বিশ্ববিদ্যালয় বদলে গেলে বদলে যাবে দেশ!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৮:০৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১০, ২০১৯

—————

কথায় আছে, যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যত বেশি মানসম্মত সে দেশ তত বেশি উন্নত। বিশ্বের প্রতিটি দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় একটি দেশের প্রশাসনিক থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনার সকল ক্ষেত্রেই নিজের আসনটি দখল করে নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই হয় দেশের কর্ণধার। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব থাকে তাদের হাতেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন ও দেশ পরিচালনায় অতুলনীয় ভূমিকার কথা চিন্তা করলেই দেখা যায় এর পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তেমনি আমাদের দেশেও সেটা অস্বীকার করার পথ রাখেনা।

তবে এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়; সেটা হলো” অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও উন্নয়ন ও দেশ পরিচালনায় অতুলনীয় ভূমিকা রাখছে কিনা??”উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলে যদি নিজেকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রীক দুর্নীতিমুক্ত স্বাবলম্বী দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে দেশের শিক্ষা ও উন্নয়ন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে এমন দুর্নীতি কেন? অরাজকতা হানাহানি মারামারি কেন মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী। তবে কেন জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবী সনি আবরারের লাশের মিছিলে সমবেত হয়ে কোটি জনতাকে হতে হয় জঙ্গি। আর যদি উত্তরে বলি ‘না’ তাহলে দেশের একজন সুক্ষ্ম নাগরিক হিসেবে একটি প্রশ্ন করার অধিকার রাখি! প্রশ্নটি হচ্ছে কেন ‘না’?অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন বড় বড় দালান অট্টালিকা প্রশস্ত ভূমি পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ অভিজ্ঞ শিক্ষক শিক্ষা সংস্কৃতি ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী সবকিছুই তো আছে তাহলে ‘না’ বলবো কেন? তাহলে মনে হয় দেশের উন্নয়নের কথা বাদ দিয়ে দেশ পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাঠামোর কথা ভাবলেই হয়। ফিরে আসি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অবস্থানে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কিন্তু আইন আছে তবে হয়তো সব আইনের কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রেই নেই। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া বুয়েটের কথা আমরা চিন্তা করি, বুয়েট প্রশাসনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বুয়েট ক্যাম্পাসে ২০০২ সালে ছাত্র রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকারিতা নামে যে একটা কথা আছে তা হয়তো গঠনতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই যুগে যুগে রাজপথে নামতে হবে ছাত্রসমাজকে। প্রত্যুষে রাজপথে অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করে সূর্যাস্তে ফিরবে ঘরে প্রাণ দিয়ে কেউ বা অর্ধপ্রাণে খালি হাতে।

ঘুরে আসা যাক দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়। কি বলবো আর এদের কথা ত্রিশ বছরেও দেখিনা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাথা। মাঝে মাঝে যদিও দেখি শিক্ষক সমিতির নির্বাচন, নির্বাচিত যেই হোক না কেন বেঁধেছে সিলেকশনের পণ। তাইতো দৈনিক পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি বহু উপাচার্যের কালোমুখ। কেউবা দুই একরের বহুতল প্রাসাদে বসে শিক্ষার্থীদেরকে গণরুম নামে গণকারাগারে ৫/৬ জনের আসনে ২৫/৩০ জনকে আবার কাউকে নবাব হলের বারান্দায় বৃষ্টিতে ভিজে – রৌদ্রে পুড়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকলে ঘুম চোখে ক্লাসে পাঠিয়ে মিডিয়াকে বলবে শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে এটায়তো তাদের বাড়ি। ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে দুইজনের মৃত্যু ও শতাধিক হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন অথচ সেই বিদ্বান বলে বেড়াচ্ছেন ১০-১২ জন সামান্য অসুস্থতায় ভুগছেন। আরেকজন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমির শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বশেমুরবিপ্রবিতে বসে দেশের ইতিহাসে ২৫ মার্চের ২য় কালোরাত সৃষ্টি করেছেন। হাজারো জ্ঞান পিপাসুদের প্রশ্নের( স্যার, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি?) উত্তরে তিনি বলেছেন তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস কর! আপনার মতো একজন বিজ্ঞ উপাচার্যের অজ্ঞাত জবাবে শিক্ষার্থীরা সত্যিই সন্তুষ্ট।অন্য একজন দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী উপাচার্য হয়ে নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নোবেল বিজয়ী ঘোষণা দিতে দেশের অন্যতম একটি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে মন্ত্রণালয়ে ন্যায় ও অভিজ্ঞ উপাচার্যের পরিচয় দিয়েছেন। অন্যদের কথা আজকে আর উল্লেখ নাই বা করলাম।

অধ্যাপকদের কথা আর কি বলবো স্নেহ মায়া মমতা আর ভালোবাসার সাথে শিক্ষা দিয়ে আপন কর্তব্য টুকু পালন করে মা বাবার আসনে সমাসীন হয়ে অতুলনীয় ভূমিকা রাখছেন তারা। তবে দুই একজনের কথা না বললেই নয়; যারা ক্যাম্পাসে চিরপরিচিত মুখ। নিজের নামের ডিগ্রির সুবাদে শিক্ষার্থীর অন্তরে মানবরূপী কালসাপের ভীতি জন্ম দেয়। ক্যাম্পাস,অনুষদ কিংবা ডিপার্টমেন্টের কোনো আইন না মেনে ইচ্ছা মত নিজেকে লালন করে। ক্লাস রুটিন কেবল নোটিশ বোর্ডেই মানায় বেশ। মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের মত শিক্ষকরাও এটেনডেন্সের উপর ঝুঁকে পড়ে। সপ্তাহে একদিন এসে ঘন্টায় ৪-৫ টা এটেনডেন্স নিয়ে মাত্র দুই ঘণ্টায় শিক্ষার্থীদের কে সেমিস্টার পরীক্ষার উপযোগী করে তুলে। এর কারণ স্বরুপ জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬০% শিক্ষক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নামধারী সুনামধন্য প্রভাষক।

এমন যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের অবস্থা তাহলে দেশ পরিবর্তনে সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কেমন হবে? শিক্ষা যদি হতো মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে তাহলে হয়তো অরাজকতা আর এমন অনৈতিকতার কারাগার থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পেতাম। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে প্রহসনহীন নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়োগ, শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরকে দায়িত্বে একনিষ্ঠ, নৈতিক ও মূল্যবোধ সম্পন্ন, উপযুক্ত কাউন্সিলিং এবং প্রশাসনকে গঠনতন্ত্রের উপর অন্ধবিশ্বাসী হতে হবে।

নিজের সুক্ষ্ম অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলতে যাই তাহলে মনে হয়,, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থীই জ্ঞান, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা ছাড়া আসে না কিন্তু যাওয়ার সময় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা ছাড়াই জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে যায়।এর অন্যতম কারণ মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আইনের প্রতি অবহেলা। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অনিয়মতান্ত্রিক চলাফেরা, অসামাজিক কার্যকলাপ, অনৈতিক আড্ডা, মূল্যবোধহীন আচারণ করাসত্ত্বেও প্রশাসনের কোন কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকা। আরেকটি কারণ বলা যায় আবাসিক সমস্যা। প্রথম বর্ষে ভর্তির পর থেকে আবাসন সংকটের মুখোমুখি হতে হয় সকল শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী উঠে আসে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের। তাই অনেকে আবাসিক হলে উঠতে বাধ্য। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী কে অবৈধ বলে হলে সিট না দেওয়ায় কোনো এক ছাত্র সংগঠনের অধীনে হলে উঠতে হয়।ফলে বিভিন্ন প্রকার অনৈতিক কাজ রাজনৈতিক প্রটোকল গেষ্টরুমের অসহনীয় নির্যাতন র্যাগিং সহ অনেক অসহনীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক সমস্যায় ভোগেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী। এমতাবস্থায় অনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সহ নানান সমাজবিরোধী কাজ করতে দেখা যায় অনেককেই। অনেক বিশ্লেষক এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ধারণা; হলের গেষ্টরুম – গণরুম প্রথার কারণেই চরিত্রহীন অশ্লীল আচরণ করতে দ্বিধাবোধ করে না শিক্ষার্থীরা।

উত্তরণের জন্য- প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ভর্তির সময় হল এট্যাচ এর সাথে সিট বরাদ্দ করে ১ম বর্ষ থেকে সকল শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনকে গণতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করতে হবে। যাতে ছাত্র সমাজের” বৈধ সিট আমার অধিকার” বলে আর রাজপথ কাঁপাতে না হয়। যাতে কোলশূর্ণ না হয় সনি আবরারের মায়ের মতো অন্য কোন মায়ের। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যাতে চরিত্র আর মূল্যবোধ হারাতে না হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আজকের পাবলিকিয়ান আগামী দিনের কর্ণধার। তাঁরাই আগামী দিনে নেতৃত্ব দিবে দেশ এবং জাতির। দেশের প্রশাসনিক সকল বিভাগের দায়িত্ব থাকবে তাদের হাতেই।তাই তাদের অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও সম্মানিত শিক্ষকগণ , দেশের প্রশাসন যদি আইন ও আইনের আওতায় সকল শিক্ষার্থীদের আইনের আওতাধীন রেখে সর্বক্ষেত্রে যোগ্য করে গড়ে তোলতে পারে তাহলে আগামী দিনে দেশের নেতৃত্বে গিয়ে দেশকে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের কে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করবে।

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারে, দেশের পরিবর্তন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তন কি আদৌ সম্ভব? হ্যাঁ,এই প্রশ্নটা আমার ও ছিল। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই দেখা যায় দেশের পরিবর্তন এতটা সহজ না যতটা সহজ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন করা। তাই প্রয়োজন আগে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন করা।আর বিশ্ববিদ্যালয় বদলে গেলে দেশ স্বল্প সময়ে বদলে যাবে।

এক্ষেত্রে সকলকে দেশের পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আইনের যথাযোগ্য মর্যাদা, সুষ্ঠু কাউন্সিলিং, জনসচেতনতা, যথাসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন, দেশের সকল নির্বাচনে প্রহসনহীনতা ও সর্বক্ষেত্রে সকলের জন্য আইনের কার্যকারিতা, দেশকে উন্নত ও দুর্নীতিমুক্ত ঘোষণা করতে সর্বক্ষেত্রে সকলের সুষ্ঠু অংশগ্রহণেই পারে দেশকে উন্নত বিশ্বের সাথে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে। পরিশেষে দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সকল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরকে বলবো;”আপনারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে বদলে দিন ; আমরা তরুণ ছাত্রসমাজ গোটা দেশকে বদলে দিব।

—————-
আব্দুজ জাহের নিশাদ
শিক্ষার্থী: সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।