ফতোয়া দেয়ার অধিকার সকলের জন্য অবারিত নয়-জিয়া হাবীব আহসান

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

—————

ফতোয়া দেয়ার অধিকার সকলের জন্য অবারিত বা উন্মুক্ত নয় বরং যিনি ফকীহ্ বা মুফতী কেবল তিনিই ফতোয়া দেয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেন। ফতোয়া বিভাগের সনদপ্রাপ্ত আলেম ছাড়া যে কোন কেউ ফতোয়া দিতে পারবেন না, এটা কোরআন সুন্নাহ পরিপন্থী ও বেআইনী। এতে ফেৎনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি ও সামজিক শৃংখলা নষ্ট হয়। আইন বিষয়ে ডিগ্রী এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ আইনজীবী ছাড়া যেমন কেউ আইনগত অভিমত দিতে পারেন না, এম.বি.বি.এস পাশ করা চিকিৎসক ব্যতিত যেমন চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দেয়া বেআইনী তেমনি যে কোন ব্যক্তি বা আলেম ইসলামী শরিয়ার ব্যপারে মনগড়া ফতোয়া দেয়া চরম ধৃষ্ঠতা ছাড়া আর কিছুই নয়। মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে ফতোয়া জারির জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বাফতোয়া বোর্ড রয়েছে। শরিয়তের বিষয়ে যে কোন সমস্যা সমাধানে বা নীতি নির্ধারণের প্রয়োজন হলে উক্ত বোর্ড বা কাউন্সিল বিষয়টির ব্যাপক বিশ্লেষন ও পর্যালোচনার পর ফতোয়া দিয়ে থাকেন। এটা এক ধরনের আইন সম্মত বা শরীয়া সম্মত অভিমত / মতামত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও ও সত্য যে সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় কতিপয় ব্যক্তি নিজ পেশায় সফল না হয়ে কিছু কোরআন হাদীস সাহিত্য অধ্যয়ন করে নানা জটিল বিষয়ে ফতোয়া, মতামত ও সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। তারা এতই ধৃষ্ঠতা দেখাচ্ছেন যে, খোলাফায়ে রাশেদীন (রা:), সম্মানিত তাবেঈন ঈমামে আযম সহ ইসলামের ইতিহাসের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের প্রদত্ত সিদ্ধান্ত ও ফতোয়াকেও ভুল মর্মে প্রচার করে উম্মাহর মধ্যে নানা ভুল বুঝাবুঝির অপপ্রয়াস চালিয়ে ফেৎনা ফ্যাসাদ সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। ইংরেজি ভাষী কিছু নও মুসলিম, ডাক্তার, প্রকৌশলী, মুদি দোকানদার প্রমুখ কর্তৃত্বহীন ব্যক্তি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফেইসবুক, টুইটারে এসব মনগড়া ফতোয়া ছড়িয়ে দিয়ে আধুনিক শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের ঈমান আক্বীদা-বিশ্বাসে নানা প্রশ্নের অবতারনা করছে। কোরআনের কোন আয়াত ও কোন হাদীস কোথায় কি প্রসংগে ব্যবহার হয় বা হবে তা না জেনে যেখানে সেখানে ইচ্ছামত তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে অল্প জ্ঞান ও অল্প বিদ্যা ভয়ংকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব ফতোয়াবাজদের রুখতে এদেশের হকক্বানী আলেম,পীর মাশায়েখদেরকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। যাতে করে কিছু ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করেই যে কোন ব্যক্তি শরিয়তের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া দিতে না পারেন। ফতোয়া কঠিন একটি বিষয়। বিভিন্ন ধর্মের সাথে ইসলামের তুলনামূলক আলোচনা করা, ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সুন্দর সুন্দর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন, লেকচার দেয়া ও কথা বলা আর ফতোয়া দেয়া এক জিনিস নয়। ৪ ঈমামের রচিত ফতোয়া গ্রন্থ গুলো সারা বিশ্বে সমাদৃত। গভীর অধ্যবসায়, চিন্তা সাধনা, বিচার, বিশ্লেষন, পর্যালোচনা ও ইজমা কিয়াসের মাধ্যমে ফতোয়া প্রদান করা হয়। যে কোন জ্ঞানী ব্যক্তি বা আলেম ফতোয়া দেয়ার ক্ষমতা রাখেন না, সেখানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মুদি দোকানদার, ঠিকাদার সবাই ফতোয়া দেয়া শুরু করেছেন। এক ডাক্তার ফতোয়া দেন, এলএল.বি পড়া জায়েজ, ওকালতি করা নাজায়েজ। তার এ অদ্ভূত মনগড়া ফতোয়া নিয়ে আদালতে মামলা মোকদ্দমারও সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ঐ ডাক্তার সাহেব তাঁর ফতোয়া প্রত্যাহার করেন এবং ওকালতি পেশা জায়েজ মর্মে ঘোষনা দেন। তিনি নিজেও নিজের মামলা মোকদ্দমায় আইনজীবী নিয়োগ দেন। এধরনের হট্টগোল সৃষ্টিকারী যে কোন মনগড়া ফতোয়া প্রদান করা ঠিক নয়। কেননা ইদানিং একটি মহল মুসলমানদের ব্যক্তিগত ইবাদত বন্দেগী নিয়ে নানা নতুন নতুন ফতোয়াবাজী শুরু করেছে । যা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর ও সামাজিক শৃংখলা বিনষ্টকারী। ফতোয়ার উৎস ৪টি- (ক) কুরআন (খ) সুন্নাহ (গ) ইজমা এবং (ঙ) কিয়াস। এগুলো বাদ দিয়ে ফতোয়ার কথা চিন্তাই করা যায় না। সুতরাং মুফতি বা ফক্বীহ ছাড়া অন্য যে কোন ব্যক্তির অদ্ভুত ফতোয়া বে-আইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষনার দাবী জানাচ্ছি। ফতোয়া দেয়ার এখতিয়ারে কোন বিতর্ক চাই না, জটিলতাও চাইনা। স্বামীকে স্ত্রী তালাক দিলে মোহরানা, খোরপোষ পাবে না, গ্রামে গ্রামে এখনও এমন ফতোয়া চালু আছে। নারী আর গরিব মানুষ এসব মনগড়া ফতোয়ার করুন শিকার। ইসলামের আলোকে সঠিক ফতোয়া পাওয়া গেলে নারীরর অপমান বন্ধ হবে, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। কর্তৃত্ববিহীন ফতোয়া বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। কর্তৃত্বহীন মনগড়া ফতোয়ার শিকার হয়ে এদেশে বহু নিরীহ মানুষকে প্রভাবশালীদের কাছে অপমান, অপদস্থ কিংবা জীবন দিতে হয়েছে। আমরা চাইনা ফতোয়া নিষিদ্ধ হউক। তবে কর্তৃত্ব বিহীন ফতোয়া বন্ধ হওয়া চাই। ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ, কিংবা অভিজ্ঞ মুফতি (Juris Consult) কর্তৃক প্রদত্ত রায় অথবা প্রকাশিত বিধান কে ফতোয়া বলা হয়। যিনি ফতোয়া দিতে পারেন তাকে বলা হয় মুফতি। আর একজন মুফতির যে সকল গুনাবলী এবং বৈশিষ্ট্য থাকলে ফতোয়া দেয়ার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা হল, তিনি প্রথমে হবেন একজন ফকীহ অর্থাৎ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ধর্মীয় জ্ঞান, ধর্মীয় আইন ইত্যাদি বিষয়ে অভিজ্ঞ। সুতরাং যিনি ফতোয়া দিতে পারেন তিনি হবেন- (ক) বুদ্ধিমান, (খ) জ্ঞানী, (গ) ধর্মতত্ত্ববিদগণ, (ঘ) ধর্মীয় আইনজ্ঞ, (ঙ) ন্যায়-অন্যায়, হালাল-হারাম প্রভৃতি বিষয়ে সুক্ষ বিচারক, (চ) ইসলামী আইনের বিস্তারিত ব্যবহারবিধি সম্পর্কে অভিজ্ঞ। যিনি এসকল গুণের বা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নন তিনি ফকীহ-মুফতী নন এবং তার ফতোয়া গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবেনা। রাসুলুল্লাহ মুহাম্মাদ (সা:) তেইশ বছরের নবুওয়াতী জিন্দেগীতে নিজেই ফতোয়া দিতেন এবং সকল সমস্যার সমাধান করতেন। তারপর খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলেও ফতোয়ার ব্যবহার ছিল (১১-৪০ হি:)। এভাবে ফতোয়ার ব্যবহার মুসলিম সমাজে আজ পর্যন্ত আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। রাসুল মুহাম্মদ (সা:) এর তিরোধানের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যখন নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে লাগল তখন এর দায়িত্ব অর্পিত হলো সাহাবাগণের উপর বিশেষ করে যারা কোরআনে হাফেজ ছিলেন তাঁদের উপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়। এ পর্যন্ত যে সব সাহাবাগণের ফতোয়া পাওয়া যায় তাঁদের সংখ্যা একশত ত্রিশ। তাঁদের মধ্যে সাত জনের ফতোয়া সবচাইতে বেশি। তাঁরা হচ্ছেন- (ক) উমর ইবনুল খাত্তাব (রা:), (খ) আলী ইবনে আবু তালীব (রা:), (গ) আব্দল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:),(ঘ) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:), (ঙ) যায়েদ ইবনে সাবিত (রা:), (চ) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) , (ছ) আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:)। প্রসিদ্ধ আরবী ক্বামুসু-এর রচয়িতা আজ থেকে প্রায় ৫০০বছর আগে নিজ যুগে নিজ দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তিনি ফতোয়া শব্দটির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন- মা আফতি বিহী আল-ফক্বীহু অর্থাৎ ফিকাহবিদগণ যা প্রকাশ করেন তাই ফতোয়া। এর দ্বারা ইহা স্পষ্টই প্রতীয়মান যে, ফতোয়া একমাত্র ফিকাহবিদদের সাথেই সম্পৃক্ত। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ইমামুল আইম্মা হযরত আবু হানীফা (রা:) সর্বপ্রথম ফিকাহ শাস্ত্রকে একটি স্বতন্ত্র বিষয় রুপে সুবিন্যস্ত করেন। ফিক্বাহ শাস্ত্রের জন্য ইমাম আবু হানীফা (রা:) যে মেধা ও শ্রম ব্যয় করে গেছেন তার কিঞ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় তার সুদুর প্রসারী চিন্তা এবং পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে। তিনি এমন একদল শাগরেদ তৈরি করে গিয়েছেন যারা তাঁর অনুপস্থিতিতে ফিক্বাহ শাস্ত্রকে একটি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে অমর হয়ে আছেন। প্রিয় নবীজির মুহাম্মদ (সা:), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন,তাবে-তাবেয়ীন এবং আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের সে পথ ধরে যুগে যুগে ফতোয়া প্রদানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে কোরআন-হাদীস চর্চার সূতিকাগার মাদ্রাসাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দারুল ইফতা বা ফতোয়া বিভাগ। রাসুলুল্লাহ (সা:) এর জীবদ্দশায় কোনো সাহাবী ফতোয়া প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন নি। তবে ক্ষেত্র বিশেষে কোন সাহাবীকে রাসুলুল্লাহ (সা:) ফতোয়া দানের অনুমোদন দিয়েছেন। মুফতি বা ফকিহ না হলে জাতীয় মসজিদের খতিবও ফতোয়া দিতে পারেন না,অথবা যে কোন পীর যত বড় বুজর্গ হোন না কেন তিনি ফতোয়া জারি করেন না। মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের চীফ জাস্টিস মহোদয় অথবা কোন বিচারপতিও শরীয়ত সম্পর্কে মুফতি না হলে কোন ফতোয়া দিতে পারেন না। এ ব্যাপারে বিজ্ঞ আদালত মুসলমানদের সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও শরিয়ত স¤পর্কিত খুঁটিনাটি বিষয়ে ব্যখ্যার জন্য মুফতিদের অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। ফতোয়া মুসলমানদের জীবনব্যাপী উদ্ভূত সমস্যাগুলো সম্পর্কে সমাধান জিজ্ঞাসা, বিধি বিধান জানার একটি মাধ্যম এবং মুসলিম সমাজকে সুশৃঙ্খল ও নিয়মানুবর্তী রাখার এক কার্যকর উপায়। এ জন্য ফতোয়া দেয়া সবার জন্য উন্মুক্ত কিংবা অবারিত নয়। ফতোয়া দিতে হলে চাই হক্বকানী ও ছহীহ মুফতী কিংবা ইসলামে কোরআন সুন্নাহর আলোকে ফতোয়া দানে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি। সঠিক ফতোয়া দানে মুসলিম উম্মাহর সকল সমস্যার সুন্দর সমাধান হউক, চরম ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাক বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ্ । যে কোন কর্তৃত্ব বহির্ভূত ফাতোয়াবাজী বন্ধে সরকার ও জনগণ সহ এদেশের আলেম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে ।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।