সভ্য সমাজে কেন বাড়ছে এমন ঘটনা !!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:২৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২০

অ্যাডভোকেট মো. সাইফুদ্দীন খালেদ

দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে নারীরা কতটুকু নিরাপদে! মেয়ে তার বাবার হাত ধরে বাহির হবেন, আর স্বামীর হাত ধরে স্ত্রী বাহিরে বেড়াতে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। বাবা তার কন্যাকে, স্বামী তার স্ত্রীকে সর্বোচ্চ নিরাপদে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাবার কাছ থেকে মেয়েকে কিংবা স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে নৈতিকতাহীন কিছু অমানুষ তাদের অমানুষিক নির্যাতন, শ্লীলতাহানি কিংবা ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটায়। একের পর এক সংবাদ এসে হাজির হচ্ছে বর্বরতার বর্ণনা নিয়ে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? বাংলাদেশে গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বাদ যায়নি প্রতিবন্ধী কিংবা ছয় বছরের শিশুও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে এসব নারী ও শিশুকে। এক এলাকার ধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গণমাধ্যম কেঁপে ওঠে নতুন আরেক ঘটনায়। নারীরা প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে থাকছে না বয়স, স্থান, কাল, পাত্রের ভেদ। রাত-বিরাতে নয় শুধু, দিন-দুপুরে প্রকাশ্যে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। ঘরে, বাইরে, রাস্তাঘাটে, যানবাহনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। শুধু ধর্ষণই নয়, রীতিমতো গণধর্ষণ হচ্ছে। অনেক সময় ধর্ষণ করার ঘটনা ধর্ষক বা তার সহযোগী কর্তৃক মোবাইলে ভিডিও করে রাখে। পরবর্তীতে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে পুনরায় ধর্ষণ কিংবা টাকা দাবী করা হচ্ছে। সভ্য সমাজে এমন অসভ্যদের বিচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারনত আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্টে প্রত্যেক নারী পুরুষের স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। নারীর সেই মুক্তি, নারীর মর্যাদা, নারীর অধিকার, নারী শিক্ষার কথা বলেছে ইসলাম আজ থেকে বহু বছর বছর আগে। কিন্তু বিশ্ববাসী তা শুনতে পেয়েছে কি? শুনলেও কান দেয়ার সময় পায়নি। এমনকি সমাজেও বিষয়টা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেনি। আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই মৌলিক অধিকার সমান ও অভিন্ন। একুশ শতকে পদার্পন করে বর্তমান বিশ্ব যে সমাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পালাবদলে অংশ নিচ্ছে নারী সেখানে এক অপরিহার্য অংশীদার, জীবন যুদ্ধেও অন্যতম শরীক ও সাথী। এককালে মাতৃতান্ত্রিক সামাজে নারীরা ছিল প্রধান্য। কিন্তু পরবর্তী কালে সমাজে পুরুষের প্রধান্য প্রতিষ্টিত হলে নারী হয়ে পড়ে অন্তপুরবাসী। আধুনিক কালে নারীর স্বতন্ত্র মানবিক ভূমিকা স্বীকৃত হয় পাশ্চাত্যে। ইংরেজ শাসন শুরু হলে উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার হাওয়া লাগে। যে হাওয়ায় নারী আবার শিক্ষার অঙ্গনে আসার সুযোগ পায়। এঙ্গেলস তাঁর ‘‘অরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি’ গন্থে বলেছেন, ‘‘নারী মুক্তি তখনই সম্ভব যখন নারীরা সমাজের প্রতিটি কর্মকান্ডে সমগুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে’’। আর নারীকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে, নারীর উন্নয়নের জন্যে, এক কথায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে দরকার সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার অবসান। প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। বর্তমান সভ্য সমাজে শিক্ষা ছাড়া সবই অচল। তাছাড়া কোনো স্বাধীন জাতির পক্ষে নিরক্ষর ও মূর্খ থাকা এবং বিশ্বজগৎ, জীবন ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে অজ্ঞান থাকা জাতীয় মর্যাদার পক্ষে হানিকর। যদিওবা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় জীবনে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় এবং সমাজে নারী পুরুষের সমান মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি পায়। মানবাধিকার ও অগ্রগতির এই একুশ শতকে সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে নারীরা এগিয়ে আসছিল মানুষের ভূমিকায়, আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে। কিন্তু তাদের অগ্রযাত্রায় যৌন নির্যাতন, ইভটিজিং কিংবা ধর্ষণ বিশাল প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে যা নারী শিক্ষা ও তাদের জীবন যাত্রায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নারী নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের সংখ্যা দ্রুত হারে যেন বেড়ে যাচ্ছে। ঘরের বাইরে নারীদের নিরাপত্তাহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে খবরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের মত ঘটনাও আসে। আসলে সংলাপগুলো একদিক দিয়ে লজ্জাজনক অন্যদিক দিয়ে বেদনাদায়ক। পবিত্র শিক্ষাঙ্গন গুলো অপবিত্র করতে যাচ্ছে এক শ্রেণীর নিপীড়ক, কিছু কুচক্রিলোক। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের খরব পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। দেশবাসী এসব সংবাদ দেখে, যা অপ্রত্যাশিত। একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটে চলছে। মাঝে মধ্যে শিক্ষক দ্বারাও নির্যাতিত হয়। বর্ণিত এই ধরণের শিক্ষককে কি সত্যিই মানুষ গড়ার কারিগর বলা যায়? আমি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি শিক্ষাঙ্গন হচ্ছে জ্ঞান চর্চার সর্বোৎকৃষ্ট অঙ্গন। এই অঙ্গন গড়ে তোলে জাতির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। পৃথিবীর যে কোন বড় সামাজিক দায়িত্বপালন করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলে অপ্রিয় সত্য যে, এধরণের কুচক্রিলোকদের কবলে শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাচ্ছে। জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতিফলক শিক্ষাঙ্গন যোগ্য নাগরিক উপহার দিতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিবছর কোননা কোন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা গ্রহণে যাওয়া ছাত্রী ধর্ষিতা হয়ে, যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসছে। অথচ এদের কাছ থেকে পরিবার যেমন অনেক কিছু আশা করে তেমনি জাতিও অনেক কিছু আশা করে থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনকে এদের কবল থেকে মুক্ত করে শিক্ষা এবং জাতির মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করা আবশ্যক। অপরদিকে ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে যেসব বিষয় সমাজে বহুদিন ধরে অস্থিত্ব বজায় রেখেছে তার মধ্যে ইভটিজিংও রয়েছে। এ অমানবিক বিষয়টি মানুষকে অবমূল্যায়ন করছে। বৃদ্ধি করছে সামাজিক সমস্যা, নিয়ে আসছে সমাজ জীবনে অনাকাঙ্খিত বিপুল দুঃখ দুর্দশা। চলার পথে কিংবা কর্মক্ষেত্রে কিশোরী ও তরুণীদের বিরক্ত করা, কুপ্রস্তাব দেওয়া, শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা ইত্যাদি অবৈধ ও অনৈতিক কর্মকান্ডের প্রস্তাব করা হচ্ছে ইভটিজিং যা আমাদের সমাজে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ইভটিজিং একটি মারাত্মক রূপে পরিগণিত হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে এর শিকার কিশোরী তরুণীরা লজ্জা গোপন করার জন্য কত আত্মদান লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে তারও কোন ইয়াত্তা নেই। ভিকটিমরা এই সম্বন্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে ভয় পান। আইন আছে, সমাজে ঘৃণাও আছে। তবুও দুষ্ট ক্ষতের মত এই বিষয়টি সমাজ জীবনে নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে আছে। কত নিরপরাধ কিশোরী-তরুণীর জীবন যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আজ আমাদের সমাজটা অবক্ষয়ে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। এগুলোর জন্য দায়ী আমাদের যুব সমাজের সঠিক মনুষ্যত্ববোধের অভাব। যখন তাদের চরিত্র থেকে মহৎ গুণ বিদূরিত হয়ে অন্যায় অনাচার আশ্রয় নেয়। জীবনের কোন মহৎ লক্ষ্য থাকে না তখন এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। তারা বখাটে হিসেবে পরিচিত হয়ে যায় এবং বখাটেদের সমস্ত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে তারা সুস্থ জীবন থেকে আলাদা হয়ে ঝুঁকে পড়ে অবক্ষয়ের গহীন আবর্তে। তাছাড়া সমাজ জীবনে চলতে গেলে বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই বন্ধুত্বের মধ্যে যদি “ছেলে” এবং “মেয়ে” এই শব্দের দূরত্ব থাকে তখন মেয়েদের সাথে বন্ধুত্বটা ছেলেদের কাছে আড্ডার, আলোচনার দুফোঁটো রস যোগানোর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এই দিক দিয়ে একটি ছেলের বখাটেপনা শুরু। আমাদের এও জেনে রাখা দরকার যে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত ছেলেরা পিতামাতার বাধ্য থাকে। বর্তমান প্রেক্ষপটে দেখা যায় ছেলেরা আড্ডার টেবিলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে কে কার চেয়ে বেশি মেয়েদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে বা তারা নির্দিষ্ট একটি এলাকায় বা স্থানে দাঁড়িয়ে থেকে স্কুল বা কলেজের সুন্দর মেয়েদের বিরক্ত করতে পারবে। এর ফলে যা হয় তা মুখে বলতে হয় না। আর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস দেখায় কে? যদি কোন রাজনৈতিক নেতার আশ্রিত হয়। ফলে অভিযোগ করলেও সেটার আর গুরুত্ব থাকে না। কত মেধাবী ছাত্রী অকালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে থাকে কারন তার ঘরের মধ্যেই তার বৈষম্যের কারনে সে বিষয়টা পরিবারে আলোচনা করার সাহস পায় না। যদি করেও থাকে সেক্ষেত্রে তার পরিবার তার বিয়ে দেওয়ার মতো নজির আমাদের সামনে আছে। সচেতন পিতামাতা হলে অনেক সময় তাদেরও লাঞ্চিত হতে হয় এই বখাটেদের হাতে। তাছাড়া অনেক সময় আপত্তি করলেও আরো বেশি করার নজিরও আমরা দেখেছি। ছাত্রীদের প্রতি এই ধরণের আচরণের দিকে তাকালে দেখি বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্রীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এতে করে ছাত্রীরা বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার শেষ ভরসাটুকু হারিয়ে ফেলে এমনকি অভিভাবকরা পর্যন্ত হতাশ হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে আইন আছে, শাস্তির ব্যবস্থা আছে। তবু এ ধরণের অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে? আমাদের দেশের মতো দেশের বেকারত্ব, হতাশা, উপযুক্ত বিনোদনের অভাব, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা, সর্বোপরি প্রত্যেক ধর্মের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসনগুলো সঠিকভাবে পালন না করার জন্য এ ধরণের অপরাধ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। যথার্থ উদ্দেশ্য থেকে মানবমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে অবক্ষয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যে কোন আইনে নারীর ওপর অত্যাচারের বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। সিডো সনদের ১ অনুচ্ছেদের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘শরিক রাষ্টগুলো নারীকে সব ধরণের অবৈধ ব্যবসায় এবং দেহ ব্যবসায়ের আকারে নারীর শোষণ দমন করার লক্ষে আইন প্রণয়নসহ সব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’’। দেশীয় আইনেও এমন অনৈতিক কাজের বিচার এর ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(২) ও ৩৪(১) অনুযায়ী গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে এবং সব ধরনের জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দন্ডনীয়। ইভটিজিং দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৫০৯ ধারায় দন্ডনীয় অপরাধ এবং দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এ শাস্তির বিধান রয়েছে। এ আইনের ১০ ধারায় যৌনপীড়ন এর শাস্তি হিসেবে অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন ৩ বছর সশ্রম কারাদন্ডের বিধান রয়েছে এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থ দন্ডও রয়েছে। আর যদি নারীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে বা অশোভন অঙ্গভঙ্গি করে তাহলে অনধিক ৭ বছর অন্যূন ২ বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ড। উক্ত আইনের ৯ ধারা অনুসারে ধর্ষণের শাস্তি হলো, ধর্ষণের কারণে বা ধর্ষণের পর অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ভিক্টিম মারা গেলে ধর্ষণকারীকে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে এবং অর্থদন্ড প্রদানের বিধান রয়েছে। কোন নারী বা শিশুকে একাধিক ব্যক্তি মিলে ধর্ষণ করলে এবং সেই মহিলা বা শিশু মারা গেলে বা আহত হলে প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং অর্থদন্ড প্রদানের বিধান রয়েছে। যেকোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণের পর মৃত্যু বা আঘাত করার চেষ্টা করলে, তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ড প্রদান করা হবে। তবে ধর্ষণের চেষ্টা করলে দশ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডে দন্ডিত করা হবে, অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং অর্থদন্ডও হতে পারে। কোনো নারী পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে ধর্ষিত হলে হেফাজতের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যকেও নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থতার জন্য শাস্তি দেওয়া হবে। সেইসাথে ধর্ষণের বর্ণনা যথাযথভাবে দিয়ে দোষ স্বীকার করলে সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদন্ড, নি¤েœ ৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং জরিমানাও হতে পারে।
