মাদকের কবলে তরুণ ও যুবসমাজ!!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১২:২১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

মো: তানভীর ইসলাম নাঈম।

বর্তমান বিশ্ব সভ্যতা যতগুলো মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তার মধ্যে মাদক কিংবা মাদকাসক্তি অন্যতম। যে সকল দ্রব্য সামগ্রী সেবন ও ব্যবহার করার ফলে একজন মানুষের মনের অনুভূতি, চিন্তা ও চেতনা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অস্বাভাবিক অবস্থায় রূপান্তরিত হয় তাকে মাদক বলে এবং এই সকল দ্রব্য নিয়মিত সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়াকে মাদকাসক্তি বলে। সাধারণত মানুষ অত্যাধিক বিনোদন, সাময়িক আত্মতৃপ্তি, অস্থায়ী যৌন উত্তেজনা ও কল্পিত সুখের চরম পর্যায়ে পৌছার উদ্দেশ্যে গাঁজা,ফেনসিডিল, হিরোইন, ইয়াবা,প্যাথেড্রিন ইনজেকশন, ঘুমের ট্যাবলেট ইত্যাদি মাদক দ্রব্য সেবন করে থাকে।
বিভিন্ন কারণে একজন মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অস্থিতিশীল সমাজ ও অপসংস্কৃতির সহজলভ্যতা তাদেরকে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এক সময় ছেলে-মেয়েরা স্কুল থেকে আসার পর মানসিক বিকাশের জন্য মাঠে নেমে আসতো, মেতে উঠতো খেলাধুলায়। এখন তার উল্টা ঘটনা দেখা যায়। খেলাধুলার জন্য নেই পর্যাপ্ত মাঠ। অন্য দিকে বিশ্বায়নের ফলে বৃহৎ পরিবার ভেঙ্গে অসংখ্য ক্ষুদ্র পরিবার তৈরি হচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে নিঃসঙ্গতা বেড়ে চলছে। ছেলেমেয়েদের জীবনে আধুনিকতার নামে নেমে এসেছে— মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার ও মাদকের মত ভয়ংকর সঙ্গী। শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে পারিবারিক, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে। ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব এবং মাদকের ব্যাপারে ধর্মীয় যে বিধিবিধান রয়েছে এবং এর শাস্তি কী হতে পারে এ ব্যাপারে তাদেরকে শিক্ষা না দেয়া। এখানেই একটি গ্যাপ থেতে যায় তাদের জীবনে।আর যখন পথ চলার পরিক্রমায় তারা বিভিন্ন সপ্ন বোনে। আর সপ্ন থেকেই সৃষ্টি আশা, নিরাশা ও হতাশার। আর এই হতাশার কারণে মানুষ তার নিজের উপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যার ফলে সাময়িক আত্মমুক্তির জন্য এই সর্বনাশা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া অনেকে মাদকাসক্তির ভয়াবহতা জেনেও কৌতূহলবশত বন্ধু-বান্ধবীর পাল্লায় পড়ে এই দ্রব্য সেবন করে।আর এ গন্ডি থেকে বের হওয়া এক প্রকার অসম্ভব হয়ে ওঠে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মনস্তাত্ত্বিক। এটি মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। যেমন— পরিক্ষায় ফেল করা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, বেকারত্ব ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য পান শুরু করে। অনেক সময় পিতা, বড় ভাই বা কাছের মানুষেরা নেশায় অভ্যস্ত থাকলে এটির প্রভাব ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোনদের উপর বিস্তার লাভ করে। এক লোককে আমি জিজ্ঞেসা করেছিলাম, আপনার এই জগতে প্রবেশের কারণ যদি বলতেন। তিনি বললেন, “আমার মামা সিগারেটে অভ্যস্ত ছিল। মাঝে মাঝে সিগারেট জ্বালাতে দিত আমার কাছে। জ্বালানোর পরে সিগারেট নিয়ে আসতে আসতে অনেক সময় নিভে যেত, তখন মামা বলতো টান দে বেটা। এভাবেই এই জগতে আমার প্রবেশ”। এছাড়াও মাদকের সহজলভ্যতার কারণে দিন দিন মাদকে ছেয়ে যাচ্ছে সমাজের প্রতিটি প্রান্তর। একই সাথে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব। এখানে বেশি কিছু বলার নেই। গ্রাম-গঞ্জে একটি প্রবাদ আছে, যাকে দিয়ে ভূত ছাড়াবো তাকেই ধরেছে ভূতে। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বারবার বলে আসছে, তথাপি দুই এক জায়গায় প্রশাসন তৎপর থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে থাকেন।

মাদক মানুষকে অনেক ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তন্মোধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: আর্থিক, মানসিক, শারীরিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষতির সম্মুখীন। গত এক সপ্তাহ আগে সংবাদপত্রে দেখতে পাই; ছেলে তার বাবা এবং মা দুজনকেই মাদকের টাকার জন্য মারধর করে ঘর থেকে বের করে দিল। আরো জঘন্যতম ঘটনা হল, সন্তান মাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে মাদকের টাকার জন্য। গণমাধ্যমে এরকম খবর প্রতিদিনই মিলছে। এবার একটু জাতীয় গণমাধ্যমের রিপোর্ট দেখা যাক, প্রতিদিন নেশার পেছনে অপচয় হয় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এর ভিতরে শুধু রাজধানীতেই ৭ কোটি টাকা। ২৮ হাজার কোটি টাকা আমাদের মোট GDP এর ২.২% (দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ জুন ২০১৩ ইংরেজি)। এটা ছিল ২০১৩ সালের ঘটনা। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পাঠক সহজেই বুঝতে সক্ষম। ১৫- ৩৫ বছর বয়সী মানুষই হচ্ছে একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি কিন্তু গণমাধ্যমের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ৮০% মানুষ যারা মাদকের সাথে জড়িত তাদের বয়স ১৫-৩৫ বছর। তাহলে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে ! মাদকের চারণভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে আমাদের সমাজ। অনেকেই গাড়ি-বাড়ি বিক্রি করেছে এই মাদকের কারণেই। এছাড়াও ব্যক্তি নিজের সর্বস্ব বিক্রি করেও ক্ষান্ত হয় না। পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে আরো দশ জনের টাকা-পয়সা, দোকানপাট লুটপাট করে হলেও তারা তাদের খরচ যোগায়। এভাবেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে টেনে আনে মারাত্মক ধ্বস।

বর্তমানে বহুল আলোচিত ৫ টি নেশাজাতীয় দ্রব্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়— সিগারেটের পরেই গাজা এবং ইয়াবা বহুল আলোচিত মাদক দ্রব্য। বর্তমানে মাদক হিসাবে ইয়াবা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে কিডনি, লিভার ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাময়িক যৌন উত্তেজনা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তাছাড়া রক্ত চাপ বেড়ে যায়। সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া গাঁজার ব্যবহার বাংলাদেশে পানির মত সহজলভ্য হতে চলেছে দিনকে দিন। হাত বাড়ালেই সন্ধান পাওয়া যায়। এটি রক্তবাহী শিরার ক্ষতি করে ফলে রক্ত পরিবহনে সমস্যা হয়। স্মৃতি শক্তির ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। তাছাড়া মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। পুরুষের ক্ষেত্রে টেস্টিকুলার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।অনেকের ধারণা গাঁজা সেবন করলে সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে গাঁজা সেবনে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয় এবং চোখের দৃষ্টি কমে যায়। জার্মানির সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট ফর মেন্টাল হেল্থ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ হয়ে জীবনের মূল্যবান সময় হারিয়ে যেতে পারে এবং লিভার সমস্যা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন অনেকে। ডব্লিউ এইচ ও এর রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০১২ সালে বিশ্বব্যাপী মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা তো অবগত আছিই! তাছাড়া ২০০ রকমের নানাবিধ অসুখ-বিসুখ হতে পারে মদ্যপানের কারণে। মাদকাসক্ত ব্যক্তির মৌলিক আচার-মাদকাসক্ত ব্যক্তির মৌলিক আচার-আচরণ পর্যালোচনা করলে আমরা তাদের চেহারায় হতাশা, অনিদ্রা, শরীর ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ করা, মানসিক অবস্থার বারবার পরিবর্তন আসা, কারণে-অকারণে আড্ডায় সময় ব্যয় করা, সর্বোপরি বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা না থাকা। এছাড়াও বিভিন্ন অসংগতি তাদের আচরণে আমরা দেখতে পাব।

এহেন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে পরিবার ও সমাজকে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে । ছোট বেলা থেকেই ধর্মীয় মৌলিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা; যাতে কোমল হৃদয় মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে ঘৃণা জন্মায় এবং এর ধর্মীয় কুফল সম্পর্কে জানতে পারে। সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে তারা কোথায় কিভাবে কাদের সাথে সময় ব্যয় করছে এবং কাদের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করছে।খেলাধুলার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং পর্যাপ্ত মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক কাজে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর ভিতরে মানবসেবা মূলক বিভিন্ন কাজ এবং পাঠাগার প্রতিষ্ঠা অন্যতম। ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মসজিদে,ঈদগাহে অন্য ধর্মালম্বীরা তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় নিয়ে যেতে হবে। আত্মীয় স্বজনদের সাথে পরিচয় করে দিতে হবে এবং তাদের সামনে সন্তানের ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। সন্তান কাছে কিংবা দূরে যেখানেই থাকুক সবসময় মোবাইলে বা অন্য কোন ভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া। সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করা। পারিবারিক ঝগড়াঝাঁটি এড়িয়ে চলা। সন্তানকে প্রচুর সময় দেওয়া এবং ছুটির দিনে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাওয়া। পড়াশোনায় অমনোযোগী এমন ছাত্র-ছাত্রীদের দূরে পড়াশোনার জন্য ভর্তি না করা। এছাড়া সমাজে এর কুফল সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে সমাজের সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে বিশেষ করে মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক, সমাজের সকল সচেতন মানুষকে যেমন এগিয়ে আসতে হবে তেমনি প্রশাসনের সকল সদস্যকে দেশে ও জাতির কল্যাণে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা এই মানবতা বিধ্বংসী পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে।

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।