মার্কিন আইটি খাতে বাংলাদেশি প্রতিনিধিত্ব

নিউজ নিউজ

ভিশন

প্রকাশিত: ৬:১৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০১৯

এম.এ ওয়াহিদ :

আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) প্রকল্পে একজন তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। শুধু নিজে কাজ করেই ক্ষান্ত হননি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশের ৩০-৪০ জন আইটি বিশেষজ্ঞদের কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন সহকারী হিসেবে নিযুক্ত করে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠান কেপিজিমিনির সঙ্গে কাজ করেছেন যেমন, তেমনি কাজ করছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন বহুমাত্রিকভাবে। তিনি শেখ গালিব রহমান। একজন গর্বিত বাংলাদেশি, যার জীবনের লক্ষ্যই দেশের জন্য কিছু করা।

নিজের মেধা দিয়ে দেশ ও দশের উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান শেখ গালিব রহমান। ডিএইচএসের সাবেক এ কর্মকর্তা ও আইটি উদ্যোক্তা কাজ করেছেন বিখ্যাত আইটি প্রতিষ্ঠান কেপজিমিনির সঙ্গে। এই সূত্রেই তিনি কাজ করেন মার্কিন ফেডারেল সরকারের প্রকল্পে। সে অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেকটাই এগিয়ে দেয়। শুধু নিজে কাজ করেই সন্তুষ্ট হননি তিনি। আমেরিকার সরকারি প্রকল্পে নিজের টিম মেম্বার হিসেবে ৩৫ থেকে ৪০ জন বাংলাদেশিকে নিয়োগ দিয়ে দেশের প্রতি মমত্ব দেখিয়েছেন গালিব।

২০০৬ সালে গালিব রহমান উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে আসেন আমেরিকায়। এখানে এসে কম্পিউটার সায়েন্সে সিটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৭ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রোগ্রাম উদ্যোক্তা হিসেবে ডিপ্লোমা করেন। বরিশাল শহরে বেড়ে ওঠা জনতা ব্যাংক কর্মকর্তা এস এম সিদ্দিকুর রহমানের বড় ছেলে গালিব। শিক্ষক মা মাহিনুর ইয়াসমিনের উৎসাহে আইটি ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের পথে হাঁটেন তিনি। আমেরিকার ওহাইওতে থাকাকালে অধ্যয়নের পাশাপাশি কিউ এনালিস্ট হিসেবে আইবিএমে প্রথম চাকরি শুরু করেন। এরপর আইটি কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি নেন চেজ ব্যাংক, ক্যাপিটাল ওয়ান ও ডিজনি ওয়ার্ল্ডে।

সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে গালিব রহমান প্রথম আলো উত্তর আমেরিকাকে বলেন, ‘আমি যখন চেজ ব্যাংকে আইটি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছি, তখন খ্যাতিমান আইটি উদ্যোক্তা কেপজিমিনি থেকে আমার কাছে একটি ই-মেইল আসে ডিএইচএসের অধীনস্থ ইমিগ্রেশন সার্ভিসের (ইউএন্ডডিএনটুএন্ড) প্রকল্পে কাজ করার জন্য। তখন আমি তাদের ডাকে সাড়া দিই। কাজটি কীভাবে করতে হবে, তার একটি নমুনা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তাদের কাছে আমি ও আমার টিম উপস্থাপন করি। ১০৪টি কোম্পানি এ কাজ পাওয়ার জন্য প্রকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। অবশেষে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কাজটি কেপজিমিনিকে দেয়। কেপজিমিনি কাজটি সম্পন্ন করার জন্য প্রকল্প ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত করে। আমরা সফলভাবে কাজটি সম্পন্ন করি। কাজ করতে গিয়ে ফেডারেল সরকারের কাজের ধরন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করি।’

এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে অনেকটা এগিয়ে দেয়। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিজিটাল সার্ভিস (ইউএসডিএস) প্রকল্পে আইটি কনসালটিং ডাইরেক্টর হিসেবে যোগ দেন গালিব। ওয়াশিংটন ডিসিতে রিজার্ভ ব্যাংক অব রিচমন্ডে আইটি কনসালটিং ডাইরেক্টর হিসেবে কাজ করেন।
গালিব রহমান বলেন, ‘পৃথিবীতে খ্যাতিমান ১০টি আইটি উদ্যোক্তা কোম্পানি রয়েছে। এ সব প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের আইটির কাজ করে। সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর ৩ দশমিক ৭০ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় আইটি খাতে। এর ৬২ শতাংশই হয় আমেরিকায়। বাকিটা বাকি বিশ্ব করে।’

আইটি খাতে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে গালিব রহমান বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আইটি খাত থেকে আয় করে বছরে ১৭৪ বিলিয়ন ডলার। ভারত ১৯৯৫ সালে আইটি ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু করেছিল। মাত্র ২০ বছরে তারা এতখানি এগিয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে এখনো অনেকটা পিছিয়ে। আমরা যদি খ্যাতিমান আইটি উদ্যোক্তাদের আমাদের দেশে আমন্ত্রণ জানাতে পারি, তাহলে আমাদের দেশের দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইটি বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগতে পারব। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন আইটি বিশেষজ্ঞ তৈরি করা যাবে। এই কাজটি কেউ করছে না। পৃথিবীজুড়ে খ্যাতিমান আইটি কোম্পানিগুলোর কয়েক মিলিয়ন সহায়তাকারী রয়েছে। তার মধ্যে ভারতে রয়েছে কয়েক লাখ। আমাদের দেশেও তা সম্ভব। এসব আইটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অফিস করলে বাংলাদেশের কয়েক লাখ আইটি খাতের লোক চাকরি পাবেন। আইটি খাতে বিনিয়োগ ও খ্যাতিমান আইটি পরামর্শক কোম্পানি এক্সেন্টার কর্তৃক বিনিময় কর্মসূচি চালু করতে পারলে বাংলাদেশের কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে।’

ছয় বছর আগে গালিব রহমান ট্রান্সফোটেক নামে একটি আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলেন। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে ছয়টি বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আইটি প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুবিধার কথা উল্লেখ করেন তিনি, যাতে করে শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী আইটি বিশেষজ্ঞ হতে পারে। দেশের একাধিক আইসিটি কর্মকর্তার সঙ্গে এরই মধ্যে বৈঠক করেছেন তিনি। ২০ অক্টোবর এমনই আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। মূল লক্ষ্য দেশের আইটি খাতে নিজের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো। বর্তমানে গালিব রহমান আইটি এক্সচেঞ্জার টপ লিডারদের সঙ্গে কাজ করছেন। ভারতের ব্যাঙ্গালোরে তাঁর অধীনে তিন শতাধিক তথ্যপ্রযুক্তির লোক কাজ করছেন।

এ ছাড়া লিড মাই ওয়ার্ল্ডের (এলএমডব্লিও) মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা সহায়তা নিয়ে কাজ করছেন গালিব রহমান। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইতিমধ্যে সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। জর্জিয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি ভেলডুস্টার, চীনের সিসিওয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলোজিসহ (এসআইআইটি) বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এ বিনিময় কর্মসূচি বিদ্যমান। বাংলাদেশ থেকে জর্জিয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি ভেলডুস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ শিক্ষার্থী নেওয়ার অনুমোদন পেয়েছেন বলেও জানালেন তিনি। এসআইআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে সম্প্রতি বাংলাদেশে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে একটি ক্যাম্পাস ও যৌথ উচ্চশিক্ষা কর্মসূচি চালুর চেষ্টা করছেন তিনি। এ চেষ্টা সফল হলে বাংলাদেশের তরুণদের সামনে নিঃসন্দেহে খুলে যাবে সম্ভাবনার দুয়ার। স্বপ্নবান তরুণ গালিবের লক্ষ্যও তা-ই। ‘দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারা এবং মানুষের উপকার করতে পারাটাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ’ বলে মনে করেন স্বপ্নচারী গালিব রহমান।