বৃহস্পতিবার ৯ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
আমাদের সম্পর্কে
যোগাযোগ

“সন্তানের হাতে মোবাইল দেওয়ার আগে, বই তুলে দিন”

সেপ্টেম্বর ৩, ২০২১
প্রিন্ট
নিউজ ভিশন

নুরুল ইসলাম নূর :

আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ইন্টারনেট প্রযুক্তি মাদকের মত আচ্ছন্ন করে রেখেছে। দিনদিন ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতির ফলে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন পূর্বের চেয়ে বহুলাংশে উন্নত হচ্ছে, তেমনি আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকে আসক্ত হওয়ার মত ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তারা ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ব্যয় করছে। মোবাইল ফোন নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকার ফলে নতুন প্রজন্ম হতাশা এবং মানসিক বিকারগ্রস্ততার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে।
অতীতে তরুণরা সুন্দর ঝলমলে শৈশব কাটিয়েছে। বিকালে মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে খেলার মাঠে গিয়ে পৃথিবী জয়ের আনন্দ অনুভব করেছে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বই নিয়ে টেবিলে বসে পড়েছে। আর বর্তমান তরুণদের হাতে মোবাইল। বর্তমান প্রজন্ম শারীরিক গঠন ও মানসিক প্রশান্তির মধ্য বেড়ে উঠার সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে।

বর্তমানে আমাদের সমাজের মোটামুটি সবাই প্রযুক্তিতে আসক্ত। বাচ্চাদের আসক্তি গেইম-কার্টুনের প্রতি, তরুণ ও যুবকদের আগ্রহ ফেসবুক, খেলা, সিনেমা, অনলাইন নির্ভর গেইম প্রভৃতি। বয়স্করা টিভিতে খবর দেখার নামে বাচ্চাদের সামনে অসংলগ্ন পরিচ্ছদের নারীর প্রদর্শন দেখান। আধুনিক মায়েরা তো আরও এক ধাপ এগিয়ে, বাচ্চাকে পাশে পড়তে বসিয়ে রিমোট হাতে তিনি মজে থাকেন পরকীয়া সম্বলিত টিভি সিরিয়ালে। ঘরের কোথায় কী ঘটছে, স্বামী-সন্তানের কী খবর, তার সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েরা দিনে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা ডিজিটাল যন্ত্র নিয়ে মেতে থাকছে। হাতে বই নিয়ে বসা তো দুরের কথা বাইরে বেড়াতে যাওয়া, খেলাধুলা করা, মুখোমুখি বসে আড্ডা দেওয়া ইত্যাদি সব ধরনের অ্যাকশনে আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহার করতে দেননি। আমেরিকার এক রোবটিকস ও ড্রোন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ক্রিস অ্যান্ডারসন বলেন, আমরা ভেবেছিলাম, এই প্রযুক্তি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এটা সরাসরি চলে যাচ্ছে বিকাশমান মস্তিষ্কের প্লেজার সেন্টারগুলোতে। সাধারণ পিতা-মাতার পক্ষে ব্যাপারটা বুঝতে পারা একেবারেই অসম্ভব। ফেসবুকের প্রথম চেয়ারম্যান শন পার্কার ফেসবুক ছেড়ে দেওয়ার পরে ফেসবুক সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, এই যে ক্ষণিক ডোপামিন-তাড়িত ফিডব্যাক লুপস আমরা তৈরি করেছি, এটা আমাদের সমাজের স্বাভাবিক সক্রিয়তা নষ্ট করে দিচ্ছে। ফেসবুকের সাবেক এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট আথেনা শাভারিয়া বলেছেন, আমি নিশ্চিত আমাদের মোবাইলের মধ্যে বাস করে শয়তান, সে আমাদের সন্তানদের মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে। তিনি আরো বলেছেন, সেই ছেলেটি বা মেয়েটিই শিক্ষা প্রতিষ্টানে সবচেয়ে ভালো করবে, যার হাতে ফোন পৌঁছাবে সবার পরে।
যে বয়সে শিক্ষার্থীরা বই হাতে নিয়ে বসে থাকার কথা, তার কৌতূহল মেটাবার জন্য রাতদিন একত্র করে বইয়ের ভেতর মুখ গুঁজে পড়ে থাকার কথা, সেই শিক্ষার্থীরা আজ সিনেমায়, ফেসবুকে, নাটকে নিজেদের বিলীন করে দিচ্ছে।

বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে এর থেকে উত্তরণের উপায় হল তাদেরকে বই মুখি করতে হবে। ছোট সন্তানদের সামনে কখনো ফোন বের করা যাবে না। ওরা যখন ফোন দেখবে না, তখন এর প্রতি আকর্ষণও অনুভব করবে না। বাচ্চারা সাধারণত কার্টুন দেখার জন্য ও গেইম খেলার জন্য মোবাইলের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। এই বস্তুসহ টিভি-সিনেমা প্রভৃতি থেকে দূরে রাখতে পারলেই তাদের শৈশব ঝলমলে হয়ে উঠবে। ডিভাইস বা ঘরে বন্দি থাকার উপকরণ না পেয়ে তারা বাইরে যেতে উসখুস করবে এবং খেলাধুলা করে, আলো-বাতাস গায়ে মেখে চমৎকার গড়ন ও মানসিকতার অধিকারী হবে। নির্দিষ্ট বয়সের আগে সন্তানের হাতে মোবাইল তোলে না দিয়ে বই তোলে দিন। একটি সুন্দর বই হচ্ছে একটি রহস্যময় সুন্দর ভুবনের দরজা। প্রতিটি পৃষ্ঠা আপনার সন্তানকে সাহায্য করবে রহস্যের জট খুলে কাহিনীর গভীরতায় টুকতে, শেখায় জীবনবোধ, সংগ্রাম, অনুপ্রেরণা। বই আপনার সন্তানকে নিয়ে যাবে সুদূর অতীতে এবং টাইম মেশিন ছাড়াই হাজার হাজার বছর সামনের ভবিষ্যতে। বইয়ের মাধ্যমে সে অতীত পূর্বপুরুষের কাছাকাছি চলে যেতে সক্ষম হবে। তাদের জীবন-যাপন, আচার-আচরণ, ইতিহাস, সংগ্রাম ইত্যাদি বিষয় সম্পকে ধারণা লাভ করতে পারবে। আর বই শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জনের জন্য অথবা তথ্য আহোরণের উপায় তা কিন্তু নয়, একটা ভালো গল্পের বই বা উপন্যাস মানুষকে হাসাতেও পারে আবার কাদাঁতেও পারে। মোটকথা একটা চমৎকার বই মানুষের অনুভূতিগুলো নিয়ে দারুনভাবে খেলা করতে পারে। সিইও জিগ্গি জর্জ বলেন, “মানুষ যখন বই পড়ে তখন সে তার উন্নয়নটা চোখের সামনে দেখতে পায় না। কিন্তু অনেকটা ভিডিও চিত্রের মতো অনেক কিছুই মানুষের মনে গেথেঁ বসে যায়। আর সেটাই তার মনের বিকাশে সহায়তা করে”।

বই পড়লে জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনার সন্তানের শরীর সুস্থ রাখতেও বই পড়ার অভ্যাস দারুণভাবে সাহায্য করে। তাই তো চিকিৎসক নিয়মিত ১ঘন্টা বই পড়তে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, আজকের যুগে যেসব রোগে নতুন প্রজন্ম বেশি মাত্রায় ভুগছে তার বেশিরভাগ এর সাথে মানসিক চাপের সরাসরি যোগ রয়েছে। আর বই পড়ার অভ্যাস এমন ধরনের সমস্যাকে দূর করতে সহায়তা করে। সেই সাথে হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস, স্ট্রোক প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হওয়াের আশাষ্কাও হ্রাস করে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস করলে ব্রেনের কর্মক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবে মস্তিস্কের একটি বিশাল অংশের ক্ষমতা এটতা বৃদ্ধি পায় যে বুদ্ধির ধারও বাড়তে শুরু করে। তাই আসুন সন্তানের হাতে মোবাইল দেওয়ার আগে বই তোলে দেই। প্রযুক্তিতে আসক্ত হওয়ার আগেই বইয়ের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করি। তাহলেই আপনার সন্তান সৎ, দক্ষ, আদর্শ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

নুরুল ইসলাম নূর
শিক্ষার্থী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
logo

নিউজ ভিশন বাংলাদেশের একটি পাঠক প্রিয় অনলাইন সংবাদপত্র। আমরা নিরপেক্ষ, পেশাদারিত্ব তথ্যনির্ভর, নৈতিক সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী।

সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

ঢাকা অফিস: ইকুরিয়া বাজার,হাসনাবাদ,দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ,ঢাকা-১৩১০।

চট্টগ্রাম অফিস: একে টাওয়ার,শাহ আমানত সংযোগ সেতু রোড,বাকলিয়া,চট্টগ্রাম |

সিলেট অফিস: বরকতিয়া মার্কেট,আম্বরখানা,সিলেট | রংপুর অফিস : সাকিন ভিলা, শাপলা চত্ত্বর, রংপুর |

+8801789372328, +8801829934487 newsvision71@gmail.com, https://newsvisionbd.com
Copyright@ 2021 নিউজ ভিশন |
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ‌্য মন্ত্রণালয়ে আবেদিত ।