মানব পাচার প্রতিরোধে করণীয়

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:২০ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

অ্যাডভোকেট মোঃ সাইফুদ্দীন খালেদ :

সভ্যতা বিবর্জিত জঘন্য অপকর্ম ‘মানব পাচার’ একটি সামাজিক ব্যাধি। কোন ব্যক্তিকে তার দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে বিক্রি বা পাচারের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে রাখা, আশ্রয় দেওয়া, অন্যকোন ভাবে সহায়তা করা হলে মানব প্রাচার হিসেবে গণ্য হয়। আমাদের দেশে পশ্চাৎপদ এলাকার কিছু মানুষের ধারণা, কোনো রকমে একবার বিদেশে পাড়ি জমাতে পারলেই ভাগ্য বদলে যাবে। এ ধরনের অজ্ঞ মানুষই বিশেষভাবে প্রতারণার শিকার হন। প্রতিবেশীদের প্রতারিত হওয়ার পরও অনেকে একই দালাল চক্রকে বিশ্বাস করে নিজের বাড়িঘর বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা তুলে দেন তাদের হাতে। ফলে স্বভাবতই এরা সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেন। সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি কেউ খানিকটা জানে, আবার কেউ জানেই না। ঝুঁকি নিয়ে জেনেশুনে এভাবে সাগরপথে অনিশ্চিত পথে পা বাড়ানোর অন্যতম কারণ বিদেশে যেতে আগ্রহীদের অজ্ঞতা। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে এভাবে তারা ঝুঁকি নিতে রাজি হয়। সাগরপথে মাছ ধরার নৌকায় কিছু কর্মীর বিদেশে গিয়ে কর্মে যোগদানের তথ্যটি দালাল চক্র সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে একই পথে অন্যদের যেতে উৎসাহিত করে। এ প্রক্রিয়ায় বিদেশে গিয়ে অনেকের কর্মে যোগদানের সুযোগ মিললেও ওই সব কর্মী অহরহ বিদেশী কোম্পানি কর্তৃক হয়রানির শিকার হন। তা সত্ত্বেও তারা সেসব মেনে নিতে বাধ্য হন। নামমাত্র বেতন দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ পায় বলে কোনোকোনো বিদেশী কোম্পানি অবৈধভাবে গমনকারী কর্মীদের বিষয়ে আগ্রহ দেখায়। সম্প্রতি লিবিয়ায় নিহত হওয়া ২৬ জন বাংলাদেশী মানব পাচারকারী চক্রের কাছ থেকে অপহৃত হওয়ার পর অপহরণকারীদের হাতে খুন হয়েছেন বলে জানায় লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস। অবৈধ পথে পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য দেখে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয় তা হল, এ বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চোখ এড়ায় কী করে? বাংলাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী, ‘মানব পাচার’ অর্থ কোন ব্যক্তিকে ভয় দেখিয়ে, বল প্রয়োগ বা প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত বা অন্য কোন অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এবং টাকা-পয়সার বিনিময়ে বা অন্য কোন সুবিধা লাভের জন্য তাঁর উপর নিয়ন্ত্রণ আছে এমন কারো সম্মতি নিয়ে এবং বাংলাদেশের ভিতরে বা বাইরে যৌন শোষণ, শ্রম শোষণ অথবা অন্য কোন শোষণ বা নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ক্রয় বা বিক্রয়, সংগ্রহ বা গ্রহণ, নির্বাসন বা স্থানান্তর, চালান বা আটক করা বা লুকিয়ে রাখা বা আশ্রয় দেয়া। উল্লেখ্য, পাচারের শিকার ব্যক্তির বয়স ১৮ বছরের কম হলে বলপ্রয়োগ, প্রতারণা বা প্রলোভন দেয়া হয়েছে কি না তা বিবেচনা করার দরকার নেই বরং শোষণ বা নিপীড়ন হলেই তা মানব পাচার প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। অপরাধের মাত্রাভেদে আইনের মধ্যে মানব পাচারের বিভিন্ন রকম শাস্তির বিধান রয়েছে। এ আইনের ৬ ধারা অনুসারে মানব পাচার নিষিদ্ধকরে এর জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ধারা ৭ অনুসারে সংঘবদ্ধ মানব পাচার অপরাধের দণ্ড মৃত্যুদণ্ড  বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। এ ছাড়া এ আইনের ধারা ৮ অনুসারে অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র বা চেষ্টা চালানোর দণ্ড হিসেবে অনধিক সাত বছর এবং কমপক্ষে তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে। ধারা ৯ অনুসারে জবরদস্তি বা দাসত্বমূলক শ্রম বা সেবা প্রদান করিতে বাধ্য করার দণ্ড অনধিক ১২ বছর এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড। উক্ত আইনের ধারা ১০ অনুসারে মানব পাচার অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে অপহরণ, চুরি এবং আটক করার দণ্ড এবং মানব পাচারের অপরাধ সংঘটনের অভিপ্রায়ে বা যৌনশোষণ ও নিপীড়নের শাস্তি অনধিক ১০ বছর এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত রাখা হয়েছে। নবজাতক শিশু অপহরণ বা চুরির দণ্ড অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে। এ আইনের পতিতাবৃত্তি বা অন্য কোনো ধরনের যৌনশোষণ বা নিপীড়নের জন্য আমদানি বা স্থানান্তরের দণ্ড অনধিক সাত বছর এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে। এ আইনের অধীন অপরাধগুলো আমলযোগ্য, আপোষ অযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য। হতাশার বিষয় হলো, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মানব পাচার অব্যাহত রয়েছে। একশ্রেণীর মুনাফালোভী ব্যবসায়ী চক্র নারী ও শিশুদের চাকরি, বিবাহ, ভালোবাসা বা অন্য কিছুর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বিদেশে পাচার করে চলেছে। বছরের পর বছর এসব পাচারকৃত নারী ও শিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতন সহ্য করছে এবং ব্যবহৃত হচ্ছে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর ট্রাফিকিং ইন পারসন্স(টিআইপি) রিপোর্ট ২০১৯ অনুযায়ী, প্রতিবছর অনেকেই অনিয়মিত চ্যানেলগুলির মাধ্যমে পাচার হন এবং পাচারকারীদের হাতে শোষণ এবং নির্যাতনের শিকার হন এই মানুষগুলো। যারা অবৈধভাবে বা অনিয়মিতভাবে বিদেশে যান বা যেতে বাধ্য হন তারা সীমাবদ্ধ চলাচল, ঋণচুক্তি, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নিপিড়ন, জোরপূর্বক বিবাহ এবং দাসত্বের মত সমস্যায় পরেন। পরিশেষে বলব মানব প্রাচার প্রতিরোধে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। নিজেকে এবং অন্যদেরকে পাচারের হাত থেকে রক্ষা করুন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করুন। আপনার অধিকারগুলো জানুন এবং সব সময় সেগুলো আদায় করার চেষ্টা করুন। পছন্দের দেশ বা চাকরিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে ঝুঁকিগুলো যাচাই করুন। আপনার ভবিষ্যৎ আপনি নিজেই স্থির করুন এবং জেনে ও বুঝে আপনার সিদ্ধান্ত নিন। নিবন্ধিত শ্রম অভিবাসী উপায়গুলো জেনে নিন। যেসব সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থা পাচার প্রতিরোধে কাজ করে তাদের সঠিক তথ্য দেয়া ও সহায়তা করা কর্তব্য। দেশের বাইরে যাওয়ার পূর্বে এটা অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যেসব ব্যক্তি  যোগাযোগ করছে এবং দিক নির্দেশনা দিচ্ছে তারা নিয়োগদাতার বৈধ এবং আইনগত স্বীকৃত প্রতিনিধি কিনা। এ অন্যদিকে এ অবক্ষয় প্রতিরোধে বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রের পরিচয় জানা এবং মেয়ের অভিভাবকের ছেলের পারিবারিক অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া প্রয়োজন। পাচারের পরিণতি সম্পর্কে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পরিবারের সবাইকে সচেতন করা কর্তব্য। কাজের লোক নিয়োগ করার ক্ষেত্রে ছবি তুলে রাখা এবং প্রাক-পরিচয় যাচাই করে নেয়া আবশ্যক। বাড়ির শিশুকে নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর মুখস্থ করানো, অপরিচিত লোকের দেয়া কোনো খাবার বা জিনিস যাতে গ্রহণ না করে সে বিষয়ে পরিবার থেকেই শিশুকে সচেতন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এ বিষয়ে তথ্যকেন্দ্র পরিচালনা করা প্রয়োজন, যাতে পাচার, শোষণ, অবহেলা, নির্যাতন বা অন্য যে কোনো নেতিবাচক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি মানব পাচার রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা এবং বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বৃদ্ধি করতে হবে তরুণদের দক্ষতা। একইসাথে যারা বিদেশে যেতে আগ্রহী তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো নাগরিক যাতে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার নামে আত্মহনন এর পথ বেছে না নেয় তার দিকে নজর দিতে হবে। সীমান্ত বা জল-স্থল-আকাশ পথে নজরদারি বাড়াতে হবে।

লেখকঃ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট