মনকে সুস্থ রাখো,পৃথিবী সুন্দর হবে

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:৫০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২০

—————————

মানসিক স্বাস্থ্য বলতে কেবল মানসিক রোগ বোঝায় না।মনে কোন রোগ না থাকলেও মনের যত্নের প্রয়োজন আছে। যার কোন মানসিক রোগ নেই, তারও মনকে সুস্থ রাখার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক সুস্থতা ও সুস্থ ভাবাবেগ আমাদের সার্বিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বব্যাপী ১০ অক্টোবর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়না।আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে যতটুকু সচেতনতা প্রয়োজন ততটুকু আমরা নই।বাস্তবিকই এখনো সমাজের প্রতিটি স্তরে মানসিক সমস্যাগুলোকে নিয়ে আমরা হাসি,ঠাট্টা, মজা করি।

আজ থেকে ৫০ বছর আগেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কোন সচেতনতা ছিলনা।তবে বর্তমামে এটি একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে বিশ্বে।মানসিক সমস্যাগুলোকে আর হাসির ছলে উড়িয়ে দিলে চলবে না।২০১৮-২০১৯ সালের মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৭% মানুষের মানসিক রোগ বিদ্যমান। দেশের ১০০ জনের ৭ জন বিষন্নতায় আক্রান্ত। তবে অবাক করা বিষয়, এদের ৯২%ই চিকিৎসার আওতাধীন নয়।শিশুরাও মানসিক রোগে কম আক্রান্ত নয়।দেশের ১৩.৬% শিশু কোন না কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে।পুরুষের তুলনায় নারীরা মানসিক সমস্যায় বেশি ভোগে।দ্রুত চিকিৎসা সম্ভব না হলে মানসিক রোগ প্রভাব ফেলতে পারে মস্তিষ্ক বিকাশের মত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে।
দেশের এমন পরিস্থিতিতে মনকে ভালো রাখা খুবই দুরুহ বিষয়। চারপাশে তাকালেই দেখতে পাচ্ছি অন্যায়,অত্যাচার, শোষণ ,দুর্নীতিতে ভরা সমাজ ধর্ষণের প্রতিবাদ মিছিলে উত্তাল রাজপথ, তবুও কমছে না ধর্ষণ। এতো প্রতিবাদ,মিছিল, সমাবেশও যেন ব্যার্থ অপরাধ রুখতে।একের পর এক সমস্যায় এদেশ।

হঠাৎ করে অদেখা শত্রু মহামারী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে গেল সারা দেশে,মানুষকে করলো গৃহবন্দী,কেড়ে নিল প্রানোচ্ছল জীবনের গতি।এখন দেশের সকল কিছু স্বাভাবিক চললেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ ছুটির যেন কোন শেষ নেই!যেই তরুণ প্রাণগুলোর ছুটে বেড়ানোর কথা তারা এই দীর্ঘ অবসরে যেন নেতিয়ে পড়েছে।অসহায়, একাকীত্ব যেন তাদের ঘিরে ধরেছে।এতো দীর্ঘ সময় নিজেদের গন্ডির বাইরে থেকে তারা যেন হাপিয়ে উঠেছে যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এর উপর প্রভাব ফেলছে।হতাশার সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যেয়ে অনেক তরুণ বেছে নিয়েছিল আত্মহত্যা।এই দুঃখজনক ঘটনার সম্মুখীন যেন আর না হতে হয় সেই জন্য এই বিপর্যয়কালীন সময়েই আমাদের আরো বেশি উচিত মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে নজর দেয়া।

সমাজ ব্যবস্থার সকল ক্ষেত্রে আজ যেন দুর্নীতি আর অন্যায় অত্যাচারের কালো ধোয়ায় ছেয়ে গেছে পুরো দেশ।এমন সমাজ ব্যাবস্থায় মনকে সুস্থ রাখা,ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা সত্যি ভীষণ কঠিন কাজ।তবুও আমাদের নিজেদের ভালো থাকার স্বার্থে মনকে সুস্থ রাখতে হবে। নিজেদের নৈতিকতা রক্ষার জন্যও মানসিক সুস্বাস্থ্য রক্ষা জরুরি।মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পারলেই এই প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে থাকার সাহসিকতা আমাদের তৈরি হবে।মন এমন একটা অস্ত্র যা সকল সমস্যাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে,শুধু মনের জোরেই অনেক মৃত্যুপথ যাত্রীও সেড়ে ওঠে। তাই নিজেদের স্বার্থেই এই করোনাকালীন সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে আমাদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য দায়ী করা যায় আমাদের নিজস্ব অধিক প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবকে ,সমাজের চাপ,পরিবেশের অবনতি,প্রত্যাশার চাপ বৃদ্ধিকে।মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সবচেয়ে জরুরি মনের যত্ন নেওয়া।দৈনন্দিন জীবনে সামান্য পরিবর্তন আনলেই কিন্তু এই কাজটা খুব সহজ হয়ে যায়।

নিজের যত্ন নিন:
নিজের জন্য আলাদা কিছুটা সময় রাখুন।নিজের মনের কথা শুনুন,বই পড়ুন,ব্যক্তিগত শখ-আহ্লাদ মেটান।মনের মধ্যে আবেগ চেপে রাখবেন না।অবদমিত আবেগ প্রকাশের ফলে মানসিক চাপ ও জটিলতা কমে যায়।

আপনজনদের সাথে সময় কাটান:
বন্ধু বান্ধব, পরিবার,সহকর্মী এবং প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখুন।পছন্দের লোকজনের সাথে সময় কাটালে নিজের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা জন্মায়।একটি মিষ্টি হাসি ও স্নেহের আলিঙ্গনের বিকল্প কোন প্রযুক্তিও হতে পারেনা।

শরীরের যত্ন নিন:
শরীর ও মন একে অপরের সাথে জড়িত,এদের মধ্যে নিবির যোগাযোগ।পুষ্টিকর খাবার,পর্যাপ্ত বিশ্রাম,নিয়মিত ব্যায়াম করুন।যার ফলে শরীর প্রতিদিনের ধকলের সাথে পেরে উঠবে।নিয়মিত ঘুম মেজাজ খিটখিটে থেকে রক্ষা করে,ব্যায়াম খিদে বাড়ায় সব মিলিয়ে মন ভালো থাকবে।

নতুন কিছু করুন:
নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন।নতুন জিনিস শিখলে মনের একঘেয়ে চিন্তা কেটে যায়,মনঃসংযোগ বাড়ে এবং নতুন কিছু শেখার আনন্দে মন ভালো থাকে।

নিজের উপর ভরসা রাখুন:আমরা প্রত্যেকেই আলাদা, সাবার মাঝেই আলাদা কিছু দক্ষতা এবং দুর্বলতা আছে।দুর্বলতাকে পাশ কাটিয়ে দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যান।আর পাচটা মানুষের মতো আপনিও নিখুঁত নন এটা মেনে নেওয়াটাই স্বাভাবিক। কোন কিছু না পারা অন্যায় নয়, প্রয়োজন হলে আপনি শিখে নিবেন।কিন্তু নিজের কাজের উপর ভরসা রাখবেন।

নিজেকে মেলে ধরুন:অনেক সময় আমরা আমাদের অনুভূতি মেলে ধরতে লজ্জা পাই। তবে নিজের পছন্দ, অনুভূতি আবেগ মেলে ধরা উচিত এতে মানসিক চাপ কমে যায় মনও ভালো থাকে।

সাহায্য চান:আক্ষরিক অর্থে আমরা কেউ এই দুনিয়ায় সুখী না।কাজেই মন খারাপ হলে,বিপদে পরলে,হতাশাগ্রস্ত হলে,রেগে গেলে-আপনজন সাথে কথা বলুন।তবুও না হলে কাউন্সিলর এর পরামর্শ নিন দেরি করবেন না।জীবনটা খুব সুন্দর, তাকে সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হবে, সেই সম্পর্কে সচেতন হতে হবে আমার আপনার সকলের।

সময় এখন আরো ভয়াবহ।এই প্রতিকূল পরিবেশে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাই সুস্থ একটা মন,যে মন আমাদের সাহস জোগাবে।তাই এখনি সঠিক সময় মানসিক স্বাস্থ্য এর দিকে আরাও যত্নশীল হওয়া।হতাশা, দুশ্চিতায় পরে কোন ভুল সিদ্ধান্ত না নিয়ে সুন্দর ভাবে জীবনযাপন করতে হলে মানসিক সুস্বাস্থ্য এ বজায় রাখা অতীব জরুরি।নিজেদের স্বাস্থ সম্পর্কে নিজেরা সচেতন হই, আর সুন্দর সমাজ গঠনের অংশ হয়ে উঠি।আমরাই পারবো একটা সুন্দর সমাজ পৃথিবীকে উপহার দিতে।

লেখক:
সানজানা হোসেন অন্তরা
ততথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।