শিক্ষাঙ্গনে নুসরাত প্রতিবাদের এক নাম

নিউজ নিউজ

ভিশন ৭১

প্রকাশিত: ১০:৪৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০১৯

-এডভোকেট মোঃ সাইফুদ্দীন খালেদ।

নুসরাত প্রতিবাদের এক নাম; তার লিখা ‘আমি লড়বো, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়বো’। একজন শিক্ষকের যৌন সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করে জীবন দিতে হলো তাকে। পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে আজ শিক্ষার্থী কতটুকু নিরাপদে? মানবাধিকার, অগ্রগতি ও প্রগতির একুশ শতকে ধর্মীয় বাঁধা, সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে নারীরা এগিয়ে আসছে মানুষের ভূমিকায়, আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে। কিন্তু তাদের অগ্রযাত্রায় যৌন নিপীড়ন ও ইভটিজিং বিশাল প্রতিবন্ধকতার ভূমিকা পালন করছে যা নারী শিক্ষা ও তাদের জীবন যাত্রায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নারী নির্যাতনের সংখ্যা দ্রুত হারে যেন বেড়ে যাচ্ছে। আগামীতে সেই নির্যাতনের সংখ্যা কোথায় দিয়ে দাঁড়াতে পারে তা সচেতন মহল একটু ভাববেন বলে আশা করি। সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতায় এসে বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশের নারীরা প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। সাধারনত আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্টে প্রত্যেক নারী পুরুষের স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। আর সেই নারীমুক্তি, নারীর মর্যাদা, নারীর অধিকার, নারী শিক্ষার কথা বলেছে ইসলাম আজ থেকে ১৪৩৯ বছর আগে। কিন্তু বিশ্ববাসী তা শুনতে পেয়েছে কি? শুনলেও কান দেয়ার সময় পায়নি। এমনকি মুসলিম সমাজেও বিষয়টা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেনি। নারী শিক্ষার বিষয়টি আমাদের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অপরিহার্য বিষয় হিসেবে জড়িত। আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই মৌলিক অধিকার সমান ও অভিন্ন। একুশ শতকে পদার্পন করে বর্তমান বিশ্ব যে সমাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পালাবদলে অংশ নিচ্ছে নারী সেখানে এক অপরিহার্য অংশীদার, জীবন যুদ্ধেও অন্যতম শরীক ও সাথী। এককালে মাতৃতান্ত্রিক সামাজে নারীরা ছিল প্রধান্য। তাই প্রাচীন হিন্দু বৌদ্ধ সাহিত্যে শিক্ষিত নারীর দেখা মেলে। কিন্তু পরবর্তী কালে সমাজে পুরুষের প্রধান্য প্রতিষ্টিত হলে নারী হয়ে পড়ে অন্তপুরবাসী। আধুনিক কালে নারীর স্বতন্ত্র মানবিক ভূমিকা স্বীকৃত হয় পাশ্চাত্যে। ভারতে ইংরেজ শাসন শুরু হলে উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার হাওয়া লাগে। যে হাওয়ার নারী আবার শিক্ষার অঙ্গনে আসার সুযোগ পায়। ইউরোপীয় জীবন ব্যবস্থায় নারী পুরুষের সমমর্যাদা হিসেবে অবাধ মুক্ত জীবনছন্দ এদেশের নবজাগ্রত বুদ্ধিজীবী মানসে ডেউ তোলে নারী প্রগতির ভাবপ্রবাহের। এঙ্গেলস তাঁর ‘‘অরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি’ গন্থে বলেছেন, ‘‘নারী মুক্তি তখনই সম্ভব যখন নারীরা সমাজের প্রতিটি কর্মকান্ডে সমগুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে’’। আর নারীকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে, নারীর উন্নয়নের জন্যে, এক কথায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে দরকার সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার অবসান। প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। বর্তমান সভ্য সমাজে শিক্ষা ছাড়া সবই অচল। তাছাড়া কোনো স্বাধীন জাতির পক্ষে নিরক্ষর ও মূর্খ থাকা এবং বিশ্বজগৎ, জীবন ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে অজ্ঞান থাকা জাতীয় মর্যাদার পক্ষে হানিকর। আর সেই শিক্ষা লাভ করতে গিয়ে বাংলাদেশের নারী সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথে বাঁধা দূর হয়নি। যদিওবা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় জীবনে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, গণতান্ত্রিক চেতনার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং সমাজে নারী পুরুষের সমান মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি পায়। শিক্ষা মানুষকে বাঁচতে শেখায়। অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলোকিত মানুষ গড়ার কারখানা আর শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন যৌন নিপীড়নের মত ঘটনা? আসলে সংলাপগুলো একদিক দিয়ে লজ্জাকর অন্যদিক দিয়ে বেদনাদায়ক। পবিত্র শিক্ষাঙ্গন গুলো অপবিত্র করতে যাচ্ছে এক শ্রেণীর নিপীড়ক, কিছু কুচক্রিলোক। যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মহান