পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের অভিযান কতটুকু সফল হবে?

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৫:৫৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০

———————–

সম্প্রতি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যকার দ্বন্দ্ব একটি বড় ধরণের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত সমুদ্র তলদেশের সম্পদ আহরণের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করেই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করছে।

পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় তলদেশে প্রায় ২ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাসের অস্তিত্ব আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছোটবড় মিলিয়ে এই অঞ্চলের সীমানাভুক্ত দেশগুলো হোল
তুরস্ক, গ্রিস, ইসরাইল, লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইটালি, মিশর, লিবিয়া, সাইপ্রাস ও তুর্কি সাইপ্রাস।

আয়তনে গ্রিস তুরস্কের ছয় ভাগের একভাগ হোলেও গ্রিসের সামুদ্রিক সীমানা তুরস্কের চেয়ে বিস্তৃত। ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গ্রিস ভূমধ্যসাগরে বৃহৎ একটি অংশের অবস্থান লাভ করেছে।

১৯২৩ সালের লুজান ও ১৯৪৭ সালের প্যারিস শান্তিচুক্তি ধারানুযায়ী গ্রিস তার মূল ভূখন্ড থেকে দূরে ও তুরস্কের নিকটবর্তী অবস্থিত দ্বীপসমূহে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে ‘ডিমিলিটারাইজ’ বা সামরিক উপস্থিতি শূন্য রাখবে। তবে গ্রিস সম্প্রতি শান্তিচুক্তির ধারা ভঙ্গ করে ক্যাসটেলোরিযো দ্বীপে সামরিক উপস্থিতি নিয়োজিত করলে তুরস্কের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। জেনে রাখা ভালো, এই ক্যাসটেলোরিযো দ্বীপটি একটি স্পর্শকাতর অঞ্চল যা গ্রিসের মূলভূমি থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে হলেও তা তুরস্কের দক্ষিণ উপকূল থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে!

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্বভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল গ্রিস, ইটালি, ইসরাইল, সাইপ্রাস, মিশর, ফিলিস্তিন ও জর্ডান সমুদ্র তলদেশের সম্পদ সম্মিলিতভাবে অনুসন্ধানের বিষয়ে চুক্তি করে। তবে সবচেয়ে দীর্ঘ কোস্টলাইন থাকার পরেও তুর্কিকে সেই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না করাটা ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে তুর্কিকে উপেক্ষা করা।

পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সর্বাধিক দ্বীপ গ্রিসের মালিকানায় থাকায় গ্রিস সেই সকল দ্বীপের সন্নিহিত সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইইজেড দাবি করছে। বাস্তবতা হলো, গ্রিসের দ্বীপ গুলো এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, যেখানে ইইজেড বাস্তবায়িত হলে তুর্কির মূলভূমির কাছাকাছি পৌছে যাবে। ফলে গভীর সমুদ্রে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে তুর্কি।

স্বাভাবিক ভাবেই গ্রিসের এমন দাবিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে তুর্কি মত দিয়েছে। তুর্কির ভাষ্যমতে, দ্বীপ কোনভাবে সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ করতে পারেনা। বরং সেটি নির্ধারিত হবে ‘কন্টিনেন্টাল শেলফ’ বা মহীসোপানের ভিত্তিতে। যার ফলে তুর্কির দক্ষিণ কোস্টলাইনের কাছাকাছি গ্রিসের দ্বীপ থাকলেও সীমানা নির্ধারণ হবে মূলভূমি থেকেই যেখানে দ্বীপের প্রভাব নিস্ক্রিয় থাকবে।

গত বছরের নভেম্বরে তুর্কি ও লিবিয়ার জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকার ‘জিএনএ’ এর মধ্যকার একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সাক্ষরিত হয়, যেখানে দেশ দুটি তাদের কন্টিনেন্টাল শেলফে যৌথভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে সম্মত হয়। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে তুর্কি যেন কোনভাবেই বাদ না যায়।

তবে গ্রিসও নীরবতা পালন করেনি। গত মাসে তারা মিশরের সাথে ইইজেড চুক্তি করে, যেখানে দেশ দুটি যৌথভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে সম্মত হয়। তুর্কি তার সামুদ্রিক সীমানা অতিক্রম করেছে বলেও মত দেশটির। বিশ্লেষকরা বলছেন তুর্কির ভূমধ্যসাগরের লিবিয়া অভিমুখে অনুসন্ধান ঠেকাতেই এমন চুক্তি করেছে গ্রিস। এই চুক্তির ফলে মিশর-গ্রিস ও তুর্কি-লিবিয়ার কন্টিনেন্টাল শেলফ পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে চলে এলো।

গ্রিস-মিশরের এই চুক্তিকে ‘অবৈধ’ বলে মত দিয়েছে তুর্কি। পাশাপাশি নিজেদের সামুদ্রিক সীমানায় যে কোন অন্যায় বিচরণ প্রতিহত করার দাবি ব্যক্ত করেছে দেশটি। এছাড়াও দেশটির সাথে লিবিয়ার যে চুক্তি গেল বছরে সম্পাদিত হয়েছে, তা জাতিসংঘের আইনের আওতাভুক্ত ও বৈধ বলেই মত দিয়েছে আংকারা।

পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিসের সুবিধাজনক অবস্থানের ফলে ইসরাইল সহ ইউরোপীয় দেশগুলো গ্রিসের সাথে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ। পাশাপাশি গ্রিস-সাইপ্রাস দীর্ঘ গ্যাস পাইপলাইন ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবহন লাইন হওয়ায় চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো এটির ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। অন্যদিকে সাইপ্রাস ও উত্তর সাইপ্রাসের ইইজেড নিয়েও দ্বন্দ্ব বিরাজমান, যেখানে তুর্কি ছাড়া আর কোন রাষ্ট্রই উত্তর সাইপ্রাসকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে তুরস্কের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিচক্ষণতার সাথে নেওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিউনের সাথে সমঝোতার গতিবিধিই নির্ধারণ করবে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের অভিযান কতটুকু সফল হবে।

.

লেখক –

সিদ্দিকী নাহীন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান – ১ম বর্ষ, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।