তাঁর কেউ জুনিয়র হতে চাইলে তিনি কখনো না বলতেন না। তাঁর জুনিয়রের সংখ্যা ছিল অগণিত, স্রোতের মতো । কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে । আইন আদালতের বিশাল জগতে তিনি আইন শিক্ষার্থী জুনিয়রদের নিজ পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করতেন। কোন জুনিয়র আইনজীবী ফিস না পেলে চেহারা দেখে তা তিনি বুঝে ফেলতেন। তিনি পকেট থেকে তাকে টাকা দিতেন এবং বলতেন তাঁরও ওকালতি জীবনে বহুবার খালি পকেটে ঘরে গেছেন। এভাবে তিনি জুনিয়রদের হতাশা দূর করে পেশায় মনোযোগী হতে উৎসাহ দিতেন। তিনি মক্কেলদের প্রায় জিজ্ঞেস করতেন আগে তাঁর জুনিয়রদের ফিস দিয়েছেন কিনা। সম্ভবত আইনজীবীরে মধ্যে চট্টগ্রামে বদিউল আলম সাহেবেরই সবচেয়ে বেশী জুনিয়র রয়েছে। কেননা জুনিয়রদের তাঁর চেম্বারে আসা যাওয়ার ব্যাপারে, তিনি কোন কড়াকড়ি করতেন না। ফলে তাঁর চেম্বারে একটি জুনিয়রদের পেশায় যোগদানের মাধ্যমে পরিণত হয়। মরহুমের নামে চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং-এ এডভোকেট বদিউল আলম নামে একটি ফুট-ওভার ব্রীজও রয়েছেন । ব্রীজটি স্থাপনে তদানিন্তন যোগাযোগ ও রেলমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা স্যারের সাথে যোগাযোগের জন্য আমাকে এবং এডভোকেট মোঃ শরীফউদ্দিনকে আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেয়া হয় । বর্তমান জেলা জিপি এডভোকেট নাজমুল আহসান খান ঐ সময় সমিতির সম্পাদক ছিলেন । দাম্পত্য জীবনে, স্যার খুবই সফল ও সার্থক মানুষ ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সনের ২১ শে জানুয়ারী আনোয়ারা থানার পিরখাইন গ্রামের সিকদার পরিবার থেকে বিয়ে করনে। তাঁর স্ত্রী জেবুন্নেছা বেগমের প্রসঙ্গে আলোচনাকালে বদিউল আলম স্যার সম্মান সূচক ‘তিনি’ শব্দ ব্যবহার করতেন। ‘সে’ বলতেন না। তাঁর ওকালতি ও লেখক জীবনের সফলতার জন্য তিনি তাঁর স্ত্রীর বদান্যতা সর্বদা অকপটে স্বীকার করতেন। তাঁর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য স্ত্রীর দোয়া ও ত্যাগ অনিস্বীকার্য। তাঁর মৃত্যুর বছর কয়েক পূর্বে তাঁর বৈবাহিক জীবনের ৫০ বছর পূর্তির পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে তাঁর স্মরণে একটি লেখা লিখে দিয়েছিলাম। “বিয়ে মানে হৃদয়বিহীন ঐক্যতান নয়”। বদিউল আলম প্রসঙ্গে আমার লেখাটি হারিয়ে ফেলায় তিনি বার বার আমাকে তা আবার লিখে দেয়ার জন্য বলতেন। কিন্তু আমার তা সম্ভব হয়নি। আইন পেশায় ৫০ বছর পূর্তিতে তিনি তাঁর সকল জুয়িরদের নিয়ে বহদ্দারহাটের বাড়ীর লনে মাছ-ভাতের অনুষ্ঠান করেছিলেন। দলমত নির্বিশেষে আইনজীবীদের এটি একটি বিরাট সমাবেশে পরিনত হয়। তিনি গ্রামকে ভালোবাসতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত তাঁর নাগরিক স্মরণ সভায় দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অথিতি হিসেবে এসেছিলেন। পরবর্তীতে আরেক বছর তৎকালিন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার রোকনুদ্দিন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম এসেছিলেন। এতে প্রমানিত হয় যে তিনি একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মা বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য তাঁর সন্তানেরা গঠন করেছেন এডভোকেট বদিউল আলম জেবুন্নেসা ট্রাস্ট । মরহুমের ছোটসন্তান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো এর অনারারি কনসাল জিয়াউদ্দিন আদিল মরহুমের নিজ গ্রামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন যা তুরষ্কের ইস্তাম্বুল ঐতিহাসিক ব্লু-মসজিদ এর আদলে করা হয় মসজিদটি দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী ভিড় জমায় । পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন সফল ফৌজদারী বিশেষজ্ঞ আইনজীবী। বিশেষ করে তাঁর জেরার কৌশল ছিল অতুলনীয়। বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলায় তাঁর জেরার কৌশল গুলো পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা গেলে আইন আদালত খুবই উপকৃত হবে। তিনি জুনিয়রদের স্নেহ করতেন, সিনিয়রদের ও বিচারকদের সম্মান করতেন। এ জন্য তাঁকে ভদ্রতম ব্যক্তি বলা যায়। বিভক্তি নয়, জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যমত তাঁর প্রাণের অন্যতম আকাঙ্খা ছিল। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নয়, স্বাধীন স্বনির্ভর শোষনমুক্ত বাংলাদেশ তাঁর স্বপ্ন ছিল। অসহিষ্ণু রাজনীতির তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। পরিণত বয়সে প্রায়ই বলতেন “ইসলাম মানবতা ও মানবাধিকারের ধর্ম, আমরা সন্ত্রাসী নই, আমরা মানবতাবাদী, আমরা মুসলমান” এ শ্লোগান নিয়ে বিশ্ব মুসলিমের একটি আওয়াজ তোলা আজ সময়ের দাবী। মানুষের জন্য অনেক অনেক ভালোবাসার মানুষটি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ঘুমিয়ে আছেন চন্দনাইশের নিজ গ্রামের কবর গাহে। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন অগণিত ভক্ত, অনুরক্ত, আদর্শ স্মৃতি ও অমূল্য লেখনী। এসবের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনাদীকাল পর্যন্ত। পরিশেষে কবির ভাষায় বলা যায়, “নয়ন সম্মুখে তুমি নেই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছেন যে ঠাই,” সার্বিক বিবেচনায় তিনি ছিলেন একজন সফল মানুষের পথিকৃৎ।

লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকারকর্মী ও সুশাসনকর্মী

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত

ফতোয়া দেয়ার অধিকার সকলের জন্য অবারিত নয়-জিয়া হাবীব আহসান

হীরাদের প্রাণ ভিক্ষা চাই!

আমরা নিজেদের তৈরী ফ্রাংকেনস্টাইনে নিজেরাই আক্রান্ত

চীনের দুঃখ হুয়াংহো, বোয়ালখালীর দুঃখ কালুরঘাট আর মহেশখালীর দুঃখ ফেরিঘাট!

logo

নিউজ ভিশন বাংলাদেশের একটি পাঠক প্রিয় অনলাইন সংবাদপত্র। আমরা নিরপেক্ষ, পেশাদারিত্ব, অনুসন্ধানমূলক, তথ্যনির্ভর, নৈতিক সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী।

সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

ঢাকা অফিস: ইকুরিয়া বাজার,হাসনাবাদ,দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ,ঢাকা-১৩১০।

চট্টগ্রাম অফিস: একে টাওয়ার,শাহ আমানত সংযোগ সেতু রোড,বাকলিয়া,চট্টগ্রাম |

সিলেট অফিস: বরকতিয়া মার্কেট,আম্বরখানা,সিলেট |

রংপুর অফিস : সাকিন ভিলা, শাপলা চত্ত্বর, রংপুর |

+8801789372328, +8801829934487 newsvision71@gmail.com, https://newsvisionbd.com
Copyright@ 2021 নিউজ ভিশন |
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ‌্য মন্ত্রণালয়ে আবেদিত ।

%d bloggers like this: