পাকিস্তানে চলন্ত ট্রেনে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এ পর্যন্ত নিহত ৭৪

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৪:১৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১, ২০১৯

অনলাইন ডেস্ক :
আহত ৪০ জনের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক

পাকিস্তানের পাঞ্জাবে চলন্ত ট্রেনে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে কমপক্ষে ৭৪ জন নিহত হয়েছে। এতে আহত হয়েছে ৪০ জনের বেশি। এদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বৃহস্পতিবার সকালে রহিম ইয়ার খান এলাকায় ‘তেজগাম’ ট্রেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছে, একদল যাত্রী আইন অমান্য করে ট্রেনে সিলিন্ডার দিয়ে রান্নার সময় বিস্ফোরণ ঘটলে তিনটি বগিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়তে গিয়ে বেশির ভাগের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন ও হতাহতদের ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার।

দেশটির প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি ও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শোক প্রকাশ করেছেন। এছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, শেহবাজ শরিফসহ অনেকেই শোক জানান।

প্রাদেশিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাতে ডন নিউজ ও বিবিসি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭৪ জন নিহতের খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও ৪০ জন। পাঞ্জাবের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. ইয়াসমিন রশিদ এএফপিকে জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে।

এক ভিডিও বার্তায় নিহতদের পরিবারকে ১৫ লাখ ও আহতদের পরিবারপ্রতি ৫ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের রেলমন্ত্রী শেখ রশিদ। ওই ট্রেন ও যাত্রীদের বীমা করা ছিল বলে জানান তিনি। এ ঘটনার পর পাকিস্তানের ১৩৪টি ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। পরে আবার তা যথারীতি চালু হয়েছে। দুর্ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে। এই কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শেখ রশিদ বিবিসিকে বলেন, ট্রেনটিতে তাবলিগ জামাতের একটি দল ছিল। তারা লাহোরে একটি ধর্মীয় জমায়েতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন করে ট্রেনে দুটি সিলিন্ডার নিয়ে উঠেছিলেন তারা। সকালের নাস্তা তৈরির সময় গ্যাস সিলিন্ডারের সাহায্যে একটি চুলা ধরান। সেই চুলা থেকে আগুন ছিটকে সিলিন্ডারের গায়ে লাগলে সেটি ফেটে যায়। মুহূর্তেই ট্রেনের তিনটি বগিতে আগুন ধরে যায়। ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে ট্রেনের বাকি অংশে।

আগুন লাগার কিছুক্ষণের মধ্যেই চালক ট্রেনটি থামিয়ে দেন। এতে ক্ষতি কিছুটা কম হয়েছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তা আলি নওয়াজ জানান, পুড়ে যাওয়া দুটি ইকোনমি ও একটি বিজনেস ক্লাসের বগিতে যথাক্রমে ৭৮ ও ৫৪ জন করে আরোহী ছিলেন। ট্রেনটিতে তাবলিগ জামাতের লোকজনই বেশি ছিল। এদের বেশির ভাগই মিরপুর খাস এলাকার। দ্রুতগতির ট্রেনটি করাচি থেকে রাওয়ালপিণ্ডি যাচ্ছিল।

রেলমন্ত্রী রয়টার্সকে জানান, আগুন ছড়িয়ে পড়লেও ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়নি। অধিকাংশ নিহতের ঘটনা ঘটেছে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ার কারণে। একই কারণে অনেকের জীবন রক্ষা পেয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাফ দেয়া অনেকের গায়েই আগুন লেগে গিয়েছিল।

ট্রেনটির যাত্রী মোহাম্মদ রমজান বিবিসিকে বলেন, তাবলিগের কিছু লোক চা বানাতে গেলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপরই তিনি ট্রেন থেকে লাফ দেন। আরেক যাত্রী জানান, ফজরের নামাজের পর তিনি আগুন লাগার বিষয়টি টের পান। তখন সবাই চিৎকার করছিল। তিনি এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েন যে, কীভাবে নিজেকে বাঁচাবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই আমি পোড়াগন্ধের কথা অন্যদের বলি। কিন্তু কেউ আমার কথা আমলে নেয়নি। উদ্ধারকর্মীরা দেরিতে আসে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই অগ্নিনির্বাপণ ও হতাহতদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিস এবং সেনা সদস্যরা। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যরা ছাড়াও চিকিৎসক ও প্যারামেডিক কর্মকর্তারা অভিযানে অংশ নেন। আগুন নেভাতে সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। হতাহতদের লিয়াকতপুর ও বাহাওয়ালপুরের হাসপাতালে নেয়া হয়।

এ ঘটনার পর পাকিস্তানের ১৩৪টি ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। দেশটিতে যাত্রীবাহী ট্রেনে দাহ্য পদার্থ নিয়ে ওঠা নিষেধ। ট্রেনের ভেতর আগুন ধরানোও নিষেধ। এরপরও দীর্ঘ রেলযাত্রায় অনেক যাত্রী খাবার তৈরির জন্য গোপনে গ্যাস সিলিন্ডারযুক্ত চুলা নিয়ে ওঠে। জনপ্রিয় ‘তেজগাম’ ট্রেনে সিলিন্ডার নিয়ে ওঠার ঘটনায় দায়িত্বরত কর্মীদের কোনো অবহেলা ছিল কিনা- তা খতিয়ে দেখছে রেল মন্ত্রণালয়। রেলমন্ত্রী জানান, প্রথমে নিরাপত্তা প্রহরী ও চালক তাবলিগের ওই যাত্রীদের সিলিন্ডার নিয়ে উঠতে বাধা দেন। পরে তারা লুকিয়ে সিলিন্ডার নিয়ে ট্রেনে ওঠেন।

এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এক টুইট বার্তায় তিনি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনার পাশাপাশি ঘটনা তদন্তে নির্দেশের কথাও জানান। শোক জানিয়েছেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি, মানবাধিকারবিষয়ক মন্ত্রী শিরিন মাজারি, বিরোধীদলীয় নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, শেহবাজ শরিফসহ অনেকে।

প্রসঙ্গত, গত জুলাইয়ে দেশটিতে এক ট্রেন দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত হয়। ২০০৭ সালে মেহরাবপুরে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৫৬ জন নিহত ও ১২০ জন আহত হয়েছিল। ২০০৫ সালে সিন্ধু প্রদেশে তিনটি ট্রেনের সংঘর্ষে ১৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।