বিয়েতে লোক দেখানো বিলাসিতা বন্ধ হোক!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১০:৫৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০১৯

⦿ সুমনা মৃধা

বিয়ে হলো একটি সামাজিক বন্ধন বা বৈধ চুক্তি যার মাধ্যমে দুজন মানুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কৈশোর থেকেই মানব মনে বিয়েকে ঘিরে তৈরি হতে থাকে নানা রোমাঞ্চকর জল্পনা-কল্পনার রঙিন জাল। তবে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বিয়ের স্বপ্ন যুবসমাজকে হতাশার সাগরের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।

পূর্বে বিয়ের দৃশ্যে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা সাধাসিধে সাজের কণে আর নাকে রোমাল চাপা বরকে দেখা গেলেও, বর্তমানে বিয়ে বলতেই চোখে ভেসে উঠে বলিউডের আদলে সজ্জিত শ্যুটিং স্পট। অত্যন্ত ব্যয়বহুলভাবে সপ্তাহ জুড়ে চলে বিয়ের নানা আয়োজন। ফুল শোভিত কমিউনিটি সেন্টার, পেশাদার ফটোগ্রাফারকে দিয়ে করানো ফটোগ্রাফি/সিনেমাটোগ্রাফি, কণের ব্যয়বহুল সাজসজ্জা, গা ভর্তি গহনা, শ থেকে হাজার খানেক অতিথি, দামী খাবার সহ আরো আনুষঙ্গিক খরচ তো থাকছেই। আয়োজিত হচ্ছে ম্যাহেন্দী নাইট/সান’গীত, হালদী, ব্রাইডাল শাওয়ার, ব্যাচেলরস্ নাইট, আকদ, এনগেজমেন্ট, নিকাহ, রিসেপশন প্রভৃতি ছাড়াও বিভিন্ন ইভেন্ট। সব মিলিয়ে বিয়ে বাড়ি পরিণত হয়েছে ব্যয়বহুল শ্যুটিং স্পটে। কার সামাজিক মর্যাদা কতো উর্ধ্বে তা যেন বিয়ের জাঁকজমকতার মাধ্যমেই প্রদর্শন করতে হবে। জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে নিয়ে শুরু হয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আর এই বিকৃত মস্তিষ্কের প্রতিযোগিতার বলি হচ্ছে আমাদের যুবসমাজ।

বিত্তবানদের জন্য বিয়েতে অহেতুক বিলাসিতা স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারেও। সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখার জন্য তারাও হাত বাড়াচ্ছে আকাশছোঁয়া খরচের দিকে। যার প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবারগুলো।

প্রথমেই আসা যাক, কণের পরিবারের কথায়। কন্যা সন্তান জন্মের পরপরই পরিবারের মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা ভর করে, মেয়ের বিয়ের খরচ। শুরু হয় অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা। তিলতিল করে জমানো টাকাও যখন বিয়ের খরচ মেটাতে অপ্রতুল, তখন বিক্রি/বন্ধক রাখতে হয় ভিটে-মাটি। কখনো বরপক্ষ দাবী করে বসেন মোটা অঙ্কের যৌতুক কিংবা দুই-তিনশত বা ততোধিক অতিথিকে বিয়েতে আপ্যায়নের দাবী। একজন পিতা কন্যাকে পাত্রস্থ করার লক্ষ্যে সারাজীবনের সঞ্চয় একদিনেই ঢেলে দেন।

অশিক্ষিত গ্রামীণ সমাজে যৌতুক আদায়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও, আজকাল শিক্ষিত সমাজে যৌতুক নেওয়ার কোনো প্রবণতা চোখে পড়ে না। তারা যৌতুক না নিয়ে কণে পক্ষ থেকে দাবী করে বসেন বাহারি গিফ্ট!

এবার আসা যাক, পাত্রপক্ষের কথায়। কন্যা সন্তানের ন্যায় জন্মের পরপরই পুত্রসন্তানকে বিয়ের হতাশা না ছুঁলেও, পরিণত বয়সে ঠিকই হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়। চাকরির বাজারে মন্দা। আশানুরূপ চাকরি ছাড়া যেন কোনো ছেলে পাত্র হিসেবেই গণ্য হয় না। চাকরির দেখা পেতে পেতেই বয়স পৌঁছে যায় ত্রিশের কোটায় বা তারও উর্ধ্বে। চাকরি পাওয়ার পরই সে যোগ্য পাত্রের সারিতে স্থান পায় না , যতক্ষণ না তার পকেট গরম হয়। অর্জন করতে হয় বিয়েকে সর্বোচ্চ বিলাসবহুল করার সামর্থ্য। এবার টাকার পেছনে ছোটার পালা। ততদিনে হতাশায় টাক ধরে মাথায়। অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাবিনের টাকার দৌরাত্ম্য, কণের গা ভর্তি গহনার জোগাড় আরো আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে বেপরোয়া ছুটতে হয় তাদের।

