মীলাদুন্নবীর এপিঠ ওপিঠ একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা!!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:২৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৯, ২০১৯

মুনিরুল_আলম_মুনির:

[ ميلاد النبي (ص) ]

#মীলাদুন্নবী(স) পরিচিতি:

মীলাদ শব্দের অর্থ হলো জন্ম।আর নবী শব্দের অর্থ নবী,দূত।এখানে নবী বলে মুহাম্মদ(স) কে বুঝানো হয়।সুতরাং মীলাদুন্নবী অর্থ দাঁড়ায় নবী(স) এর জন্ম। তবে বর্তমান দুনিয়াতে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে মীলাদুন্নবী বলতেই চোখে ভেসে উঠে নবীপ্রেমের নামে আয়োজিত বিশাল বিশাল অনুষ্ঠান,জুলূস,শামিয়ানা ও শোডাউন ইত্যাদি।যেখানে নবী(স) এর জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে অনেক আলোচনা করা হয়ে থাকে।তবে এতে নবী(স) এর জন্মের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক জাল হাদীস,বানোয়াট,কিচ্ছা-কাহিনীও কম বর্ণনা করা হয়না।

#জন্মতারিখ_লিখন:

যাহোক,কোন শিশু জন্ম গ্রহন করার পর তার জন্মের দিনসন লিখে রাখতে পারলে পরবর্তীতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের সময় কাজে লাগে।আর এখনকার মানুষ তো এ ব্যাপারে আরও বেশি কেয়ারফুল।তাই সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার সময় মা-বাবা কিংবা পরিবারের সদস্যরা তাদের নতুন অতিথির জন্মের দিনসন খুব যত্নের সাথে লিখে রাখেন।এটা খুবই ভাল একটি প্রবণতা।

#নবী(স) এর জন্মতারিখ কোনটি?

কিন্তু আমাদের প্রিয়নবী(স) যখন জন্মেছিলেন তখনতো তার পরিবারের কেউ এমন উদ্যোগ গ্রহন করেননি।হয়তো তারা লিখতে জানতেন না।সুতরাং রাসূল(স) এর জন্মের সঠিক তারিখ সংরক্ষিত নেই।তবে বর্তমান যুগের সীরাত জগতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সীরাতগ্রন্থ “আর রহীকুল মাখতূম” এ বলা হয়েছে যে, নবী(স) ৯ রবিউল আউয়াল সোমবার মোতাবেক ২ বা ২২ এপ্রিল ৫৭১ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহন করেছেন।অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে এটিই সঠিক ও প্রবল মত।তবে আমাদের দেশে রাসূল(স) এর জন্মসনটা ১২ রবিউল আউয়াল হিসেবেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

#সাংখ্যিক তারিখ নয় ‘দিন’ এর হিসাবটা বেশি সহীহ:

৯ কিংবা ১২ রবিউল আউয়াল তারিখটি ফ্যাক্ট নয়।বরং নবী(স) এর জন্মের ক্ষেত্রে ‘দিনটি’ই বড় ফ্যাক্ট।বিবেচ্য বিষয়।সহীহান,সুনানে আরবা’আসহ(কুতুবে সিত্তাহ) অসংখ্য হাদীসগ্রন্থে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে,নবী(স) সোমবারে জন্ম গ্রহন করেছেন, সোমবারে তাকে নুবুয়্যাত দেয়া হয়েছে এবং এই সোমবারেই তার ওফাত হয়।হাদীসে এসেছে:
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ صَوْمَ يَوْمِ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمِ الْخَمِيسِ قَالَ ‏ “‏ فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ الْقُرْآنُ ‏”‏ ‏.‏

আবূ ক্বাতাদাহ(রা) হতে বর্ণিত।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সোমবার ও বৃহস্পতিবার সওম পালনের ব্যাপারে আপনার কি অভিমত? তিনি বললেনঃ ঐ দিন আমি জন্মগ্রহন করেছি এবং ঐ দিনই আমার উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।(সুনানে আবু দাউদ-২৪২৬,সহীহ)

সহীহ বুখারীর ৬৮০ নং হাদীসে এসেছে যে,তিনি(স) সোমবারে ইন্তেকাল করেছেন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে,রাসূল(স) এর জন্মের সাথে সাংখ্যিক তারিখের চেয়ে দিনটি বিবেচনা করাই বেশি সহীহ ও গ্রহনযোগ্য।যেহেতু এ ব্যাপারে সরাসরি রাসূল(স) এর কথা আছে।

#রাসূল(স) কি তার Birthday উদযাপন করেছেন?

হ্যাঁ,নবী(স) তার বার্থ ডে উদযাপন করেছেন।অসংখ্য হাদীসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।কুতুবে সিত্তাসহ অনেক হাদীসে এর প্রমাণ রয়েছে।

#রাসূল(স) এর বার্থ ডে উদযাপনের ধরন কেমন ছিল?

এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিষয়।আর বর্তমান সময়ে এ বিষয়ে খুবই বাড়াবাড়ি,সীমালঙ্ঘন ও অতিরন্জন করা হচ্ছে।নবী(স) তার বার্থ ডে উদযাপন করেছেন ‘সাওম তথা রোজা’ পালনের মাধ্যমে।সপ্তাহে সোমবার, বৃহস্পতিবার তিনি রোজা রাখার চেষ্টা করতেন।তাকে এ রোজার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাবে বলেন:‏
فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ الْقُرْآنُ ‏”‏ ‏.‏
অর্থ: এ দিন(সোমবার) আমি জন্মগ্রহন করেছি এবং এ দিনেই আমাকে নুবুয়্যাত দেয়া হয়েছে।(সুনানে আবু দাউদ-২৪২৬,সহীহ)

সুতরাং জানা গেল যে, প্রিয় নবী(স)ও তার জন্মদিন উদযাপন করেছেন।তবে তা বর্তমানের নোংরামিপূর্ণ বার্থ ডে কেক কেটে,নারীপুরুষ একসাথে ডলাডলি করে মিছিল-সমাবেশ,শোডাউন কিংবা নাচ-গান-বাজনার জুলূস করে নয়।বরং সেদিন রোজা রেখে- গরীব-দুঃখীর উপবাস যন্ত্রণা বুঝার চেষ্টা করার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টার মাধ্যমে।

#মীলাদুন্নবী(স) পালন করা কি বিদআত?

কোন মানুষ যদি তার জন্মদিন স্মরণ করে তাতে দোয়া করে,অতীত জীবনের পর্যালোচনা ও ভবিষ্যত জীবন সুন্দর ও সফল করার পরিকল্পনা গ্রহন করে কোনক্রমেই তা অন্যায় কিছু নয়।বরং তা খুব সুন্দর উদ্যোগ।তবে শর্ত হলো এর সবকিছুই একান্ত পার্সোনাল পরিকল্পনা হতে হবে।এসবের জন্য কোন অনুষ্ঠানের প্রয়োজন পড়েনা।যা রাসূ্ল(স)ও করতেন।সুতরাং এটি কোনক্রমেই বিদআত হতে পারেনা।

কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো বর্তমানে অনেক আশেকে রাসূল(স) দাবিদার মীলাদুন্নবীর নামে যে বিশাল মিছিল-মিটিং,এক রবিউল আউয়াল থেকে পরবর্তী রবিউল আউয়াল পর্যন্ত যেন মীলাদ চলতেই থাকে,আর যারা এসব করেনা তাদেরকে বিভিন্ন উপাধিতে অভিহিত করা,নিজেদেরকে রাসূল(স) এর একমাত্র খাঁটি আশেক মনে করা, শোডাউন,নারীপুরুষ একসাথে জুলূস করা,হালওয়া,বিরানির আয়োজন,কোটি কোটি টাকার লেনদেন করে নবীর এশকের স্লোগান দিয়ে জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে নিজেদের পকেট ভর্তি নিচ্ছে – তাতো নিঃসন্দেহে বিদআত।

