বাবা দিবসে আমার বাবা!!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১১:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

———–
‘বাবা’ মাত্র দু’টি বর্ণ মিশ্রিত একটি শব্দ। কিন্তু বর্ণ দু’টির কাঠামোতে কত যে বিশালতা জড়িয়ে আছে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো বলে বোধগম্য হচ্ছেনা। তবুও এই আঠারো বছর এর ছোট্ট জীবনপ্রবাহ থেকে কিছু শব্দ কুড়িয়ে বাবা’র জন্যে মালা গাঁথার চেষ্টা করছি।

বাবা, শুনেছি তুমি নাকি প্রায় সময় তোমার সহযোগীদের বলো, “আমার ছেলে পড়ালেখা করছে। বড় হলে চাকরি-বাকরি করলে আমার বোঝা খানেকটা হালকা হবে”। হ্যাঁ, বাবা। তোমার সেই ছেলে আজ লিখতে বসেছে তোমায় নিয়ে। তুমি পড়বে কি আমায়? বলো, একবার। তোমাকে কি শুনাতে পারবো আদৌ অব্যক্ত সব কথা? জানি বাবা, তুমি পড়বেনা বা তোমার সেই সুযোগ হবেনা। কারণ, তোমাকে হয় পড়ে শুনাতে হবে নয়তো সব কথা বুকে চেপে আমৃত্যু ধারণ করতে হবে।

আমি কে জানো, বাবা? ওই যে ছোট থাকতে হেফজ খানায় যাচ্ছিলাম না বলে তুমি টানতে টানতে নিয়ে যেতে চাইছিলে? কিন্তু আঁটে লুঙ্গি পেঁচিয়ে পরে তোমার নিঃশ্বাস আটকে গেছিলো? চারদিকে আর্তনাদে ভেঙ্গে পরছিলো? হ্যাঁ, আমিই সেই তোমার অবাধ্য ছেলে। দিব্যি সেদিনের ঘনঘটা মুহূর্তটি এখনো হৃদয়ে খচিত আছে। ধাপেধাপে আঠারো বছরে পদার্পণ করলেও কখনো তোমার কাছে তার জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়নি! একটা ‘সরি’ও বলা হয়নি। জানি তুমি এখনো বুকে সেইদিন এর ব্যথা অনুভব করো। পল্লী চিকিৎসক এর পরামর্শে মাঝেমাঝে ওষুধ খাও। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক এর শরণাপন্ন হওয়ার মতো সক্ষমতা নাই। তবুও তুমি দিন পার করছো কত হাসিতে। মাঝেমাঝে ব্যথাতুর হলেও কখনো আমাকে টুঁ শব্দ করোনি। বরং ভালোবাসার পরিমাণটা আরো বাড়িয়ে দিলে। জীবন এর দায়িত্বটা এখনো বহন করে চলছো প্রতিনিয়ত। আমাদের পরিবার এর ০৯ জন সদস্যের ভরণপোষণ মাথা পেঁতে নিয়ে জীবন পার করছো। সকাল থেকে সন্ধা অবধি কত পরিশ্রম করে যাচ্ছো। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের পেটে খাবারটুকু জোগাড় করে দাও প্রতিদিন।

বাবা, তুমি আমার চোখে সবচেয়ে বড় আর্টিস্ট, বৈচিত্র্যময় রং মেশানো শিল্পকার, অনেক দক্ষ একজন অভিনেতা। অন্যথায় আমাদের পক্ষে এই কঠিন পৃথিবীতে বেড়ে উঠা, মানুষ হওয়া কোনভাবেই সম্ভব ছিলো না। সব বাঁধাকে বোকা বানিয়ে, শক্ত বাতাসের গতিপথ উপেক্ষা করে, শ্রোত এর বিপরীতে গিয়ে তুমি আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছো। কত শক্তিশালী ও কৌশলী চালক হলে এতকিছু সম্ভব, বাবা? তা আমার ক্ষুদ্র চিন্তায় সাঁই দিচ্ছেনা।

আমি জানি, স্পষ্ট করে জানি তুমি জীবনে অনেক ধাক্কা খেয়েছো। একটা না, দু’টো না বরং বহুবার তুমি ধাক্কা খেয়েছো। আর প্রতিটা ধাক্কার তীব্রতা কতটা নিষ্ঠুর ছিলো, কতটা ভয়ঙ্কর ছিলো, কতটা নাজুক ছিলো তা আমি কল্পনায় বাঁধতে পারছিনা এই মুহূর্তে। কিন্তু তুমি কী একবারও ভেঙ্গে পড়ছো? না তো! বরং ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার হাতে নিয়েছো দাঁড়, আমাদের বয়ে চলছো সব ঢেউ ডিঙ্গিয়ে, পাড়ি দিচ্ছ কতশত আকাবাকা পথ! স্বপ্নের সিঁড়িতে তুলে দেওয়ার তীব্র প্রচেষ্টা এখনো অমলিন, উজ্জ্বল এবং প্রখর।

বাবা, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি পেশাগত কারণে তুমি বাহিরে থাকো। সপ্তাহে এক বা সর্বোচ্চ দু’দিন বাড়িতে থাকার সুযোগ মিলে। এই তো আজকেও ভারি বর্ষণ এর মাঝে তোমার দোকানে পানি উঠার সম্ভাবনা ছিলো বলে দুপুরে না খেয়ে রওয়ানা দিলে, তা সত্যিই হৃদয়বিদারক। তোমাকে এতোটা অনুরোধ করার পরেও তুমি বললে, “ভাত খেতে দুই মিনিট দেরি হলে যদি আমি গাড়ি না পাই, বা পৌঁছাতে না পারি?” এই কথাটি শোনার পর তোমাকে দ্বিতীয়বার খেতে বলার মতো সাহস খোঁজে পায়নি। পরে যখন ফোনে জিজ্ঞেস করলাম তখন বললে, ভাত খেতে বসলে তুমি গাড়ি পেতেনা বা পৌঁছাতে পারতে না। হ্যাঁ, বাবা এ’রকম শত দৃষ্টান্ত তুমি আমাদের মাঝে স্থাপন করলে। অথচ, তোমার জন্য আদৌ কিছু করতে পারলাম না। তবুও তোমার মাঝে কখনো ভালোবাসার ঘাটতি দেখিনি। সারাদিন রোদে পুড়ে, হাঁড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে আমাকে পড়ালেখার জোগান দাও, সাহস জোগাও, একমাত্র সারথি হও তা সবকিছু উজ্জ্বল হয়ে আছে, বাবা।

বাবা তুমি যেদিন রাতে বাড়িতে আসো, ওইদিন ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে এই বোকা ছেলেটা রাত জাগে তোমার অপেক্ষায়। কাউকে ঘুমুতে দেয়না তুমি বাড়ি পৌঁছা অবধি। আঠারো বছরে পা দিলেও সাত বছরের বাচ্চার মতো হা করে চেয়ে থাকি, তুমি আসবে, নাস্তা আনবে এগুলো খুলবো, একসাথে খাবো এবং তুমি নিজ হাতে খাওয়াবে, গল্প করবো আরো কতকিছু। আমাকে ছাড়া খেতে না বসা এবং সব থেকে ভালোটা নিজে না খেয়ে আমার থালায় তুলে দেওয়া এসব তো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় তোমার জন্যে। রাতে ঘুমালে তুমি এসে মশারি টাঙ্গাই দেওয়া, চারিপাশ কম্বল মুড়িয়ে দেওয়া আরো কতশত স্মৃতি এই ঠুনকো হৃদয়ে খুদাই করা আছে, বাবা।

মাঝে মাঝে একটা সময় যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগী তখন কারো পরামর্শ খুব জরুরী হয়ে পড়ে। সে সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো আদর্শ একজন মানুষ হলে তুমি। কিন্তু, স্বভাবগত গাম্ভীর্যের জন্য তোমার সাথে ঘনিষ্ঠতা একটু কম। তবুও আমাদের প্রতি তোমার ভালোবাসার কোন কমতি নাই। একটু সাহস করে তোমার পাশে গেলেই হয়তো আরো স্পষ্টভাবে বুঝবো, তোমার মতো বন্ধু পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।

বাবা, তুমি প্রায় সময় বলো, চলার পথে সাবধান হতে, কখনো কারো সাথে প্রতারণা না করতে, সৎ পথে অটল থাকতে ইত্যাদি। কিন্তু, তোমার দেওয়া পরামর্শ মতে জীবন চালাতে পারিনা বরং বারবার ব্যর্থ হয়। কিন্তু কেন এমনটা হয়? তা বুঝে উঠতে পারছিনা।

বাবা, তুমি আমার বটবৃক্ষ, নিদাঘ সূর্যের তলে অমল-শীতল ছায়া। বাবা, তুমি শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন। তুমি মানে নির্ভরতার আকাশ আর নিরাপত্তার চাদর। বাবা, তোমার তুলনা আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে দেখছিনা।

আগামী ২১শে জুন বিশ্ব “বাবা দিবস”। ওয়াশিংটন এর ভদ্র মহিলা ‘ডড’ এর উদ্যোগে ১৯১০ সালের ১৯শে জুন বাবা দিবস পালিত না হলে, আজ মন খোলে অব্যক্ত সব বচন বলা হতোনা, এই ক্ষুদ্র হাত অলস রয়ে যেতো। তোমায় নিয়ে গল্প লেখা হতোনা, কবিতা আবৃতি হতোনা, গান গাওয়া হতোনা। কিন্তু, আজ সবটা হচ্ছে। সেই ভদ্রমহিলার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি।

বাবা, বিগত ১ সপ্তাহ তোমায় নিয়ে ভেবেছি। এই জীবনের অন্তরালে তোমার অবদান এর স্বীকারোক্তি নিয়েছি। তারপর লিখতে বসেছি। বাবা লাখো মানুষকে সামনে রেখে বলছি, “ক্ষমা করো আমায়”। বিশ্বাস করো তোমাকে অনেক বেশ বেশি ভালোবাসি, বড্ড বেশি ভালোবাসি। প্রতিনিয়ত তোমায় হারাবার ভয় বুকে চেপে হাঁটি। কারণ, তোমার ক্ষয় পূরণের মতো শক্তি বা উৎস কোনটাই আমার নেই। বেচে থাকো তুমি অনন্তকাল। বেচে থাকুক পৃথিবীর সব বাবা। সকলের প্রতি “বাবা দিবসের” পরম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অন্তিম শুভেচ্ছা।
———
শাহরিয়ার মোহাম্মদ ইয়ামিন
কক্সবাজার সরকারি কলেজ