বাল্যবিবাহ থেকে দেশ ও জাতি কবে মুক্তি পাবে?

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১০:২৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২০

—————–
কোন দেশ বা জাতির নিজস্ব একটি পরিচয় থাকে,সেই পরিচয় জাতিই সৃষ্টি করে।
আর মানুষের কর্ম দ্বারা দেশটি পরিচিতি লাভ করে।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।তখন থেকেই বিশ্বের দরবারে বাঙালিরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উচু করে দাঁড়ায়।বর্তমানে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার কল্যাণে শিক্ষা,সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল আয়ের দেশ। সাক্ষরতার দিক থেকেও অনেক অগ্রসর হয়েছে(৭৩.৯%)বঙ্গবন্ধু তনয়া ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েছেন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।ক্রমে ক্রমে বাঙালিরা শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে উন্নত সভ্য জাতির দিকে অগ্রসরিত হচ্ছে।সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কিন্তু বাঙালি জাতি বাল্যবিবাহের মত কুসংস্কার থেকে কবে বের হবে?

হুকুর হুকুর কাশে বুড়া,হুকুর হুকুর কাশে,নিকার নামে হাসে বুড়া, ফুকুর ফুকুর হাসে।
বাল্যবিবাহের প্রতি নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী বেগম রোকেয়ার কটাক্ষময় ছড়াটি।মূলত এটি আমাদের সরস আনন্দ প্রদান করলেও এই হাস্যরসের পেছনে রয়েছে নারীর দূর্বিষহ জীবনের মর্মযাতনা।
বাল্য বিবাহঃ বাল্য মানে শিশু বা কিশোর-কিশোরী। সাধারণত ২১ বছর পূর্বে এবং ১৮ বছরের নিচে ছেলে-মেয়েদের শিশু বা কিশোর-কিশোরী বলে।অর্থাৎ শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনকে বাল্যবিবাহ বলে(তবে,২০১৫ সালে সরকার নীতিমালা সংশোধন করে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর রাখলেও ১৬ বছর বয়সে পরিবার চাইলে আদালতের সম্মতিতে বিয়ে দিতে পারবেন) বাল্যবিবাহ একটি কুসংস্কার।বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫২%(২০১১ সালের জরীপ অনুযায়ী কিন্তু ইউসেফ বলেছে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫৯%) বিশ্বে বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থতম এবং সখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয়তম।তবে বাল্যবিবাহের হার শহরাঞ্চলে কম হলেও গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব প্রকট।বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ৬৬ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার পূর্বেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে(‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ প্রতিবেদন) বাংলাদেশে নারীর বিয়ের গড় বয়স ১৫ বছর ৩ মাস থেকে ২৪ বছর৷ আর যাঁদের ১৮ বছরের মধ্যে প্রথম বিয়ে হয়েছে তাঁদের শতকরা হার ৬৫ ভাগ৷ বাল্যবিবাহের শিকার শতকারা ৮০ ভাগ নারীরা স্বামী কতৃক নির্যাতিত হচ্ছেন৷ এছাড়া এ সব নারীর শতকারা ৬০ ভাগ শিশু জন্মগত নানাবিধ রোগ ও প্রতিবন্ধিতার শিকার হচ্ছে৷ বর্তমানে ৬৬ শতাংশের এক তৃতীয়াংশ মা ১৯ বছরের হওয়ার আগেই গর্ভবতী হচ্ছেন(বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক সার্ভে অনুযায়ী)
নারী ও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘১৮ বছরের আগে একটি মেয়ের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পূর্ণতা পায় না৷ এ জন্যে ১৮ বছরের পর্যন্ত একটি মেয়েকে শিশু বা কিশোরী বলা যায়।

বাল্যবিবাহের কারণ ও শাস্তিঃ মুলত বাল্যবিবাহ দরিদ্রতা,যৌতুক,সামাজিক প্রথা,বাল্যবিবাহ সমর্থনকারী আইন,ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ,অঞ্চলভিত্তিক রীতি,অবিবাহিত থাকার শঙ্কা,নিরক্ষতা ও মেয়েদের উপার্জনে অক্ষম ভাবা ইত্যাদি কারণে হয়ে থাকে। একুশ এবং আঠার তদূর্ধ্ব বছর বয়সের পুরুষ বা নারী কোন অপরিণত(২১ বছরের কম ছেলে এবং ১৮ বা প্রস্তাবিত ১৬ কম কোন মেয়ে) কিশোর- কিশোরীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্হাপনের চুক্তিবদ্ধ করলে সেই ব্যাক্তির দুই বছরের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা দণ্ডে-দণ্ডিত হইবে।আবার বাল্যবিবাহ অনুষ্ঠান পরিচালনাকারীর এবং পিতামাতার উভয় একেই দণ্ডে-দণ্ডিত হইবে।

বিশ্বের উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই,অনেক অগ্রসর হয়েছে।শিক্ষার দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে(বর্তমানে বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার ৭৩.৯% এবং নারী শিক্ষার হার ৭১.২%) যে দেশে শিক্ষার হার ৭৩.৯% থাকে সেই দেশে বাল্যবিবাহের হার ৫৯% কিভাবে থাকতে পারে?
আমরা শিক্ষা ও অর্থনৈতিক দিকে যেমন অগ্রসর হইতেছি এবং কুসংস্কারেও তেমন হইতেছি।এই বাল্যবিবাহের জন্য নারী শিক্ষা হ্রাস পাচ্ছে এবং নারীরা তাদের অধীকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যদিও বাল্যবিবাহ দেওয়া এক ধরনের যৌন নির্যাতনের মধ্যে পড়ে কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এই চরম সত্যটি অস্বীকার করেন।যদি কোন ব্যাক্তি কোন শিশু বা কিশোরীর ইচ্ছায় তার সাথে যৌন-সঙ্গম করে তাহলে ওই ব্যাক্তিকে ধর্ষক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তাহলে বাল্যবিবাহের ধর্ষকের দায় কে হবে- এই সমাজ না কি তার পরিবার?

পরিশেষে বলি,বাল্যবিবাহ একটি ব্যাধি।এটি মহামারী আকার ধারণ করেছে।এর ভীত স্তম্ভ উপড়ে ফেলতে হবে।যাতে এই কুসংস্কার প্রকট আকার ধারণ করতে না পারে।এই কুসংস্কার,অজ্ঞতা,মূর্খতা ও গোড়ামীর জন্য বঙ্গবন্ধু দেশটাকে স্বাধীন করেন নি।তিনি সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন।এই ধারাবাহিকতায়
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা বলেন ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নীচে মেয়েদের বিবাহ বন্ধ করা হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সব ধরনের বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে।বাল্যবিবাহের মত মহামারী থেকে রক্ষা করার একমাত্র মূলমন্ত্র হলো সুশিক্ষা।কেবল শিক্ষাই পারে সকল প্রকার অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দিতে।আমাদের দেশ ও ভবিষ্যৎ জাতিকে রক্ষা করতে হলে বাল্যবিবাহ রোধ করা একান্ত প্রয়োজন।তাই আসুন,আমরা সকলেই এগিয়ে আসি।আমরা আছি না বলে আমি আছি বলি।তাহলে বাল্যবিবাহের মত জঘন্য আপরাধ থেকে এদেশ এবং জাতি মুক্তি পাবে।আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দর-সুষ্ঠু একটি দেশ ও জাতি উপহার দিতে পারব।
—————
লেখিকা – মুসকান শেখ নয়না।
শিক্ষার্থী – ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।