প্রসঙ্গ: পানিতে ডুবে শিশুর অপমৃত্যু।

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

———————–

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু বলছে, বিশ্বে পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি শিশু মারা যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে। মৃতের সংখ্যা ভারতে বেশি হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর তালিকায় বাংলাদেশর নামই সবার উপরে।
আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা প্রবণ জেলাগুলোকে ‘সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন গবেষকগণ।

বাংলাদেশ অল্পবিস্তর প্রতিবছরই বন্যা হয়। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বরাবরে মতো সঠিক পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি মোকালে করে। বন্যা কবলিত মানুষের পূনর্বাসনের পাশাপাশি তাদের গৃহপালিত পশু-পাখিসহ অন্যান্য সম্পদেরও সুরক্ষার ব্যাবস্থা করা হয়।
বন্যার মধ্যে আমাদের গবাদি পশু-পাখিসহ সব সম্পদ রক্ষা করতে পারলেও সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের প্রিয় শিশুদেরকে আমরা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিারপদ রাখতে পারছি না।

আমাদের দেশ নদীমাতৃক। দেশমাতৃকার বুক চিরে বয়ে গেছে হাজরো ছোট বড় নদ-নদী। এছাড়া আমাদের দোশের গ্রামগুলোতে রয়েছে লক্ষাধিক পুকুর-ডোবা, খাল ও জলাশয়। এসব জলাশয়ের অধিকাংশই অরক্ষিত ও সীমানাপ্রচীরবিহীন। আর আমাদের শিশুরা এরই শিকার হচ্ছে বারবার। শিশুরা স্বভাবতই কোমলমতি। যে কোন জিনিজের প্রতিই তারা প্রবল আকর্ষণ বোধ করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা বিশেষ করে যাদের বয়স ০-৫; এরা পানি দেখলে আবেগ আপ্লূত হয়ে পড়ে এবং ছুঁয়ে দেখতে চায়। তাই এদের পানিতে ডুবার ঝুঁকি অন্যান্য বয়সের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। কেননা এ বয়সের শিশুরা সাধারণত কেউই সাঁতার জানে না। ডিজাস্টার ফোরাম ২৭ জুন ২০ থেকে ২৯ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত সময়ে ৪৬ জনের পানিতে ডুবে মৃত্যুর তথ্য উল্ল্যেখ করেছে। এই ৪৬ জনের মধ্যে ৩৬ জনই শিশু এবং আবার তাদের মধ্যে ১ থেকে ৪ বছর বয়সি শিশু ১৪ জন আর ৫-১০ বছর বয়সি শিশু ১১ জন।

সারা বছরই জাতিয় দৈনিকগুলোতে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। এধরণের খবরগুলো সচরাচর পত্রিকার ভেতরের পৃষ্টায় ছোট কলামে কম গুরুত্ব দিয়ে ছাপানো হয়। ফলে মানুষের নজর কম পড়ে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। সাধারণ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের দেশে বন্যা হয়। তাই এই সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়ে যায়। তাছাড়া বছরের দুই ঈদের ছুটিতেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গেল ঈদের ছুটিতে মোট ৬৮ জন শিশু পানিতে ডুবে অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে। যদের মধ্যে ৩৮ জনের বয়স ৫ বছরেরও কম ছিল।

গত কয়েক দশকে বাংলাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছেই রোল মডেল। শিশুরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। জাতির কর্ণধার। আগামী কান্ডারী। বাংলাদেশ সরকার সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। শিশুদের সুস্থ বিকাশের সব ধরণের উদ্যোগে নিয়েছে। প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, যেখানে আমাদের দেশের একটি শিশুও না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে না। সেখানে প্রতি বছর চৌদ্দ হাজারেরও বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে।
ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস, জন হপকিন্স ইন্টারন্যাশনাল ইনজুরি রিসার্চ ইউনিট, দি সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বা সিআইপিআরবি এবং আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণা বলছে বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন চল্লিশ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। তাদের ধারণা প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ। কেননা এধরণের মৃত্যুর ব্যাপারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রিপোর্ট করা হয় না। স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনের কাছেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য থাকে না।

কেন শিশুরা পানিতে ডুবছে?

ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার (আইডিআরসি) এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কয়েক বছর আগে একটি যৌথ জরিপ চালায়। বাংলাদেশের ষোলটি জেলার বিভিন্ন শহর ও গ্রামগুলোতে এই জরিপ পরিচালনা করা হয় যাতে অংশগ্রহণ করেন তিন লক্ষাধিক মানুষ। জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ইনজুরি বা আঘাত জনিত কারণে এক লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। যার মধ্যে পানিতে ডুবে মরার হাড় ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। যা সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজারে দাড়ায়।
এদের প্রায় সকলের সকলের বয়সই ১৮ বছরের কম। আবার এই ১৪ হাজারের মধ্যে ১০ হাজারই ০-৫ বছরের শিশু।

জরিপে বিভিন্ন পরিসংখ্যানের পাশাপাশি শিশু মৃত্যুর জন্য কয়েকটি রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকির কথাও উঠে এসেছে। সেগুলো হলো:

১। বসত বাড়ির চারদিকে অরক্ষিত পুকুর-ডোবা, জলাশয় ইত্যাদির আধিক্য: বেশ কিছু কেস স্টাডি করে দেখা গেছে, শতকরা ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা পুকুরেই হয়েছে। আর সেগুলো বাড়ির সীমানার ২০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যেই ছিল।

২। দেখ-ভাল করার অভাব: ৬০শতাংশ পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সকাল ৯ থেকে বেলা ১ টার মধ্যে ঘটে। কারণ এ সময় মায়েরা ব্যস্ত থাকেন। বড়রা বিভিন্ন কাজে ঘরের বাইরে থাকেন। ছোট শিশুরা এ সময় একা থাকে। খেলাচ্ছলে পুকুরের পানিতে ভাসমান উদ্ভিদ বা অন্যকোন বস্তুুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। এবং সেটি ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

৩। বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সাঁতার না জানা: সাঁতার একটি মৌলিক শিক্ষা। এটি জীবন রক্ষাকারীও বটে। কিন্তু আমাদের দেশের অসংখ্য শিশু রয়েছে যারা সাঁতার জানে না। বিশেষ করে যে সব শিশু শহরে বসবাস করে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মেয়ে শিশুরা ছেলে শিশুদের তুলনায় সাতার শেখার কম সুযোগ পায়। অনেকেই এক্ষেত্রে পারিবার থেকে লিঙ্গ বৈষম্য ও কুসংস্কারের শিকার হয়। শিক্ষামন্ত্রণালয় ইতিপূর্বে স্কুল পর্যায়ে সাতার শিখানোর উদ্যোগ নিয়েও পর্যাপ্ত রিসোর্সের অভাবে সফল হতে পারে নি। ৫-১৭ বছরের শিশুদের পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনায় সাঁতার না জানাকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বিশ্লেষকরা।

৩। প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান না থাকা: পানিতে ডুবে যাওয়া শিশুকে উদ্ভার করার পর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কি রকমের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে অনেক অভিভাবকর সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নেই। আর এসব ক্ষেত্রে শিশুটি সাথে সাথে হাসপাতালেও নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে দেখা যায়, হাসপাতালে আনতে আনতে অনেক শিশুই মারা যায়।

৪। কুসংস্কার: গ্রামে পানিতে ডোবা শিশুদের নিয়ে রয়েছ ননা প্রকারের কুসংস্কার। যেমন- মাকে ধরতে না দেওয়া বা অনেক সময় শিশুকে মাথায় তুলে চারদিকে ঘোরানো ইত্যাদি। গবেষকরা এসব কুস্কারকে পানিতে ডুবা শিশুদের মৃত্যু জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করছেন। এছাড়া আমাদের দেশের উপজেলা স্বাস্থ কম্লপক্সগুলোতে পানিতে ডোবা রোগিদের ফাস্টএইড রেসপন্স এর ব্যাপারে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে।

৫। আইডিআরসি’র পরিচালিত হেল্থ এন্ড ইনজুরি সার্ভেতে দেখা গেছে, দরিদ্র ও গরীব পরিবারে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেশি।

প্রতিকার কিভাবে?

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর মূলে রয়েছে সচেতনতার অভাব। সরকারি অথবা বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ না থাকায় থামানো যাচ্ছে না এ ‘নীরব মহামারী’। প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। অথচ এ বিষয়ে সরকারের জোড়ালো কোন কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই এ বিষয়ে সময়োপযোগী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে আমাদের দেশের অধিকাংশ এনজিও ও সামাজ সেবা প্রতিষ্ঠানই বিভাগীয় শহর ও রাজধানী কেন্দ্রীক। এদের অধিকাংশ সেবাই রাজধানী ও এর আসে পাশের এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ। তাছাড়া হাই প্রফাইল এনজিওগুলো এ বিষয় নিয়ে কাজ করতে কেন জানি আগ্রহ বোধ করে না। তবে আশার কথা হচ্ছে, ইদানিং ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের কিছু এনজিও এই ‘নীরব মহামারীর’ বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। তারা মাঠপর্যায়ে শিশুদের সাঁতার শিখানো, অভিভাবকদের সতর্ক করা ও পাানিতে ডোবা শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি শিশুকে সাঁতার শিখানো এবং সকলের শ্রেণির মানুষের মাঝে সচেতনা সৃষ্টির মধ্যদিয়েই এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ মিলবে। শূন্য থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের সতর্কতার সাথে দেখবাল করতে হবে। বিশেষ করে বর্ষাকালে। কর্মজীবী মায়েদেরকে তাদের সন্তানের জন্য ডে কেয়ারের ব্যাবস্থা করতে হবে। আর যে সব শিশুদের বয়স পাঁচ বছর বা তার বেশি, তাদেরকে অবশ্যই সাতার শেখাতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিশুদের সাঁতার শেখানোকেই অধিক কার্যকর মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ভার পরবর্তী প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কও সাধারণ মানুষকে ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশুদের জন্য এ পৃথিবীকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করে তুলতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।

লেখক
সিয়াম আহমেদ
শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।