ঢাকা১৮ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মানসিক চাপ থেকে মুক্তির উপায়- আশ্ফা খানম (হেলেন)

প্রতিবেদক
নিউজ ভিশন

মার্চ ২, ২০২১ ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ হচ্ছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের নিত্যসঙ্গী। অন্য কথায় এটিকে জীবনের (চধৎঃ ্ চধৎপবষ) অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলা যায়। অথচ শারিরীক সুস্থতার জন্য মানসিক সুস্থতা জরুরী। পূর্বে মানসিক সুস্থতা নিয়ে মানুষ এত সচেতন ছিলনা। কিন্তু বর্তমানে মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন। ইসলাম এ প্রসঙ্গে কি বলে? এ ব্যাপারে জানার সাথে সাথে আমরা প্রাথমিকভাবে স্ট্রেস কি বুঝার চেষ্টা করবো। বিজ্ঞানের ভাষায় এর Definition হচ্ছে It is a form that occurs because of how events in ones external or internal environment are perceived, resulting in the physiological experience of distress and anxiety এটি একটি এলার্ম সিস্টেমের মতো। যখনই আমরা কোনরকম স্ট্রেসে থাকি তখন শরীরে এলার্ম সিস্টেম অন হবার কারণে আমাদের মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং শরীর তখন অপ্রত্যাশিত আচরণ করা শুরু করে। আবার মানসিক চাপ বা স্ট্রেস বাড়া শুরু করলে শরীর আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। আমাদের বর্তমান জীবন এতো বেশী স্ট্রেসপূর্ণ যে এ এলার্ম যেন বন্ধই হয় না। আমরা যদি জিজ্ঞেস করি স্ট্রেস ছাড়া এমন কাউকে আপনি চেনেন ? উত্তর না হবারই সম্ভাবনা বেশী। নিজেকে স্ট্রেস মুক্ত রাখতে হলে প্রথমেই আমাদেরকে এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে অতপর কি কি বিষয় আমাদের স্ট্রেস লেভেলকে বাড়িয়ে দেয় তা অনুসন্ধান করে বের করতে হবে। যেমন: পরিবারের ছোটকাজের স্ট্রেসের কথাই ধরি। কিছুক্ষণ পর পর খাবার টেবিলে এক একজন পরিবারের সদস্যরা খেতে আসলে তা পরিবারের গৃহকর্ত্রীর কাজের এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। কিছুক্ষণ পর পর তাকে নিশ্চিত করতে হয় সবাই সবকিছু ঠিকমতো খেতে পেয়েছে কিনা। এ ক্ষেত্রে এটি গৃহকর্ত্রীর জন্য খুবই অসহ্য এক মানসিকচাপ। কিন্তু পরিবারের সবাই যদি একসাথে খেতে বসার সিদ্ধান্ত নেয় এবং একসাথে খায় তাহলে এতে গৃহকর্ত্রীর অহেতুক প্রত্যহ মানসিকচাপ কমে যাবে। অতএব স্ট্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সর্বপ্রথম এর কারণ গুলো জানতে হবে। আরো বড় ক্ষেত্রে বললে আমরা চাকুরীর ক্ষেত্রে স্ট্রেস, দাম্পত্য সমস্যা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমস্যা, সন্তান লালন-পালনের চাপ প্রভৃতি বলা যায়। দৈনন্দিন জীবনে প্রতিটি মানুষই এরূপ বিভিন্ন কাজের চাপের শিকার। আবার কখনো কখনো ভালো কাজ আমাদের মধ্যে মানসিকচাপ সৃষ্টি করে। যেমন: নতুন বাড়িতে উঠা, নতুন কাজে যোগদান , নতুন সংসার শুরু করা, প্রথম মা-বাবা হবার অভিজ্ঞতা প্রভৃতি। অতএব দেখা যাচ্ছে যে ভালো বা মন্দ যাই ঘটুক না কেন আমাদের জীবনে সবই মানসিকচাপের সৃষ্টি করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি এই বাস্তবতা বা সত্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো এবং মানসিকচাপ মুক্ত জীবন যাপন করতে পারবো। কিছু বাস্তবতা আছে যা নিয়ে আমাদের জীবন ধারণ করতে হয়। যেমন : প্রতিবন্ধী শিশু পালন, কিংবা নিজের কোন শারিরীক দুর্বলতা বা অক্ষমতা অথবা প্রিয়জনের মৃত্যু প্রভৃতি। আবার আধুনিক যুগে মানুষ যে সকল মানসিকচাপের শিকার হচ্ছে পূর্বে কোন যুগেই মানুষ সেগুলোর মুখোমুখি হয়নি।কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইন্টারনেট এখন বিশে^র যে কোন প্রান্তের সু সংবাদ বা দুঃসংবাদ, বিভিন্ন প্রকার মানুষের দুঃখ-দূর্দশা, কষ্টের চিত্র আমাদেরকে প্রতিমূহুর্তে বিচলিত করে মানসিকচাপ সৃিষ্ট করে। এছাড়া অন্যের হাসিমাখা চেহারার ছবি প্রতিনিয়ত এই অনুভূতি সৃষ্টিকরে যে, ’ইস! আমি কত দুঃখী’। অথচ আমরা বুঝিনা যে, যারা হাসিমাখা ছবি দিয়েছে তাদেরও অনেক মানসিক যন্ত্রণা আছে কিন্তু তারা সেটি শেয়ার না করে আনন্দের স্মৃতি শেয়ার করেছে। নবম শতাব্দির পার্সিয়ান প্রসিদ্ধ মুসলিম পলিম্যাথ, জিওগ্রাফার, ম্যাথমেসিয়ান , ফিজিসিয়ান, সাইকলোজিস্ট এবং বিজ্ঞানী আবুজায়েদ আল বালখী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মাসালা আব্দুল আল আনফুসে শরীর ও আত্মা সম্পের্কে বলেছেন যাকে আমরা বর্তমানে নাম দিয়েছি মন দেহের ঔষধ। যদিও ঊনবিংশ শতাব্দিতে obsessive compulsive disorder সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়। এই বিষয়কে নতুন বলা হলেও বালখী স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে অনেক আগেই আলোচনা করেন।শুধু তাই নয় তিনি এর শ্রেণিভেদ করেন এবং এর প্রতিকার ও দেন। তিনি বলেন মানব আত্মা মানব শরীরের মতোই সুস্থ বা অসুস্থ হতে পারে। আমরা যেমন শারিরীক অসুস্থতার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হই ঠিক তেমনই মানব আত্মার অসুখ হলে তা সুস্থ করা জরূরী। আত্মার সুস্থতার জন্য আমাদের ইমোশন বা অনুভূতি গুলোর (tune up ) টিউনআপ করা জরুরী। মানব আত্মা দুই ধরণের চাপের সম্মুখীন হয়। বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ চাপ। তিনি বলেন অনবরত যে কোন বিষয়ে নেগেটিভ চিন্তা আমাদেরকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ করে তোলে। এটি অভ্যন্তরীণ মানসিক চাপ। বর্তমানে একে CBT (cognitive behaviour therapist) বলে। আর বাহ্যিক মানসিক চাপ হচ্ছে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অপ্রাত্যাশিত ঘটনা যা আমাদের চিন্তিত করে অথবা কারো কাছ থেকে শোনা কোন খারাপ ঘটনা বা নেগেটিভ বা অপছন্দনীয় কথা। তিনি বলেন স্ট্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রথমে নিজেকে একটি স্থিতি অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মনে রাখতে হবে বিপদ আমার দুয়ারে যে কোন সময় কড়া নাড়বে। কারণ স্থিতি বা প্রশান্ত অবস্থায় নিজেকে বুঝানো সহজ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে কেন আমরা সব সময় নতুন মানসিকচাপ বা বিপদের কথা স্মরণ করবো? কারণ আমাদের এই বিশ^াসের ধারায় এ সত্যই প্রতিভাত হবে যে এই জীবন একটি মানসিক চাপের স্থান। জীবন অনেক কঠিন। এটি পরীক্ষা ক্ষেত্র।আর প্রতিটি পরীক্ষাই আমাদের মানসিকচাপ বাড়ায়। অতএব সব প্রকার মানসিক চাপই আমাদের জন্য পরীক্ষা। আমাদের জীবন সমস্যায় জর্জরিত যেমন: বৈবাহিক সমস্যা, চাকুরী হারানো, সন্তানদের মনের মত মানুষ করতে না পারা, আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে বিভিন্নবিষয় মনঃপুত না হওয়া প্রভৃতি। সকলের মানসিকচাপ সহ্য করার ক্ষমতা একই নয়। সবাই সব পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে পারে না। ভালো বা মন্দ যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য তিনি নিজেকে trained up করার জন্য গুরুত্ব দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি দু’টি পদ্ধতির শিক্ষা দেন। প্রথমত: জীবনে যখনই কোন মন্দ কিছু ঘটে বা এর জন্য মানসিক চাপ হয় তখন ভালো স্মৃতির কথা স্মরণ করে তা দুর করা। কিংবা কারো মন্দ কথায় আহত হলে সে সময় তার সাথে জড়িত ভালো স্মৃতিগুলো স্মরণ করা। এভাবে মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করলে মানসিক চাপ অনেকাংশে কমে যায়। যেমন: কোন কারণে নিকট কেউ মন্দ ব্যবহার করলে অতীতে তার কোন উপকার বা ভালো স্মৃতি স্মরণ করলে তার প্রতি রাগ অনেকাংশে কমে যায়। পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন ফাহেশা বা মন্দ কথা বলা লোকদের কে সালাম জানিয়ে সে স্থান পরিত্যাগ করো। শুধু তাই নয় আল্লাহ তায়ালা বলেন তাঁর মুমিন বান্দারা মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করেন। আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোর কারণে মানসিক চাপকে যখন আমরা এভাবে প্রতিহত করতে শিখবো তখন বড় কোন বিপদে মানসিক চাপ নেবার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। ফলে যে কোন পরিস্থিতিকে আমরা মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো। আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে বেশি বেশি মানুষের সাথে interaction করা। আমরা জানি প্রত্যেক মানুষই স্বতন্ত্র। তাদের স্বভাব চরিত্রও স্বতন্ত্র। কাজেই আমরা যত বেশি মানুষের সাথে মিশবো তত বিভিন্ন প্রকার স্বভাবের মানুষকে সহ্য করার গুণ অর্জন করবো। আর যত বেশি সহ্য করবো ততই রাগান্বিত হবার পরিস্থিতি বা উদ্বিগ্নতা বা স্ট্রেসফুল মানসিক অনুভূতি গুলোকে নিয়ন্ত্রন করতে সমর্থ হবো। তিনি ছোট বড় যে কোন পরিস্থিতিতে over react না করার পরামর্শ দেন। বিপদ বা সমস্যা জীবনে আসবেই। ছোটখাট বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হওয়া প্রাত্যহিক ব্যাপার। অতএব আমাদের আত্মাকে বা হৃদয়কে trained up করতে হবে এবং নিত্যদিনের সমস্যা গুলো সুন্দরভাবে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যেমন : প্রতিদিন স্কুলের অফিসে প্রবেশ করে ধুলামাখা চেয়ার, আসবাবপত্র দেখে মেজাজ খারাপ হয়। ফলে স্কুলের আয়ার সাথে রাগারাগি হয়। কারণ সে তার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না। কিন্তু প্রতিদিন সকালে এই মানসিকচাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য যদি নিজেই একটি ন্যাকরা এনে নিজেই নিজের জিনিস মুছি তাহলে এ মানসিকচাপ থেকে অনায়াসে মুক্তি পাওয়া যাবে, একে বলে পূর্ব প্রস্তুতি। তাহলে এখানে আমরা দেখতে পাই আমাদের কিছু বাড়তি শ্রমের বিনিময়ে সকালের মানসিকচাপ থেকে আমরা নিজেদের পরিত্রান দিতে পারি। তিনি আরো বলেন প্রত্যেক মানুষের সমস্যাগুলো ভিন্ন ভিন্ন। কেউ তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কেউ তা পারেনা। এ কারণে ব্যক্তির নিজেকে জানতে হবে ‘know thyself’ কারণ একজন ব্যক্তি নিজের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিজে জানলে তা’ কিভাবে বিপদের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তা সে নিজেই বের করতে পারবে।আসলে নিজের সমস্যার সমাধানের পথ নিজেকেই বের করতে হবে।নিজেকে নিজেরই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেমন: আমাদের কোন বিষয় বা কারণে বেশি রাগ হলে আমরা যদি সাথে সাথে ঘটনাস্থল পরিত্যাগ করি তাহলে তদমূহর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। বালখীর উপরোক্ত বিভিন্ন গবেষণালব্ধ তত্ত্বগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই তিনি কুরআন হাদীসের আলোকে সমস্যা গুলোর উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন।আমরা যদি পবিত্র কুরআনের দিকে ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বিপদে ধৈর্য ধারণ করা বা সবর করার কথা বলেছেন। শুধু তাই নয় তিনি স্বয়ং রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবদ্দশায় তাঁর হতাশা ও চরম বিপদের সময় তাঁকে সান্ত্বনার ও আশার বাণী দিয়ে ওহী নাযিল করেছেন। যা বিপদের সময় আমাদের সবার চলার পথের পাথেয়। যখন মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর পুত্র ইবরাহিমের শোকে কাতর তখন যুলুমবাজ নির্দয় কাফিররা তারঁ প্রতি সমবেদনা জানানো তো দূরে থাক তাঁকে লেজকাটা, উত্তরাধিকার শূন্য বলে উপহাস করেন। এমনই সময় আল্লাহ সুবহানুহু তায়ালা সূরা কাউছার নাযিল করে তাঁকে জান্নাতে কাউছারের মালিকানার ঘোষণা দিয়ে সম্মানিত করেন। আবার যখন মক্কাজীবনের শুরুতে সূরা আলাকের প্রথম ৮ টি আয়াত নাযিল হবার পর ওহী আসা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে তখন তিনি হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। আর তখনই আল্লাহ তায়ালা সূরা দে¦াহা, সূরা আলাম নাশরাহর মতো সূরা গুলোর আয়াত নাযিল করেন। সূরা দে¦াহায় আল্লাহ তায়ালা দিনের পরে রাতের অন্ধকারের কথা বলেন। এবং তিনি যে নবীর প্রতি অসন্তুষ্ট নন তা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন এবং আল্লাহ মুহাম্মদ (সাঃ) কে পরবর্তীতে সন্তুষ্ট হয়ে অনেক ভালো কিছু দেবার প্রতিশ্রুতি ও দেন। এমন হতাশার সময় আল্লাহ নবীর শৈশবের এতিম অবস্থা থেকে কিভাবে তাঁকে আশ্রয় দেন , দিশাহীন অবস্থা থেকে সঠিকপথ দেখান, নিঃস্ব অবস্থা থেকে অভাবমুক্ত করেন তা স্মরণ করিয়ে দেন। এভাবে মুহাম্মদ (সাঃ) এর হতাশা ও দুঃসময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর সুসময়েও আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে তাঁকে সান্তনা দেন। সেই সাথে মানবজাতিকে হতাশার সময় জীবনের সুসময় বা আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করে হতাশা দূর করার কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন। বালখী তাঁর গবেষণায় এ কৌশলই শিক্ষা দেন। সূরা আল ইনশিরাহ বা আলাম নাশরাহতেও রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর হৃদয়ের দুঃখ-বেদনার বোঝা সরিয়ে দেবার কথা বলেন যা মুহাম্মদের (সাঃ) কোমর ভেঙ্গে দিচ্ছিল। তাঁর কষ্টের সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানিয়ে দেন যত কষ্ট তত স্বস্তি। তিনি জানান কষ্টের