নিজেকে জানো!!–হাজেরা চৌধুরী

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:১২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

হাজেরা চৌধুরী তাহেরা

“নিজেকে জানা মানে বিশ্বকে জানা।
নিজেকে চেনা মানে বিশ্বকে চেনা।
নিজের মাঝে লুকিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা।”
—-(হাজেরা চৌধুরী)
আজকের জগতে যারা স্মরণীয় হওয়ার যোগ্যতা রাখেন তারা পরিবেশ পারিপার্শিকতা সবকিছু পেছনে ফেলে নিজেকে প্রথমে চিনেছেন। নিজের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সৃজনশীলতাকে ফুটিয়ে তুলতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন এবং সফলতার মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করেছেন । আর তাদের মতো নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত ও চিন্তাশীলতার বাস্তব রুপায়ন করতে আমাদের চাই সংকোচ সংকীর্ণতাহীন দৃঢ় স্বাধীন মনের। আর সেই মনকে শক্তিমান করতে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ও নিজের উপর সঠিক ধারণা রাখার মানসিকতা।

প্রতিষ্ঠিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের সামনে আমরা নিজেকে তুচ্ছজ্ঞান করি, আত্মমর্যাদাহীন হয়ে পড়ি।
তাই সেসময় নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো রূপ লাভ করতে থাকে আচার আচরণের মাধ্যমে।নিজের ধ্যানধারণা, জ্ঞানের অপ্রতুলতা এমনকি ক্ষীণ দূর্বলতা প্রকাশ করতেও আমরা দ্বিধাবোধ করি না। তাই প্রথমেই আমাদের নিজের সম্পর্ক এতদিনের লালিত অযোগ্য, অশক্ত ও অসমর্থ মনোভাবের বিনাশ করতে হবে।

কোনো জ্ঞান, ধারণা, অভ্যাস ও সাফল্য নিয়ে আমরা জন্মাইনি। আমরা একা ও নিঃস্বভাবে এই পৃথিবীতে এসেছি। কারো পূর্বে কিংবা কারো পরে আসার পেছনে যেমন আমাদের কোনো ক্রেডিট নেই তেমনি বংশ, গোত্র, জাত, বর্ণ, আভিজাত্য, ধন -দৌলত ইত্যাদিতে এগিয়ে যাওয়ার পেছনেও আমাদের কোনো ক্রেডিট নেই। কারণ জন্মের পর পিতার উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ জাত, বংশে , সম্পত্তিতে সমাজে হয় উচ্চশ্রেণী আর কেউ হয় নিম্নশ্রেণী। কিন্তু আমরা উচ্চ অথবা নিম্ন যে শ্রেণীভুক্তই হই না কেন আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো নিজেকে জানা। আমাদের কর্মদক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক (proactive) মনোভাবই আমাদের সংশয়, সন্দেহ অভাববোধ, দীনতা, অক্ষমতা ইত্যাদি থেকে মুক্ত করে আত্মবিশ্বাসী, আত্মপ্রত্যয়ী ও সর্ববিষয়ে পারদর্শী করে তুলতে পারে।

আত্মবিশ্বাসের বলে বলীয়ান বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং লিখতে কথা বলতে না পারা সত্ত্বেও মোটর নিউরোন ব্যাধিতে আক্রান্ত অবস্থায় বিজ্ঞানমহলে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘এ ব্রীফ হিস্ট্রি অব টাইম ‘ আমাদের উপহার দিয়ে গিয়েছেন। দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকশক্তিহীন হেলেন কিলার আত্মবিশ্বাস ও সুদৃঢ় প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাকশক্তি পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। ৮ বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হয়ে যাওয়া আলেকজান্দ্রা তার অটল মনের জোরে ব্যায়াম ও চর্চার মাধ্যমে নেচে বিখ্যাত বেলে নর্তকীর আসন জুড়েন।
অথচ দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি,লেখনীশক্তি, চলারশক্তি সর্বোপরি মেধা ও স্মরণশক্তি সম্পন্ন সুস্থদেহ থাকতে আমরা যদি নিজেকে জানতে চিনতে ও প্রকাশ করতে পিছিয়ে পড়ি তাহলে মানবকূলে জন্মানোটাই আমাদের অনর্থক হবে। আমাদের সবারই প্রতিভা আছে, কেউ গাইতে, কেউ আঁকতে, কেউ নাচতে, কেউ লিখতে, কেউ খেলতে কিংবা কেউ ভালো কথা বলতে পারে। কিন্তু সবাই সমান প্রতিভাধর নয়, মানুষের মধ্যে পার্থক্যের জন্যই সৃষ্টার এই বৈচিত্র্যময়তা। তাই সবারই কিছু না কিছু অক্ষমতা আছে। কেউই সয়ংসম্পূর্ণ নয়। ( There is nothing 100% in the world without Allah). আর আমরা যদি আমাদের দৈহিক কিংবা মানসিক সামান্য ত্রুটিকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তোলার পথ রুদ্ধ করি তাহলে আমরা নিজেকে যেমন প্রতিষ্ঠিত করতে পারবনা তেমনি দেশকেও কিছু দিয়ে যেতে পারবনা।

‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’- অর্থাৎ পৃথিবী বীরের জন্য উদার উন্মুক্ত । নিজেদের স্বরূপে যারা প্রকাশিত হন স্বমহিমায় তাদের জয়গান যেমন পৃথিবী গায় তারাও তেমনি আত্মগরিমায় উদ্ভাসিত, উচ্চকিত । অপরদিকে ভীরু, কাপুরুষ নিজের ব্যর্থতাকে অবলম্বন করে নিজেকে বিধ্বস্ত করে ফেলে। আত্মশক্তি, সৃজনীশক্তিকে প্রকাশ করার বদলে গোপন করেই সে স্বস্তি লাভ করে । তারা মনে করে ভাগ্যদেবী তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন নয়। পাছে লোকে কিছু বলবে অথবা কোনো ভুল হয়ে যাবে ভেবেও তারা সামনে পা বাড়ায় না। ভয়ের এই কপাট ভেঙ্গে যদি তারা আত্মপ্রসারে নিজেকে বিনিয়োগ করতো তাহলে তারাও হতো সফলকাম । কিন্তু তারা তা না করে নিজেকে জানার বদলে অপরকে জানতেই বেশি আগ্রহী, নিজের মেধাকে অপরের তোষামোদ করতে তারা ব্যবহার করে অথচ সে জ্ঞান, মেধা দিয়ে নিজের ভেতরের শক্তিকে ফুটিয়ে তুলে জনসম্মুখে প্রকাশ করার মাধ্যমে অর্জন করতে পারত অভাবনীয় সফলতা।

আবার সমাজে আর একশ্রেণির মানুষ আছে যারা অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করতে বেশি তৎপর।
তারা বলশালী, ধনবান মানুষের সাথে নিজেদের তুলনা করে এবং বলে “অমুকের মতো যদি আমার ধন সম্পত্তি , ঘরবাড়ি থাকতো, তমুকের মতো যদি ছেলেমেয়ে থাকতো, অমুকের মতো যদি রুপ লাবণ্যময়ী হতাম কিংবা তমুকের মতো যদি জ্ঞানী হতাম।” অন্যের মতো হতে না পেরে তারা আফসোস করে নিজের অভাব ও দুর্বলতার জন্য।তারা প্রতিষ্ঠিত ও সফল মানুষের ভারি গুণগান করে নিজেদের ক্ষুদ্র জ্ঞান করেও আত্মতৃপ্ত হতে চায়। এটি বরং তাদের হতাশা আরো বৃদ্ধি করে। আমি তাদের ক্ষেত্রে বলি ,নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করোনা,যদি একান্তই তুমি তুলনা করতে চাও,তবে নিজেকে নিজের সাথে তুলনা করো অথবা নিজের অতিথের সাথে ( Don’t compare yourself to others, If you want to compare, compare yourself to your past)। একবার চিন্তা করলেই বোঝা যায় কালকের
আমি ও আজকের আমির মাঝে কতটা প্রভেদ ।কালকে হয়তো পৃথিবী সম্পর্কে ততটা জ্ঞান ছিলনা যতটা আজকে আছে, কালকের ধ্যান ধারণা, চিন্তাশীলতা আজকে হয়তো আরও উন্নত । আর এভাবে নিজের সাথে নিজের তুলনা করে আমরা স্বস্তির পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীলতাও অর্জন করি।আর এটাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সোপান হিসেবে কাজ করে।

সৃষ্টির উষালগ্ন হতে আত্মমর্যাদাবান ব্যক্তিরা নিজেকে প্রবলভাবে জানার প্রয়াস চালিয়েছেন এবং সফলতার মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাস সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। এক একজন মনীষী এক একটি পথ সৃষ্টি করেছেন। সে পথে স্বাধীন পদাঘাত আর সার্থকতার অধিকার একমাত্র সে পথিকেরই। আমরাও তেমনি নিজেকে জেনে নিজের স্বকীয়তার মাধ্যমে দূর্গম পথ, বন্ধুর ভূমি আর দুঃসাহসিক অভিযানে সৃষ্টি করব আমাদের চলার পথ। অন্যের অন্ধ অনুসরণে কোনো গৌরববোধ কিংবা নিজস্বতা নেই। আছে শুধু লজ্জা। আর অন্যের অনুকরণে তার সৃষ্ট পথে চলে প্রতিষ্ঠিত হবার মানসিকতা আমাদের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বিনষ্ট করে। তাই আমরা নিজের শক্তিকে প্রাধান্য ও উপলব্ধির মাধ্যমে নিজের আসন নিজে গড়ার প্রচেষ্টা চালাব প্রথমেই। আর তার জন্য চাই জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষিত হওয়া, আর শিক্ষার বিষয় হতে সবে উৎসাহ ও আগ্রহের মধ্যে নিবদ্ধ ।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র সমাজ সংস্কার করেছেন । রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ করেছেন। বেগম রোকেয়া নারীদের শিক্ষাপ্রসারে অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন । বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্যের গান গেয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকা আবিষ্কারক কলম্বাস, বর্ণবাদবিরোধী মার্টিন লুথার কিং, বিমান আবিষ্কারকারী অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট, বৈদ্যুতিক বাল্ব সৃষ্টিকারী টমাস আলভা এডিসন, হোমিওপ্যাথিকের জনক সামুয়েল হ্যানিমেন, অ্যন্টিবায়েটিকের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, ভারতের জনক মাহাত্ম্য গান্ধী , ভিয়েতনামের জনক হো চি মিন এবং বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ প্রত্যেক সফলকাম ব্যক্তিরা নিজের উপর অটল আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কর্মে সদা অবিচল ছিলেন, লক্ষ্যে স্থির ছিলেন । আর এভাবে নিজেকে চেনার ক্ষমতা তাদেরকে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বলতা দান করেছে। আমরা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অতীতের ব্যর্থতা, গ্লানি, অবমাননাকে ম্লান করে নিজেকে জানার মাধ্যমে আজকের নতুন জীবনকে নতুনভাবে সাজাব।

শিক্ষার্থী: কালীপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়