এ পেশায় কিছু কুলাঙ্গার ঢুকে পড়েছে, যারা রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের খরব পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। দেশবাসী এসব সংবাদ দেখে, যা ছিল তাদের অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাঙ্খিত। একের পর এক বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলছে। নুসরাত এর ঘটনা। নুসরাত এক করুণ শোকের নাম হয়ে থাকবে। মাদ্রাসার সেই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার এই পরিণতি। বর্ণিত এই ধরণের শিক্ষককে কি সত্যিই মানুষ গড়ার কারিগর বলা যায়? আমি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি শিক্ষাঙ্গন হচ্ছে জ্ঞান চর্চার সর্বোৎকৃষ্ট অঙ্গন। এই অঙ্গন গড়ে তোলে জাতির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। পৃথিবীর যে কোন বড় সামাজিক দায়িত্বপালন করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলে অপ্রিয় সত্য যে, এরধরণের কুচক্রিলোকদের কবলে শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাচ্ছে। জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতিফলক এই শিক্ষাঙ্গন যোগ্য নাগরিক উপহার দিতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিবছর কোননা কোন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা গ্রহণে যাওয়া ছাত্রী ধর্ষিতা হয়ে, যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসছে। অথচ এদের কাছ থেকে পরিবার যেমন অনেক কিছু আশা করে তেমনি জাতিও অনেক কিছু আশা করে থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনকে এদের কবল থেকে মুক্ত করে শিক্ষা এবং জাতির মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করা আবশ্যক। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যে কোন আইনে নারীর ওপর অত্যাচারের বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। সিডো সনদের ১ অনুচ্ছেদের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘শরিক রাষ্টগুলো নারীকে সব ধরণের অবৈধ ব্যবসায় এবং দেহ ব্যবসায়ের আকারে নারীর শোষণ দমন করার লক্ষে আইন প্রণয়নসহ সব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’’। দেশীয় আইনেও এমন অনৈতিক ও মানবতাবিরোধী কাজের বিচার করা আবশ্য কর্তব্য। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(২) ও ৩৪(১) অনুযায়ী গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে এবং সব ধরনের জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দন্ডনীয়। এছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে রয়েছে সর্বাচ্চ শাস্তির বিধান। উক্ত আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-েরও বিধান রয়েছে। এখন প্রশ্ন, আমরা, আমাদের সচেতন নাগরিক সমাজ, আমাদের মেয়েদেরকে এই বখাটেপনার শিকারের দিকে টেলে দিয়ে তাদের জীবন যাপনে বাঁধা বা আত্মহত্যার বিষয়ে চুপ করে থাকতে পারি? এ ধরণের অবক্ষয় প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন ও আরো আধুনিকায়ন করে সঠিক ও যথাযথভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ভরসা হলো নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে ১৬ জনকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত। ২৪ অক্টোবর ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ৬১ কার্যদিবসের মধ্যে এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে দেওয়া এই রায়ের মাধ্যমে এ ধরণের অপরাধীরা আতঙ্কিত হবে। ভবিষ্যতে কেউ যেন এ ধরনের কাজ করার সাহস না পায়, সে জন্য এই রায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দেশের বিচার বিভাগের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে এই রায়। অবশেষে বলবো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সময় তার স্বভাব চরিত্র ও বংশ মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ আপনারাও যেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি এই ব্যাপারে অধিক যত্মবান হউন। শিক্ষকদের দ্বারা যাতে আর কোন ছাত্রী নির্যাতিত না হয়। যেন তাদের নিজের কন্যার মতো আচরন করা হয়। কারণ দিবসের একটি বড় সময় ছাত্র-ছাত্রীরা আপনাদের সাহচর্যে থাকে। বাবা-মার কাছ থেকে যা কিছু শিখে তার চেয়ে অনেক বেশী জ্ঞান অর্জন করে একজন শিক্ষকের নিকট থেকে। সুতরাং তাদের সম্পর্ক যাতে হয় পরম পবিত্র। কিছু সংখ্যক শিক্ষকের কারণে যেন নষ্ট না হয় সমগ্র শিক্ষক জাতির সম্মান ও শ্রদ্ধা। এ ব্যাপারে আপনাদেরকে বিশেষভাবে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

লেখক ঃ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট