ভালোবাসা দিবসের কুফল: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১২:৪২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

ইমদাদুল হক যুবায়ের

“লাল নীল সাদা কালো ভালোবাসার রঙ, ভালোবেসে কেউবা আবার দেখায় কত ঢঙ।/ রঙে-ঢঙের ভালোবাসা দুদিন পরেই ফিকে, প্রকৃত প্রেম এই দুনিয়ায় জনম জনম টিকে।” ভালোবাসার একটি বিশেষ দিক হলো নারী ও পুরুষের জৈবিক ভালোবাসা। মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে মহান আল্লাহ তা‘আলা মানুষের মধ্যে জৈবিক ভালোবাসা দান করেছেন। তাইতো ভালোবাসার প্রবল আকর্ষণে মানুষ পারিবারিক জীবনে সন্তান গ্রহণ করে ও পরিবার-পরিজনের জন্য সকল কষ্ট অকাতরে সহ্য করে। আর এভাবেই মানব সভ্যতা পৃথিবীতে টিকে আছে। যদি কোনো সমাজে পারিবারিক সম্পর্কের বাইরে নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্কের ভালোবাসা সহজলভ্য হয়ে যায়, তবে সে সমাজে সুখি পরিবার গঠন ও সংরক্ষণ অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং ক্রমান্বয়ে সে সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়। তাই সকল আসমানী ধর্মগ্রন্থ ও সভ্য মানুষ ব্যভিচার ও বিবাহপূর্ব ভালোবাসা জঘন্য পাপ বলে গণ্য করেছেন।
১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন দিবস বর্তমানে ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ নামে ব্যাপক উদ্দীপনার সাথে আমাদের দেশেও পালিত হয়। মূলত দিবসটি ছিল প্রাচীন ইরোপীয় গ্রীক-রোমান পৌত্তলিকদের একটি ধর্মীয় দিবস। ভারতীয় আর্যদের মতই প্রাচীন রোমান পৌত্তলিকগণ মধ্য ফ্রেব্রুয়ারি বা ১লা ফাল্গুন ভূমি ও নারী উর্বরতা, নারীদের বিবাহ ও সন্তান কামনায় প্রাচীন দেবদেবীদের বর লাভ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বিভিন্ন নগ্ন ও অশ্লীল উৎসব পালন করত; যা লুপারকালিয়া উৎসব নামে প্রচলিত ছিল। ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্ম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা লাভের পরেও এ সকল অশ্লীল উৎসব অব্যাহত থাকে। তখন ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে অবিশ্বাস বা ধর্মীয় ভিন্নমতের অভিযোগে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় এবং বিভিন্ন প্রকারের অশ্লীলতা, পাপাচার, মুর্তিপূজা ইত্যাদির প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
প্রচলিত বাইবেলে যীশু খ্রিস্ট যেখানে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে, সালাত-সিয়াম পালন করতে, নারীর দিকে দৃষ্টিপাত না করতে, ব্যভিচার বর্জন করতে, সততা ও পবিত্রতা অর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে যিশুর দর্শন লাভের দাবিদার পল এ সকল বিধান সব বাতিল করে বলেছেন যে, শুধু যীশুকে ত্রাণকর্তা বিশ্বাস করলেই চলবে। তিনি এ সকল বিধানকে নোংরাভাবে উপহাস করে বলেছেন, “বিধান পালন করে যদি জান্নাতে যেতে হয় তবে যীশু কীসের জন্য!” (বাইবেল, রোমান, খন্ড, ৩, পৃ. ৭) যীশু-ভক্তির নামে পল নিজেই যীশুর সকল শিক্ষা বাতিল ও পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এ পরিবর্তনের ধারায় ৫ম-৬ষ্ঠ খ্রিস্টীয় শতকে লুপারকালিয়া উৎসবকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা সাধু ভ্যালেন্টাইনের দিবস’ নামে চালানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক ব্যক্তিটি কে ছিলেন তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। তবে মূল কথা হলো, লুপারকালিয়া উৎসবকে খ্রিস্টান রূপ প্রদান করা। গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, এ দিবসটি একান্তই পৌত্তলিক ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় দিবস। যে দিবসটির কথা কয়েক বৎসর আগে দেশের কেউই জানত না, আজ সে দিবসটির কথা জানে না এমন মানুষ দেশে নেই বললেই চলে। ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমেই এরূপ করা সম্ভব হয়েছে।
ভাষাগত বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় যে, ইংরেজীতে ‘লাভ’, আরবিতে ‘মুহাব্বাত’ ও বাংলায় ‘ভালোবাসা’। পানাহার, দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি কর্মের মত ভালোবাসাও ইসলামের দৃষ্টিতে কখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত আবার কখনো কঠিন নিষিদ্ধ তথা হারাম কর্ম। পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানদেরকে ভালোবাসা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, সঙ্গী ও বন্ধুদের ভালোবাসা, সকল মুসলিম ও মানুষের পরস্পরের ভালোবাসা, সর্বোপরি মহান আল্লাহর সকল সৃষ্টিকে ভালোবাসা ইসলাম নির্দেশিত কর্ম। এরূপ ভালোবাসা মানুষের মানবীয় মূল্যবোধকে উজ্জীবিত করে, হৃদয়কে প্রশস্ত ও প্রশান্ত করে যা কল্যাণময় সমাজ ও সভ্যতার বিনির্মাণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে।
সংঘাতময় এ পৃথিবীকে মানুষের বসবাসযোগ্য করার জন্য এ ভালোবাসার প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার কতই না প্রয়োজন! কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের’ নামে শুধু যুবক-যুবতীদের জৈবিক ও বিবাহপূর্ব বেহায়াপনার দিকে যে উস্কে দিচ্ছে তা নয় বরং তাদের বয়সের উন্মাদনাকে পুঁজি করে, কতিপয় গোষ্ঠী তাদেরকে অশ্লীলতার পঙ্কিলতার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধি হাসিল করতে চায়।
ভালোবাসা দিবসের নামে যা কিছু করা হয় সবই অশ্লীলতা, যা অধিকাংশ সময়ে চূড়ান্ত ব্যভিচারের মধ্যে নিমজ্জিত করে। আর এ ভয়ঙ্কর পাপের জন্য দুনিয়াতে যেমন রয়েছে ভয়াবহ গযব তেমনি আখিরাতেও রয়েছে ভয়ঙ্কর শাস্তি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- “যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে এমন সব রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পুর্বপুরুষদের মধ্যে প্রসারিত ছিল না।” (আলবানী, সহীহুল জামি, খন্ড-২, পৃ. ১৩২১)
ইসলাম শুধু ব্যভিচারকেই নিষিদ্ধ করেনি, বরং ব্যভিচারের নিকটে নিয়ে যায় এমন সকল কর্মকে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করেছে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন-“তোমরা নিকটবর্তী হয়ো না ব্যভিচারের, নিশ্চয় তা অশ্লীল এবং নিকৃষ্ট আচরণ।” (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩২) ব্যভিচারের পথ রোধের অন্যতম দিক চক্ষু সংযত করা, অনাত্মীয় নারী-পুরুষের দিকে বা মনের মধ্যে জৈবিক কামনা সৃষ্টি করার মত কোনো কিছুর দিকে দৃষ্টিপাত না করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন- “মুমিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের সম্ভ্রম হেফাজত করে। আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের সম্ভ্রম হেফাজত করে।” (সূরা আন-নূর, আয়াত:৩০-৩১) এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- “চক্ষুদ্বয়ের ব্যভিচার দৃষ্টিপাত, কর্ণদ্বয়ের ব্যভিচার শ্রবণ, জিহ্বার ব্যভিচার কথা বলা, হাতের ব্যভিচার স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার পদক্ষেপ, অন্তরের ব্যভিচার কামনা।” (মুসলিম, আস-সহীহ, খন্ড-৪, পৃ. ২০৭৪)
মানব সমাজে ব্যভিচার রোধ ও পরস্পর বৈধ ভালোবাসার প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। পারিবারিক কাঠামো ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেম-ভালোবাসার স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে এ সকল ভালোবাসার বাণী প্রচারের জন্য ‘ভালোবাসা দিবস’-কে বেছে নেওয়া বৈধ নয়। যেমন- ভালোবাসা দিবসে পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি বা স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পর মেসেজ পাঠানো, শুভেচ্ছা জানানো বা উপহার দেওয়া নেওয়াও একই রকমের পাপ। যেহেতু এ দিবসটিতে ভালোবাসার নামে বেহায়াপনা ও ব্যভিচার সংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রমই বেশি ঘটে থাকে সেহেতু কোনোভাবে এ দিবসটিকে পালন করার অর্থ দাঁড়ায় এটাকে স্বীকৃতি দেওয়া।
এ দিবসে যুবক-যুবতীদের আড্ডা, গল্পগুজব, উল্লাস করা বা অনুরূপ যেকোনো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহপূর্ব ভালোবাসার উস্কানি দেওয়া ভয়ঙ্কর পাপ। কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতী ভালোবাসার নামে অবাধে মেলামেশা বা আড্ডার খপ্পরে পড়লে তাদের মধ্যে এ বিষয়ে অদম্য আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং ক্রমান্বয়ে তারা অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও আনুষঙ্গিক সকল পাপ-পঙ্কিলতার মধ্যে ডুবে যায়।
সুতরাং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তথা মানব সভ্যতার স্বার্থে এবং দুনিয়ায় কল্যাণ লাভ ও আখিরাতে মুক্তির লক্ষ্যে ‘ভালোবাসার’ নামে বেহায়াপনা ও ব্যভিচারের উস্কানি দেয় এমনসব গর্হিত কাজকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে রোধ করা আমাদের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। এ দিবসে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, সমর্থন-প্রশ্রয় দেওয়া বা এ দিবসের অশ্লীলতার বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হলে এইডস এর মত কঠিন রোগব্যধি, জাগতিক অপমান, শাস্তি, লাঞ্ছনা, পরিবারের অশান্তি, সন্তানদের অধঃপতন ইত্যাদি বিভিন্নভাবে আল্লাহর শাস্তি আমাদের জীবনকে ধ্বংস করতে পারে। কাজেই আল্লাহর কঠিন শাস্তিকে ভয় করতে হবে। অশ্লীলতার সকল পথ রোধে এখনই সচেষ্ট হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন!!

লেখক: এম.ফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। শিক্ষক, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট। ুঁ