কিন্তু বিয়ে কেন হবে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র? যেখানে বিয়ে হলো সমাজের ধারক ও বাহক, সেখানে বিয়ের স্বপ্ন কেন আতঙ্ক ছড়াবে যুবসমাজে? বিয়ে যেন দিন থেকে দিন কঠিনতর হয়ে পড়ছে। অথচ বিয়ের প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল কতো সহজ! বিয়ে কঠিন হওয়ার ফলে সমাজে পড়ছে তার কুপ্রভাব। যুবসমাজ হচ্ছে বিপথগামী; পা বাড়াচ্ছে অসৎপথে; জড়িয়ে পড়ছে বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্কে; বাড়ছে গর্ভপাত; ডাস্টবিনে পাওয়া যাচ্ছে নবজাতকের নিথর দেহ।

অথচ আমাদের একটু সদিচ্ছাই পারে সমাজের এহেন রূপ পাল্টে দিতে। যার যার সাধ্য মতো ছোটখাটো আয়োজন, কম খরচের মধ্যেই বর-কণের সাধাসিধে সাজসজ্জা, কাছের কয়েকজন পরিজনের দোয়া আর ভালোবাসাকে পুঁজি করে পারিবারিকভাবে কত সহজেই একটি অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা যায়। কোনো প্রকার আর্থিক চাপ ছাড়া যার যতটুকু সামর্থ্য, ততটুকুতেই বিবাহকার্য সম্পাদন করা উচিত। কী দরকার অহেতুক লোক দেখানো আভিজাত্য প্রদর্শনীর? নানা বাহারের নানা ঢঙের ফটোগ্রাফি কিংবা সিনেমাটোগ্রাফি ফেসবুকে শেয়ার করে লাইক-কমেন্টে সিক্ত হওয়াই কি বিয়ের মূল লক্ষ্য? অবশ্যই না।

অর্থ-বিত্তের দাম্ভিকতা প্রদর্শনের ক্ষেত্র না হয়ে, বিয়ে হোক দুটি প্রাণের ভালোবাসা মিশ্রিত মিলন মেলা। বিয়ে যেন কোনো পিতার সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্প রচনা না করে। আমরা চাইলেই লোক দেখানো সকল প্রকার কৃত্রিমতা বর্জন করে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে উপভোগ করতে পারি আমাদের বিবাহ অনুষ্ঠান। ব্রাইডাল মেকাপে নিজেকে আড়াল করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্যামেরার সামনে পুতুল সেজে বসে না থেকে কাজল রাঙা টলটলে চোখ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বিয়ের প্রতিটা আবেগ মাখা মুহূর্তকে একান্তই নিজের করে নিতে পারি। বিয়েতে হয়ত থাকবে না অহেতুক ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যপূর্ণ সাজসজ্জা, কিন্তু সেখানে বিরাজ করবে পারিবারিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ এবং মনের প্রশান্তি,থাকবে বুক ভরা সুখের কান্না। চাইলেই প্রিয় কাউকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদা যাবে, পাশ থেকে কেউ বলবে না, “কাঁদিস না মেকাপ নষ্ট হচ্ছে।” কান্নাগুলো বুকের ভেতরটায় দুমড়েমুচড়ে চাপা বিলাপে মুখ থুবড়ে পড়ে রইবে না, বরং ছড়িয়ে যাবে প্রিয়জনদের চোখ থেকে চোখে, ঝংকার তুলবে অন্তর থেকে অন্তরে। এ যে বড় সুখের কান্না! প্রাপ্তির কান্না!

তাই এটাই প্রার্থনা, বিয়ের মতো আনন্দপূর্ণ পবিত্র উৎসব যেন অসুস্থ প্রতিযোগিতার বলি হয়ে তার স্বকীয়তা হারিয়ে না ফেলে । মানব মনে ফোটা বিয়ের ফুল যেন চোখে সর্ষে ফুল দেখার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক: সুমনা মৃধা; শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।