শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা??

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১২:১৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০

সাদিয়া সুলতানা :

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। সর্বশেষ শিক্ষানীতি ২০১০ এর মুখবন্ধে এই মেরুদণ্ড দিয়ে সংক্ষেপে নিখুঁত বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। যার উপর ভিত্তি করে শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন রিপোর্ট ধারণের চেষ্টা চলছে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষানীতিতে কতটুকু পরিবর্তন আনায়নে সক্ষম হয়েছে এই চেষ্টা?

প্রথমে জানা যাক শিক্ষা কি? শিক্ষা শব্দটা আচরণ গত পরিবর্তন বোঝায়। শিক্ষা হলো বৃদ্ধি ও বিকাশমূলক প্রক্রিয়া। শিশু ও শিক্ষার্থীর মনের মধ্যে যে সব মানসিক শক্তি জন্মসূত্রে বিদ্যমান সেগুলো বাইরে আনা।
এরিস্টটলের মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য হল ধর্মীয় অনুশাসনে অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখলাভ। জ্ঞানার্জন, চরিত্র গঠন, কৃষ্টি চেতনার উন্মেষ ঘটানো শিক্ষার লক্ষ্য।

প্রাথমিক শিক্ষা ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসেবে প্রাথমিক স্তরে বর্তমান মোট শিক্ষার্থী ২ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৩৮ জন। অথচ উচ্চ শিক্ষার দ্বারগোড়ায় যেতে এ সংখ্যার এক বিশাল অংশ ঝরে যাচ্ছে। অংকুরে ঝরে যাচ্ছে হাজারো শিক্ষার্থী। হাওর ও পার্বত্য এলাকায় এ ঝরে পড়ার হার বেশি। শহরে মোটা দাগে শিশুরা শিশুশ্রম করছে পরিবারের সচ্ছলতার জন্য।

পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা বেশি হওয়াতেই শ্রেণী কক্ষের পাঠদানের চেয়ে শিক্ষকগণ কোচিং বাণিজ্যে বেশি মনোযোগী। পরীক্ষার চাপে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে পড়াশোনাতে। অভিভাবকরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে সন্তানকে জিপিএ -৫ পাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। আর তাই দিনের একটা লম্বা সময় স্কুলে থাকার পর বাসায় এসে অনিচ্ছাকৃত ভাবে বসতে হচ্ছে হোম টিউটরের কাছে। ফলে খেলাধূলায় পাচ্ছে না পর্যাপ্ত সময়। ব্যহত হচ্ছে শিশুর মানসিক বিকাশ।

তাছাড়া শিক্ষকদের সংখ্যা কম হওয়াতেই একজন শিক্ষক নিচ্ছেন একাধিক ক্লাস। গণিত, আইসিটি শিক্ষক নেই এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম নয়।এছাড়াও রয়েছে শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, ক্লাস বর্জন, বেতন বৈষম্য, ক্লাসরুম সংকট, পাঠদান উপকরণের অভাব নিয়ে আন্দোলন করে
বছরের বাকি সময়ে নির্দিষ্ট কিছু টপিক দিয়েই সিলেবাস কমপ্লিট করে বসায় পরীক্ষায়।
ফলশ্রুতিতে পাশের হার বাড়লেও বাড়ছে না শিক্ষার্থীদের গঠনমূলক শিক্ষার মান।

মাধ্যমিক পর্যায়ে, দুটি পাবলিক পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীরা ভীত হয়ে যায়। ফলে বছরের প্রথম দিন কোচিং-এ ভর্তি করা হয় তাদের। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো করার উদ্দেশ্যে হাতে-কলমের শিক্ষার থেকে মুখস্থ বিদ্যাতে ঝুঁকে পড়ে।ফলে শিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না।

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর আরো বেহাল দশা। গ্রামীণ কলেজ গুলো তে ভালো মানের পড়াশোনা হয় না। তার বিভিন্ন কারণ হচ্ছে শিক্ষকদের বেতন- ভাতা, সাইন্সল্যাবের অভাব, বিজ্ঞানের যোগ্য শিক্ষক না থাকা। তারা পাঠ্যবই নিয়েই মেতে থাকে। উচ্চশিক্ষার আকর্ষণীয় দিকগুলো তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয় না।তারা এ বিষয়ে না জানায় উচ্চশিক্ষায় নিজেদের যোগদান নিশ্চিত করতে পারছে না।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে সেখানে একই দশা বিরাজমান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থীরা পূর্বের কিছু বোর্ড প্রশ্ন অনুসরণ করেই অনায়েসে পাশ করে যায়। তাদের কোন ক্লাস বা কর্মসূচিতে যোগদানের প্রয়োজন পড়ে না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক সমস্যা, সেশনজট কতিপয় কারণে হতাশায় ভুগছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা ভিত্তিক পড়াশোনা থেকে সরে গিয়ে চাকুরী ভিত্তিক গাইড-নোট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিষয় ভিত্তিক পড়াশোনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে চাকুরির ক্ষেত্র নেই বলে। তারপর ও চাকুরী ক্ষেত্রে পাচ্ছে না যথাযথ সুযোগ-সুবিধা। অন্যান্য চাকুরির থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারী চাকুরীর প্রবণতা বেশি।ফলে অন্য বেসরকারী চাকুরীতে দিতে পারছে না তাদের দক্ষতা টুকু, পিছিয়ে পড়ছে দেশের কাম্য অগ্রগতি। করোনা কালীন অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের জন্য এক নতুন বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেছে। শিক্ষকরা যথেষ্ট পারদর্শী না হওয়াতেই অনলাইন ক্লাস ফলপ্রসূ হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ও গ্রামাঞ্চলে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ভালো না হওয়াতেই বিপাকে পড়ছে হাজারো শিক্ষার্থী।

এমন ভাবে চললে শিক্ষা ব্যবস্থার ভাঙন রোধ সম্ভব হবে না। অতি সত্ত্বর নিতে হবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সরকার ও উচ্চ মহলের দৃষ্টিই পারে এই শোচনীয় ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে।

প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ এর জন্য নয় মানসিক বিকাশ ও নৈতিকা শিক্ষা দেয়া। খেলাধূলার সুযোগ করে দেওয়া। ক্লাসরুমের সংখ্যা বাড়ানো। খেলার মাঠের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও জায়গা রাখা ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষকদের সম্মানী বৃদ্ধি করলে শিক্ষকরা স্কুল মুখী হবেন। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ভীতি দুর করে হাতে-কলমে শিক্ষা দিতেহবে। পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা কমাতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের সাইন্সল্যাব ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তে আবাসন সংকট দুর করে গবেষণা মুখী পড়াশোনা করাতে হবে। গবেষণায় আর্থিক বরাদ্দ বাড়িয়ে কর্মমুখী কাজে অনুপ্রাণিত করতে হবে। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ও ডাটার জোগান নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য অর্জনে সক্ষম হবে।

লেখক :
শিক্ষার্থী,আরবি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়