লকডাউনের সময়কে অর্থবহ করে তুলুন

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৭:২৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০


নিগার সুলতানা সুপ্তি

করোনা ভাইরাসের আকস্মিক প্রকোপের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ হয়ে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সীমিত আকারে চালু রয়েছে অন্য সকল কর্মক্ষেত্র। লকডাউনের দীর্ঘ বন্দী দশায় অনেকে হয়তো ঘরে বসে অনলাইনে ক্লাস করছেন, বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করে নিজের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন, আবার কেউ কেউ হয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নিতান্তই অলস সময় কাটাচ্ছেন, কেউ বা আবার কি করবেন, ভেবে না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। বাসায় কাটানো এই সময়টি চাইলে অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।

আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি ব্যস্ত জীবনযাপন করি। এই মহামারির কারণে এখন আমরা দেশের এক বিরাট অংশ প্রায় গৃহবন্দি। বেঁচে থাকলে এমন দীর্ঘ অবসর আর কোনোদিন মিলবে কিনা আমরা জানি না। তাই আমাদের উচিত এই সময়টাকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগানো। আমরা যেমন পরিবারকে সময় দেবো, বিষণ্ণ পরিস্থিতি কাটানোর জন্য আনন্দ করার চেষ্টা করবো, তেমনই সময়টার সর্বোত্তম ব্যবহার কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সময় অত্যন্ত মূল্যবান। আর সময় ও অর্থের ব্যাপারে একটি মৌলিক সত্য হলো দুটিই আমাদের খুব বেশি প্রয়োজন। এত বেশি প্রয়োজন যে, সে চাহিদা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। প্রায় সবাই আমরা মনে করি আরও অর্থ পাওয়া গেলে ভালো হতো। আরও একটু সময় যদি পাওয়া যেত তাহলে কাজটা সুন্দরভাবে করা যেত। আসলে সময়ের অভাবের কারণে কাজ সুচারুরূপে করা যায় না। পরিবারকে নিয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠা যায় না, নিজেকে নিয়ে যে নিমগ্ন থাকব তাও হয়ে ওঠে না। আমাদের এই প্রজন্মের মাঝেই সময়ের অভাবজনিত হাহাকার সবচেয়ে বেশি। তাই এই সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরী।

ব্যস্ততার হাজারটা প্রহরশেষে মানুষ একটুখানি নিজের মতো করে কিংবা নিজের ভালো লাগাতে ডুবতে চায়। তবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় সে সুযোগ মেলে খুব কমই। ধর্মীয় উৎসব বা বছর শেষের ধরনভেদে কিছু ছুটিতে যেটুকু সময় মেলে হৈ-হুল্লোড়ে কাটানোর, তাতেই সন্তুষ্টির হাসি আপামর বাঙালির। কিন্তু অপ্রত্যাশিত দীর্ঘ ছুটি যে বাঙালীর মনে বিপরীত প্রতিক্রিয়ারও জন্ম দেয়, সেটার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে বোধহয় করোনা ভাইরাস। আমরা যেখানে ব্যস্ততা থেকে বাঁচতে নিত্যনতুন নানান অজুহাতে গা ভাসাই, সেই আমরাই ব্যস্ততায় ফের নাম লেখাতে হাঁসফাঁস করে যাই ক’টা দিন ঘরবন্দি থেকে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাইরে যাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে যাই আবার কেউ কেউ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় কি করব ভেবে হতাশায় বুদ হয়ে থাকি। তবুও সরকারি নির্দেশনা মেনে ঘরে থাকাই শ্রেয়। তবে একেক জনের জীবনধারা একেক রকম। তাই এই অবসর কাটানোর ধরণটাও একেকজনের একেক রকম। কেউ রান্না করতে ভালোবাসে, সে বিভিন্ন নতুন নতুন আইটেম রান্না করছে। তবে হ্যা, আমাদের মাথায় রাখতে হবে মহামারির পর আমরা খাদ্য সংকটে ভুগতে হবে, তাই খাবারের অপচয় করা যাবে না। কেউ কেউ হাতের কাজ খুব ভালো পারেন। যেমন- সেলাইশিল্প, পেইন্টিং শিল্প, ডিজাইনিং ইত্যাদি। এই অবসরে অলস শুয়ে বসে না থেকে আপনারা এসব কাজ করুন। মহামারি শেষ হবার পর দেখবেন আপনার অনেক দারুণ দারুণ কাজ কমপ্লিট হয়ে গেছে। তখন আপনারই ভালো লাগবে। শিল্পীরা ঘরে বসে অনেক ছবি আঁকুন, সময় ভালো কাটবে। যে যেই দিকে পারদর্শী, যা করে আনন্দ পান, তাই করুন। এভাবে ঘরে বসে থাকতে আমরা অভ্যস্ত নই। যদি সময়টাকে কাজে না লাগাই আমরা বোরিং ফিল করবো। তাই সময়টাকে কাজে লাগানো খুব দরকার।

একটু আগেই বলেছি, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ ছুটি খুব কমই পেয়ে থাকে। আর যেটুকু পাওয়া যায়, সেটাতেও পরিবারের সব সদস্য একসাথে হওয়ার সুযোগ থাকে না নানা কারণে। করোনা ভাইরাস সুযোগ করে দিয়েছে পরিবারের সকলকে এক হওয়ার, একসাথে বেশ কিছুদিন কাটানোর। এই সুযোগটা ছেড়ে পরে আফসোস যেন না করতে হয়, তার জন্য সময়টা পরিবারকে দিতে পারেন। সম্পর্কের টানাপোড়েন বা অযাচিত সৃষ্টি হওয়া দূরত্ব ঘোচানোর এমন চমৎকার সুযোগ আর পাবেন না হয়তো। সময় দিন মা-বাবাকে, তাদের সাথে একসাথে টেলিভিশন দেখুন, তাদের ভাবনা জানুন, শুনুন তাদের গল্প। তারা খুব অল্পতেই খুশি হয়ে যান। আপনি তাদের সময় দিচ্ছেন, এটা ভেবে তারা মনে একপ্রকার শান্তি পাবেন। পরিবারের ছোট্ট সদস্যটির প্রতিও নজর দিন, তার নানান বিষয়ের কৌতূহল মেটান, খেলুন তার সাথে। সময়টা আশা করি খারাপ কাটবে না আপনার। যারা পরিবারের বাহিরে থেকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়শুনা করছি তারা এত দীর্ঘসময় পরিবারকে কখনো কাছে পাই নি।তাই পরিবারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্যও পালন করতে পারি। আবার অনেকে দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাজের জন্য বাড়ির বাইরে থাকেন। তাই বাড়ির ছোট থেকে বয়স্ক কাউকেই ঠিক মত সময় দিতে পারেন না। এই হোম কোয়ারেন্টাইনের সময়টাকে কাজে লাগান। কাজের ফাঁকে সময় দিন নিজের পরিবারকে। যেমন দুপুর ও রাতের খাবার খান পরিবারের সঙ্গে।

অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকার কারণে অনেক সময় আমাদের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সেই সময় আমরা ঠিক করতে পারিনা যে আমরা কি করবো। তাই নিজের ফাঁকা সময় ছবি এঁকে বা গল্পের বই পড়ে কাটাতে পারেন। কেউ যদি সিনেমা প্রেমী হন তাহলে এটা খুব ভাল সময়। কারণ কাজের চাপে আমরা যারা সিনেমা দেখতে ভালোবাসি তারা সব সময় তা দেখতে পারি না। তাই কাজের শেষে আপনি আপনার পছন্দের সিনেমা বা দেখা হয়নি সিনেমাগুলি দেখে নিতে পারেন। বিভিন্ন সিরিজ দেখতে পারেন। স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেখা যায় দীর্ঘসময় গৃহবন্দী থাকায় তারা হতাশ হয়ে যাচ্ছেন।কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তারা ইউটিউবে ইংলিশ কনভারশেসন দেখতে পারেন। যেহেতু ইংরেজি শেখাটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইউটিউবে শুদ্ধ বাংলায় কিভাবে সুন্দরভাবে কথা বলা যায়, কিভাবে সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করা যায়, এসব ভিডিও দেখতে পারেন। অল্প অল্প করে লেখালেখির অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। লকডাউন শেষে দেখবেন আপনি অনেক বড় একটা পাণ্ডুলিপি তৈরী করে ফেলেছেন। আবার অনেকে অনেক দিন ধরে ভাবছেন নিজের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলবেন বা তাদের খোঁজ নেবেন! কিন্তু তার জন্য সময় করে উঠতে পারছিলেন না। এই ছুটিতে আপনি আপনার ফাঁকা সময় ভিডিও কলের মাধ্যমে সময় কাটাতে পারেন নিজের বন্ধুদের সঙ্গে। তবে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম ইত্যাদিতে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি হয়ে যাচ্ছে অনেকের। এই আন-প্রোডাকটিভ কাজে অতিরিক্ত সময় দেয়া কমিয়ে ফেলুন। কেননা পরে আফসোস হবে সময়টাকে কাজে লাগানো হয়নি বলে। সর্বোপরি বাসার কাজ, যেগুলো অফিস-স্কুল-কলেজ চলাকালীন সময়ে করা সম্ভব হয় না সেগুলো খুঁজে সময়টাকে কাজে লাগানো। আমরা যারা সারাদিন অফিস স্কুল, কলেজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকি। বাসার অনেক প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারি না সময়ের অভাবে- সেগুলো চিহ্নিত করে এই সুযোগে করে ফেলুন। যেমন ঘর ডেকোরেশন চেঞ্জ, বাসার প্রয়োজনীয় কাগজ ফাইল-আপ ইত্যাদি। এখন বর্তমানে যেহেতু সমস্ত কিছুই বন্ধ তাই নিজের পরিচর্যার জন্য আপনি বাইরে যেতে পারছেন না। তা হলে ঘরে বসেই ঘরোয়া পদ্ধতিতে করুন নিজের ত্বকের পরিচর্যা। যারা জিমনেশিয়ামে গিয়ে ব্যায়াম করতেন তারা এখন বাইরে গিয়ে ব্যায়াম করার বদলে ঘরেই সেরে ফেলতে পারেন। বাসায় অ্যারোবিক ব্যায়াম করা যেতে পারে। যেমন: জোরে হাঁটা, জগিং, দৌড়ানো, দড়ি লাফ ইত্যাদি হলো অ্যারোবিক ব্যায়াম। গবেষকদের মতে, সপ্তাহে ৩০০ মিনিট অ্যারোবিক ব্যায়াম করা যথেষ্ট। সেই হিসেবে, প্রতিদিন ৩০ মিনিট এই ব্যায়াম করা যেতে পারে। অ্যারোবিক ব্যায়ামের ফলে শরীরে এন্ডোরফিন নামে এক ধরনের হরমোন নিঃসরণ হয়, যার ফলে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন কমে যায়। অ্যারোবিক ব্যায়াম ওজন কমাতে ও হৃদপিন্ড সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

বিকশিত হোক আমাদের না দেখা প্রতিভা। আমরা জানি বা না জানি এটা বোধহয় সত্য, আমাদের সবার ভেতরটায় কিছু না কিছু প্রতিভা আছেই। কেউ হয়তো গান গাইতে পারি, সেটা বাথরুমে হোক কিংবা ভরা মজলিসে। কেউবা পারি কবিতা লিখতে, গল্প বলতে। কারো আবার রান্নার হাত ভালো বা কেউ হয়তো পারি ভালো ছবি আঁকতে। ধরনভেদে হাজারও এমন প্রতিভা লুকিয়ে আছে আমাদের মনের গোপন কোণে। সেই প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ নিন এই সময়টাতে। আমি যেমন ফেসবুকে সময় দিচ্ছি। প্রতিদিনের আপডেট রাখছি, বিভিন্ন মানুষের পোস্ট পড়ছি। এসব থেকেও অনেককিছু শেখার আছে। আর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্মজনেরও খোঁজ রাখছি নিয়মিত। একজন লেখক হিসেবে আমি সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখতে পারলেও সুন্দরভাবে আমি কথা বলতে পারি না। এটা আমার অনেক বড় একটা দূর্বলতা। সুন্দরভাবে কথা বলতে না পারলে জীবনের সবক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে হয়। তাই এ দূর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। পরিচিত একজন, যে খুব শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে তার সাথে প্ল্যান করেছি এখন থেকে আমরা নিয়মিত প্র্যাকটিস চালিয়ে যাবো। মোটামোটি এভাবেই আমি আমার সময়টাকে কাজে লাগাচ্ছি। আপনি কিভাবে আপনার সময়টাকে কাজে লাগাবেন, সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার। তবে আমি বলবো, বিভিন্ন গার্লস গ্রুপে শাড়ি চুড়ির ছবি দেখে, ট্রল করে আর ডালগোনা কফি নিয়ে নিজের মূল্যবান সময়টাকে নষ্ট করবেন না। জীবনে বিনোদনের প্রয়োজন আছে, শাড়ি গহনারও প্রয়োজন আছে। তবে খেয়াল রাখবেন, ওসব দিকে সময় দিতে গিয়ে যেনো আপনার গুরুত্বপূর্ন কাজগুলোই অপশনাল না হয়ে যায়। নিজের কাজ ঠিক রেখে তার পাশাপাশি যা খুশি করুন। নিজের ভালোলাগার কাজগুলো করুন, অবশ্যই ঘরের মধ্যে থেকে। আপনার ভালো লাগার প্রশংসা যখন অন্যরা করবে, দেখবেন মনের মাঝে কেমন একটা সুন্দর অনুভূতির জন্ম হয়। যদি নিন্দাও শুনে থাকেন, সেটা থেকে শিক্ষা নিন, চেষ্টা করুন আরেকটু ভালো করার।

———–
নিগার সুলতানা সুপ্তি
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল।
কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক
বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।