সাথেই আল্লাহ স্বস্তি দেন বা বিপদ মুক্ত করেন। শুধু তাই নয় এই কষ্টের মূহূর্তে কিভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হবে তাও আল্লাহ শেষ দুই আয়াতে শিখিয়ে দেন। তাই তিনি মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাথে গোটা মানব জাতিকে এই শিক্ষা দেন যে কষ্টের সময় যখনই অবসর হবে আমরা যেন আমাদের রবের ইবাদতে একাগ্রচিত্তে লেগে থাকি এবং কঠোর পরিশ্রম করি। এছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন সূরার আয়াতে আমরা দেখতে পাই আল্লাহ বলে দিয়েছেন তিনি আমাদেরকে ভয়, ক্ষুধার কষ্ট, সম্পদের ক্ষতি, সন্তান, সম্পদ প্রভৃতি দিয়ে পরীক্ষা করবেন। আমরা ঈমান এনেছি শুধু মুখে বললেই আমাদের ছেড়ে দেয়া হবেনা। প্রত্যেককে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। এ পরীক্ষা গুলোতে আমরা ধৈর্য ও সবরের মাধ্যমে কিভাবে উত্তীর্ণ হবো সে পন্থাগুলোও আল্লাহ পৃথিবীতে নবী রাসূলের জীবনের ঘটনা দিয়ে শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন: আদম (আঃ) কে নিষিদ্ধ জিনিস দিয়ে পরীক্ষা করেছেন। নূহ (আঃ) কে তাঁর স্ত্রী সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করেছেন। ইবরাহীম (আঃ) কে ঈমাণের পরীক্ষা ও সন্তান কুরবানী দেবার মতো পরীক্ষা দিতে হয়, হযরত আইয়ূব (আঃ) কে রোগ দিয়ে, নিঃসন্তান ও সহায় সম্বলহীন করে পরীক্ষা করেন, হযরত ইউসূফ (আঃ) কে মাতৃ- পিতৃ ও ভ্রাতৃহীন করে নারী প্রেমের ফাঁদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। জীবনে কুরআন পর্যালোচনা করলে আমরা যদি নবীদের জীবনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই তাহলে দেখতে পাবো আমাদের জীবনেরও বিভিন্নপর্যায়ে আমরা এরূপ বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছি যা মোকাবেলা করার জন্য আমাদের কুরআন হাদীসের শিক্ষা অনুসরণ করা উচিত। তাই কুরআন ও হাদীস অধ্যয়ন করে তার শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করা অতীব জরুরী। রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) বলেন, রাগের সময় দাঁড়িয়ে থাকলে বসতে, বসা অবস্থায় থাকলে শুয়ে পড়তে কিংবা অযু করতে যাতে শরীর ও মন উভয় স্থিত অবস্থায় আসে। আর স্থিতিশীল অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। মনে রাখতে হবে এ জীবনকে আমরা যতই স্ট্রেসমুক্ত করতে চাইনা কেন আল্লাহ স্বয়ং কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন এ দুনিয়া পরীক্ষাক্ষেত্র। প্রতিটি স্ট্রেসই এক এক ধরণের পরীক্ষা এবং এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার কৌশলগুলোও আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে শিক্ষা দিয়েছেন ও নবী রাসূলরা তাদের জীবনে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে গেছেন। এই পরীক্ষা ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হতে পারলে পরিশেষে পরকাল ও আখেরাতে সম্পূর্ণ স্ট্রেসমুক্ত সুখী নিশ্চিন্ত অনন্তকালের জীবন পুরস্কার হিসেবে দেবার ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাতা’লা। তিনি হচ্ছেন সব কিছুর নড়ংং। তারই কাছে আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে। অতএব এই ক্ষুদ্র দুনিয়ার জীবনে স্ট্রেসমুক্ত থাকতে না চেয়ে বরং আমাদের জীবনের যে সময়টুকু আমরা স্ট্রেসমুক্ত থাকি তখন আমরা যেন সময় নষ্ট না করে আমাদের জীবনের পরবর্তী স্ট্রেস মোকাবেলা করার মানসিক শক্তি অর্জন করি এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করি। প্রসিদ্ধ সূফি দরবেশ সাকিব আল বালখীও মানুষের জটিল মানসিক সমস্যা গুলোর কুরআনের আলোকেই সমাধান দিয়েছেন। সূদীর্ঘ চল্লিশ বছর তিনি খোরাসান স্কুলের একজন প্রসিদ্ধ সূফি দরবেশ ইব্রাহিম ইবনে আযহাম থেকে শিক্ষা শেষে কি শিক্ষা লাভ করেছেন তা ওস্তাদকে জানান। বালখী বলেন, জানিনা কতটুকু শিখেছি তবে নয়টি সমস্যা বুঝতে পেরেছি। প্রথম সমস্যা: যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ পর্যন্ত ভালোবাসা আছে। দেহ যখন কবরে চলে যায় সবচেয়ে আপনজনও আলাদা হয়ে যায়। এটা একটা বিশাল সমস্যা। এর সমাধান আমি কুরআনে পেয়ে গেলাম। আমি সুকর্মকে আপন করে নিলাম। যাতে সবাই আলাদা হয়ে গেলেও এই সুকর্ম কবরে আমার সাথী হয়। দ্বিতীয় সমস্যা: মানুষ যখন মারা যায় এতো দিন ধরে অর্জিত জীবনের সব সম্পদ তার হাতছাড়া হয়ে যায়। এই সমস্যার সমাধান আমি কোরানে পেলাম। তুমি যা নিজের জন্য রেখে দাও তা একসময় অন্যের হস্তগত হবে। যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর তা পরকালের জন্য রয়ে যাবে। সুতরাং আমার প্রয়োজনকে আমি ছোট করতে লাগলাম। আর আল্লাহ যা চান তা বড়ো করতে লাগলাম। আর আল্লাহ যা চান প্রকৃতপক্ষে পরকালে তা আমারই প্রয়োজন। উপার্জনের একটি অংশ তাই আমি আল্লাহর হেফাজতে দিয়ে দিলাম। তৃতীয় সমস্যা : যে বিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে মানুষ দুনিয়াতে আসে সে আত্মাকে পরিশুদ্ধ রাখা যায় না। দিনের পর দিন তা কলুষিত হতে থাকে। এই সমস্যার সমাধানও আমি কোরআনে পেলাম। প্রকাশ্যে এবং গোপনে তুমি আল্লাহকে ভয় করো। তোমার সব গোপন কিছু গোপন অভিলাষও আল্লাহ দেখছেন। তোমার আত্মা যদি পরিশুদ্ধ থাকে জান্নাত তোমার নিবাস হবে। আল্লাহ ভীতি যত বাড়তে থাকলো আমার হৃদয়ের পরিশুদ্ধতাও তত বাড়তে থাকলো। চতুর্থ সমস্যা : আমি দেখলাম নিজের গুরুত্ব, মর্যাদা বাড়ানোর জন্য মানুষের সম্পদ ,পদ, মসনদ, এই তিনটির প্রতি লোভ বেড়েই চলে। কিন্তু এক রাজ্যে এক মসনদেও মালিক তো সবাই হতে পারেনা । হতে পারলেও তা ক্ষণস্থায়ী । সময়ের কাঠগড়ায় সব কিছুই একসময় কাল হয়ে যায়। তাহলে মর্যাদা বাড়ে কীসে? আমি সমাধান পেলাম কোরআনে। তোমাদের মাঝে যে সবচেয়ে ন্যায়নিষ্ট এবং ধার্মিক সেই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশী মর্যাদাবান। তাই সব মোহ মর্যাদা ভুলে গিয়ে আমি আল্লাহর কাছে সম্মানিত হওয়ার পথই বেছে নিলাম। পঞ্চম সমস্যা : আমি চারপাশে মানুষের ক্ষণস্থায়ী ভরসা দেখলাম। কারো ভরসা ব্যবসায়, কারো ভরসা চাকুরীতে, কারো ভরসা দেহের শক্তিতে, নানা জনের ভরসা নানা জিনিসের উপর। এটাও একটা সমস্যা। সমাধান পেলাম কোরআনে। যে আল্লার উপর ভরসা রাখে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করার পর এক আধ্যাত্মিক শক্তির সন্ধান যেন আমি পেলাম। সব কিছু বাদ দিয়ে আমি শুধু মাত্র আল্লাহর উপর ভরসা রাখা শুরু করলাম। আমার সমস্ত পেরেশানি কমে গিয়ে আমি একেবারে নির্ভার হয়ে গেলাম। ষষ্ঠ সমস্যা : আমি দেখলাম চারপাশে মানুষ একজন আরেকজনের সাথে নানা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। কি একটা ভয়ানক ক্ষতির মাঝে মানুষ নিমজ্জিত। আমি আল্লাহর কাছে ফিরলাম এবং সমাধান পেয়ে গেলাম। বান্দা বান্দা সংঘাত করোনা । একজন অন্যজনের হক নষ্ট করো না। মানুষ মানুষের শত্রু না। শয়তানই তোমাদের শত্রু। আর এই শয়তান হলো যে কলব নষ্ট করে। কাজেই এই শত্রুকে আমি একমাত্র শত্রু মনে করলাম এবং সমস্ত সংঘাত-সংঘর্ষ এড়িয়ে চললাম। সপ্তম সমস্যা: একদিন প্রচন্ড দাবদাহ, মরুরবালু যেন আগুনের ফুলকি হয়ে ফুটছে। গৃহে পান করার পানি ফুরিয়ে গেছে। নিকটস্ত কুয়ায় গেলাম। সেখানেও পানি শুকিয়ে গেছে। নিদারুণ তৃষ্ণায় বুক শুকিয়ে আসছে। চিন্তা করলাম এর চেয়ে কঠিন তৃষ্ণার মাঝে পড়বে মানুষ হাশরের ময়দানে। শিশু জন্মগ্রহণ করেই মায়ের দুধ পান করে। ভূমিষ্ট হয়েই খাবারের যোগান পেয়ে যায়। কিন্তু হাশরের ময়দানে আমি কাউকে পাবো না। কে আমার তৃষ্ণা মিটাবেন? বিশাল সমস্যা। সমাধান পেয়ে গেলাম কোরআনে। যারা সত্যবাদী নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেই তাদের কে কাউসারের পানি পান করিয়ে তৃষ্ণা মিটাবেন। আমি মিথ্যা বলা ছেড়ে দিলাম। আর সারাজীবনে একটাও মিথ্যা না বলার শপথ নিলাম। অষ্টম সমস্যা: কেউ রাজার ঘরে আর কেউ প্রজার ঘরে জন্ম নেয়। কারো রং সাদা আর কারো রং কালো।কেউ সুন্দর কেউ অসুন্দর হয়ে জন্ম নেয়। এতে কেউ বেশি মর্যাদা পাচ্ছে , কেউ পাচ্ছেনা । জন্মই মানুষের মাঝে বৈষম্য তৈরী করে দিচ্ছে। বিশাল সমস্যা। সমাধান পেলাম নবী (সাঃ) এর শেষ ভাষণে, আর কোরআনে। আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সাদার উপর কালোর আর কালোর উপর সাদার কোন মর্যাদা নেই। তাক্বওয়াই’বা আল্লাহ ভীতি শুধু পার্থক্য নির্ণয় করবে। রাজা-বাদশাহ, ফকির না ধনী, ফর্সা না কালো-সেই বেশি মর্যাদাবান যে যত বেশী পরহেযগার আর গুণবান। আর শিক্ষা নিয়ে হোক, পদবী নিয়ে হোক, বর্ণ নিয়ে হোক, বংশ নিয়ে হোক, এমনকি বেশি ধর্ম কর্ম করে এটা নিয়েও যদি তিল পরিমাণ গৌরব করে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। নিজের অহমকে দমন করতে হবে। যে বীর সে শত্রু ধ্বংস করে। যে মহাবীর সে নিজের ইগোকে ধ্বংসকরে। আমি সমস্ত অহম, গরিমা, গৌরব থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে লাগলাম। নবম সমস্যা: এই যে পৃথিবীর প্রতি, জীবনের প্রতি একটা মায়া- এই মায়ার জীবন ছেড়ে চলে যাওয়া বড় কঠিন। জীবনে থাকে মৃত্যু ভয়। জঙ্গলে থাকে বাঘের ভয়। আর জঙ্গলে বাঘ আছে জানলে সেই জঙ্গল আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু মৃত্যুর ভয় মানার পরও এটা এড়িয়ে যাবার সুযোগ তো কোন মানুষের নাই। বিশাল সমস্যা। সমাধান পেলাম কোরআনে। যে যেখান থেকেই আসে তাকে সেখানেই ফিরে যেতে হয়। আমি যত বেশি কবরে আখিরাতের কাজ করতে লাগলাম, হাশরে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছে থেকে কাউসারের পানি পান করার সুযোগ তৈরী করতে লাগলাম, রবের কাছে মর্যাদা বাড়ানোর ফিকির করতে লাগলাম ততই আমার মৃত্যু ভয় কেটে গেলো। মানুষ আল্লাহর থেকে আসে এবং তার কাছেই প্রত্যাবর্তন করে।

লেখক – নারী উন্নয়ন কর্মী, কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ ও প্রিন্সিপাল, চিটাগাং ভিক্টোরী ন্যাশনাল স্কুল- সিভিএনএস ।

সম্পর্কিত পোস্ট