প্রতিরোধে আমার অভিমত ঃ আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমাদের মেয়েদেরকে পুরুষতান্ত্রিকতার বাইরে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে দেওয়াটাই ভালো হয়। এতে করে তাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তখন নিজে নিজেই ইভটিজিং রোধের সুযোগ পাবে, ফিরে পাবে তাদের মানসিক দক্ষতা। আর সবচেয়ে যে দিকটা আমাদের বর্জন করা উচিত তা হলো বিদেশী সংস্কৃতি চর্চা, যাতে মেয়েদের উক্তত্য করার মতো অনেক উপাদান আমাদের চোখে পড়ে। আমি বলছি না সব বর্জন করা উচিত। তবে আগে দেশপ্রেম গড়ে উঠতে উপাদান গুলো ছেলেমেয়েদের দিতে হবে অর্থাৎ দেশীয় সংস্কৃতির শিক্ষা এবং তারপরে ঐগুলোর প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে যদি শিক্ষনীয় হয়ে থাকে। বর্জন করতে হবে সিনেমার অশ্লীল কাহিনী, নাচগান, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি যেগুলোতে যুবশ্রেণী অতি সস্তায় ও সহজে আমোদ প্রমোদের উপকরণ খুঁজে পায়। তারা অনেক সময় এসব উদ্ভট ও অবাস্তব কাহিনীকে বাস্তব জীবন বলে চালিয়ে দিতে গিয়ে মারাত্মক ভুল করে। নানা প্রকার বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণে যুবকেরা ভোগ ও বিলাসিতার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনের যত্রতত্র ব্যবহার বিশেষ করে উঠটি বয়সের ছেলেদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছে যা ইভটিজিং এর জন্য অনেকাংশ দায়ী বলে ধরা হচ্ছে। আমাদের দেশে আগত বিদেশী সংস্কৃতির গতিপথ নিয়ন্ত্রিত করতে হবে সমাজের সচেতন মানুষকে এবং সরকারকে। বিদেশী সংস্কৃতির যে অংশটুকু ইতিবাচক তাহাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। নেতিবাচক অংশটুকু বর্জন করা আবশ্যক। শাসন ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে কেননা দুর্বল শাসন ব্যবস্থা দেশের পরিবেশ কলুষিত করে। মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। স্কুল, কলেজ, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা আবশ্যক। সৎ, আদর্শ ও ন্যায়পরায়ন মানুষে সমাজ পরিপূর্ণ করে তুলতে পারলেই জাতির প্রকৃত উন্নতি ঘটবে এই ব্যাপারে সকলকে সচেতন হতে হবে। মেয়েদের প্রতি বখাটেদের উৎপাত বা ইভটিজিং বন্ধে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ছেলে মেয়ের বৈষম্য দূর করা, প্রচলিত আইনে দূর্বলতা কমিয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। ইভটিজিং বন্ধে সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ধর্ষণ, ইভটিজিং ও নারী অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে সরকারী ব্যবস্থাপনায় পরামর্শকেন্দ্র চালু করা এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা ক্লাশের ব্যবস্থা করা দরকার। ছাত্রীদের জন্য মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা দরকার। পরিবার-সমাজ, বিদ্যালয়ের মতো জায়গাগুলোতে নৈতিক শিক্ষার বিস্তার করা উচিত। পরিবার প্রধানদের খেয়াল রাখতে হবে- সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করার দায়িত্ব প্রথমে পরিবারের। সমাজ থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধ আর নৈতিক শিক্ষাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সভ্য ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ বিনির্মান সম্ভব হয়না। অধিক কর্মক্ষেত্র তৈরী করে বেকারদের কাজের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সময় তার স্বভাব চরিত্র ও বংশ মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আত্মহত্যার ঘটনা পত্রিকায় বা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার বন্ধ করা। হত্যা ঘটনাকে আত্মহত্যা মামলা হিসেবে রুজু করার প্রবণতাকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। মেডিকেল পরীক্ষায় মানসম্মত প্রটোকল মেনে চলতে হবে, অভিজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে এবং সবকিছুর ডকুমেন্ট রাখতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন ও আধুনিকায়ন করে সঠিক ও যথাযথভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। শাস্তির বিষয়গুলোও প্রচার করা দরকার গণমাধ্যমে যাতে কেউ এই ধরনের হীন কাজ করার সাহস না দেখায়। সভ্য সমাজে অসভ্যদের অবাধ বিচরণ রোধে বিচক্ষণতার সঙ্গে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নারীর ঘরের বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, সামাজিক সংগঠন, সেচ্ছাসেবক সমিতি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম সহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যৌথ উদ্যোগে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে নৈতিক মানের অবক্ষয় প্রতিরোধ করার জন্য।

লেখকঃ আইনজীবী।