পটুয়াখালীর গলাচিপার ট্রিপল মার্ডার মামলার রহস্য উদঘাটন করলো পুলিশ: আদালতে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২০

কাওসার আহমেদ:

জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে ত্যাগ স্বীকারে নির্ঘুম রাত কাটানো, মাটি ও মানুষের সেবায় দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করা,আর সর্বদা গরীব দুঃখী অসহায় মানুষের কল্যাণে পাশে থাকা এক পুলিশ সুপারের নাম, মানবতার মাঝি ‘সৈয়দ মইনুল হাসান’। পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার সৈয়দ মইনুল হাসান (পিপিএম) পটুয়াখালী জেলায় যোগদানের পর থেকেই পাল্টে যায় পটুয়াখালীর আইনশৃঙ্খলার দৃশ্য ও পুলিশী সেবা! দিন দিন পটুয়াখালী জেলা পুলিশের জনসেবার মানোন্নয়ন হতে থাকে। পুলিশ সুপার মহোদয় এর নেতৃত্বে আবারো এক অসাধ্যকে সাধন করলো পটুয়াখালী জেলা পুলিশ। পটুয়াখালীর গলাচিপার আমখোলা ইউনিয়নে ২০১৭ সালে ঘটা জঘন্য এক ঘটনা “ট্রিপল মার্ডার” । দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশ ব্যাপক তদন্ত করে ট্রিপল মার্ডার মামলার মূল রহস্য উদঘাটন করেন ।মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করেন এবং আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

০২ আগস্ট ২০১৭ পটুয়াখালীর গলাচিপার আমখোলা ইউনিয়নের ছৈলাবুনিয়া গ্রামের নির্জন ঘরে বিভৎস অবস্থায় ০৩(তিন) জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। দেলোয়ার মোল্লা(৬৫), স্ত্রী পারভীন বেগম(৬৫) এবং পালিত কণ্যা কাজলী আক্তার(১৫)গণকে নিজ বসতঘরে অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী নির্মমভাবে কুপিয়ে ও জবাইকরে হত্যা করে। কাজলী’র দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। তার পরিধেয় কাপড় থেকে নমুনা নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়। হত্যাকান্ডের সময় কাজলীর ব্যবহৃত নকিয়া-১২৮০ মডেলের মোবাইল ফোনটিও খোয়া যায়। এ ঘটনায় ভিকটিম দেলোয়ার মোল্লার বড় ভাই মোঃ ইদ্রিস মোল্লা(৭০) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে যা গলাচিপা থানার মামলা নং-০৩, তারিখ: ০৩/০৮/২০১৭ খ্রি: ধারা-৩০২/৩৪ পেনাল কোড রুজু হয়। একই ঘটনায় ভিকটিম দেলোয়ার মোল্লার বোন পিয়ারা বেগম বাদী হয়ে ২২ জনের নামসহ অজ্ঞাতনামা ১০/১৫ জনকে আসামীকরে গলাচিপা কোর্টে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বিজ্ঞ আদালত থানায় রুজুকৃত মামলার সাথে সংযুক্ত করে একত্রে তদন্ত করার জন্য আদেশ দেন।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটার প্রায় সাড়ে তিন মাস পরে মোহাম্মদ মইনুল হাসান পিপিএম পুলিশ সুপার হিসেবে পটুয়াখালী জেলায় যোগদান করে ঘটনার স্থান পরিদর্শনসহ সন্নিহিত একটি মাঠে অপরাধ সভা করেন। মামলাটির নিবিড় ও গভীর তদন্তের জন্য ইন্সপেক্টর (তদন্ত), গলাচিপা থানাকে নিযুক্তসহ সার্বক্ষনিক প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।

গত ০৯/১০/২০২০ খ্রি: তারিখ রোজ শুক্রবার ঢাকার পল্লবী থানাধীন বাউনিয়া বাঁধ এলাকা থেকে মোহাম্মদ আবু রায়হানের কাছ থেকে ভিকটিম কাজলীর খোয়া যাওয়া নকিয়া-১২৮০ মডেলের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আবু রায়হান জানান যে, তার বাড়ি বরিশাল জেলার হিজলা থানা এলাকায়। ২০১৭ সালের আনুমানিক আগস্ট মাসে তার ফুপুর ননদের স্বামী শহীদ তাকে উক্ত মোবাইল ফোনটি দেয়। এ বিষয়ে ১১ অক্টোবর ২০২০ উক্ত রায়হান বিজ্ঞ আদালতে স্বাক্ষী হিসেবে ফৌঃ কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীও দেন। হত্যাকান্ডের পর হতে শহীদ তার পরিবার ও গ্রামের সকল আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। গ্রামের বাড়ীতে সে আর কখনোই আসেনি। শহীদের দুইজন স্ত্রী রয়েছে। প্রথমে সে গলাচিপা থানাধীন আমখোলায় বিবাহ করে। পরে বরিশাল জেলার হিজলা উপজেলায় ২য় বিবাহ করে। ১ম পক্ষে তার ০২ টি এবং ২য় পক্ষে ০৩ টি সন্তান রয়েছে। সে পেশায় গাড়ী চালক ছিল।

পুলিশ সুপারের সার্বিক তদারকি ও নির্দেশক্রমে পটুয়াখালী জেলা পুলিশের একটি চৌকস আভিযানিক দল মামলার তদন্তকারী অফিসার গলাচিপা থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোঃ হুমায়ুন কবির এর নেতৃত্বে ঢাকা জেলার অন্তর্গত সাভার থেকে গত ১০ অক্টোবর ২০২০ খ্রি: আনুমানিক ১৮:৩০ ঘটিকায় শহীদকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। শহীদ নিজের নাম পরিবর্তন করে জাহাঙ্গীর নামে সাভারে একটি ভাড়া বাসায় প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছিল এবং অটো রিক্সা চালাতো। সে তার ২য় স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করতো না। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শহীদ জানায় যে, তার দুইজন স্ত্রী থাকার পরেও সে কাজলীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু শহীদের চাচী অর্থাৎ কাজলীর মা ঐ বিয়েতে রাজী ছিলনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ হত্যাকান্ড ঘটায়। ০১ আগস্ট ২০১৭ খ্রি: দিবাগত রাতে শহীদ ধারালো দা দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা চাচা-চাচীকে নৃশংস ভাবে কুপিয়ে হত্যা করার পর কাজলীকে ধর্ষণ করে ও হত্যা করে মর্মে প্রাথমিক ভাবে জানায়।

অভিযুক্ত শহীদ বিজ্ঞ আদালতে এ বিষয়ে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।

এ ব্যাপারে গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মোঃ হুমায়ুন কবির নিউজ ভিশনকে ফোনালাপের মাধ্যমে জানান, ” এটা একটা রহস্যময় মার্ডার ছিল। দীর্ঘ তিনটি বছর অক্লান্ত পরিশ্রম আর ব্যাপক তদন্তের পর গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হই। মামলার প্রধান আসামি শহীদ অত্যন্ত চতুর লোক।আগে দাড়ি ছিল না কিন্তু ঘটনার পর দাড়ি রেখে নিজের চেহারা পরিবর্তনের চেষ্টা করে ও নাম পরিবর্তন করে আত্মগোপন থাকে। এরপর আমার টিম গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘ তিন বছরের সাধনার পর এমন একটা কাজে সফল হলাম।”

‘অপরাধী যতই কৌশলী হোক না কেন , তারচেয়ে অনেক বেশি কৌশলী যেন পুলিশ’ , এমন চিরন্তন সত্যে আবারো অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো পটুয়াখালী জেলা পুলিশ। অপরাধী যদি পৃথিবীর মাটিতে অবস্থান করে ,তবে যতই পলাতক থাকুক,আসতেই হবে তাকে পুলিশের হাতে! পুলিশের এমন বীরত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখে টনক নড়বে প্রতিটি অপরাধীর। “আপনার পুলিশ আপনার পাশে, তথ্য দিন সেবা নিন”।