এমন পরিস্থিতি রাসূল(স) এর যুগে ছিলনা,সাহাবীদের যুগে ছিলনা, তাবেয়ীদের যুগে ছিলনা।এমনকি কোন সাহাবী,তাবেয়ী রাসূল(স) এর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষেও রোজা রেখেছেন বলে আমার জানা নেই।কেক,জুলূস তো দূরের কথা!রাসূল(স) এর ওফাতের অন্তত ৬০০ বছর পর মীলাদুন্নবীর বর্তমান চেহারা আবিষ্কার হয়।এর আগে এটার এমন চেহারা কেউ দেখেনি।বরং তারা রোজা রাখার কথাই জানতেন।

#মীলাদুন্নবী ও সীরাতুন্নবী কি?

মীলাদুন্নবী হলো নবী(স) এর জন্মবৃত্তান্ত। অর্থাৎ রাসূল(স) এর জন্মের পূর্বের কারামতপূর্ণ অবস্থা,জন্মকালীন অবস্থা ও ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে নুবুয়্যাত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত জীবন এতে অন্তর্ভূক্ত।
আর সীরাতুন্নবী হলো নবী(স) নুবুয়্যাত প্রাপ্তির পর থেকে ওফাত পর্যন্ত জীবন।

#তাহলে আমরা কোনটি পালন করবো?

সরল কথা হলো মীলাদ ও সীরাত উভয় অধ্যায়ই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে মীলাদের পর্বটা শরীয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।কিন্তু মীলাদের পর্বে যেসব কারামত সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে আমরা তা অবশ্যই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবো এবং মেনে চলব।মীলাদুন্নবী যদি উদযাপন করতে চাই তা সোমবারে রোজা পালন ও দোয়া-দরূদের মাধ্যমেই করবো।কিন্তু করতেই হবে এমনটা নয়।এছাড়া অন্যকিছু নয়।এবং তা হবে একান্ত ব্যক্তিগত।সম্মিলিত নয়।

কারন,রাসূল(স) নিজের জন্মদিনে নিজে রোজা রেখেছেন।অন্য কাউকে রাখতেও বলেননি।নিজে জানানও নি।কিন্তু মীলাদের নামে অতিরন্জন,সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করবোনা।কোন নোংরামিকে প্রশ্রয় দেবনা।নবীপ্রেমের মীলাদি মুখোশে জুলূস করে বিরানির আয়োজন করে নিজেদের পকেট ভর্তি করবোনা।এগুলো সুস্পষ্ট বিদআত, যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।জাহান্নামের কারণ।

আর সীরাতুন্নবীর প্রতিটি অধ্যায়ই মুমিন জীবনের জন্য অনুসরণীয় এবং তা অবশ্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ পাক বলেন:
আল-আহযাব 33:21
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِىْ رَسُوْلِ اللّٰهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللّٰهَ وَالْيَوْمَ الْاٰخِرَ وَذَكَرَ اللّٰهَ كَثِيْرًاؕ –
অর্থ: তোমাদের জন্য রাসূলের জীবনাদর্শের(সীরাত) মধ্যে সর্বোত্তম জীবনাদর্শ রয়েছে।

রাসূল(স) এর জীবনাদর্শের অনুসরণ তার সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব।তার সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করতে হবে ব্যক্তিগত,পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে।তাই রাসূল(স)কে ভালবাসতে হবে নিজের সন্তানাদি,মা-বাবা ও পৃথিবীর সমস্ত মানুষের চেয়েও বেশি পরিমাণে।অন্যথায় পূর্ণ মুমিন হওয়া অসম্ভব।তবে এ ভালাবাসা হতে হবে নবী(স) পছন্দ করেন এমন পন্থায়।বিদআতী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নয়।আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক পন্থায় রাসূল(স) কে ভালবাসার তাওফীক দিন।আমীন!!
—————
লেখক:
মুনিরুল আলম মুনির।
শিক্ষার্থী- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।