নাগার্নো-কারাবাখ সংঘাতঃ জাতিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২০

—————–
সম্প্রতি শুরু হওয়া আজারবাইজান- আর্মেনিয়া দ্বন্দ্ব বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গত ২৭শে সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে ইতোমধ্যে উভয় দেশের শতশত বেসামরিক লোকের প্রাণহানি হয়েছে। ব্যাপক প্রাণহাণিসহ সম্পদের ক্ষতি বেড়েই চলেছে।
১৭৭০ বর্গমাইলের নাগার্নো কারাবাখ নিয়ে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্বের চূরান্ত সূত্রপাত ১৯৮০ এর দশকে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় নাগার্নো কারাবাখ মূলত আজারবাইজানের নিজস্ব ভূমি ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে আর্মেনিয়া এটিকে নিজের বলে দাবি করে বসে। যার থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে উভয় দেশ ধাবিত হয়।
তবে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান এর এ দ্বন্দ্বের দিকে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা জরুরী। যুক্তরাষ্ট্রের স্টাম্ফোর্ড ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডি. লেইটিন তাঁর Indentity in Formation: The Russian – Speaking Population in the Near Abroad(1998) বইতে এই সংঘাতের একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন। ডেভিড বলেন, কারাবাখ দ্বন্দ্বের যুগযুগ ধরে চলে আসে এই সংঘাতের নেপথ্যে মূলত ‘ ‘জাতীয়তাবাদী’ এবং ‘জাতিতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব’ বা Ethno- nationalist conflict ভূমিকা রাখছে।
এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান দেশ দুটি যথাক্রমে খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মালম্বী দুটি জাতি নিয়ে গঠিত। এ জাতিগত বিভাজন উভয় জাতির জনগোষ্ঠীর উপর ব্যাপক প্রভাব রাখে। বলতে গেলে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান নাগার্নো কারাবাখকে তাদের স্ব স্ব ভূমি বা ‘homeland’ মনে করে আসছে।
এজন্য নরওয়ের একজন বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বার্থ তাঁর Groups and Boundaries(1969) নামক প্রবন্ধে বলেন, জাতিগত এই বিভক্তি আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের জনগণের মাঝে একটা পৃথক চিন্তার রুপরেখা তৈরি করে দিয়েছে। অবশ্য এই ‘পৃথকতার’ বিমূর্ততার নেপথ্যে উভয় দেশের আন্তঃ রাজনৈতিক প্রভাব অনস্বীকার্য। নাগার্নো কারাবাখ এর যে জাতিতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আমরা দেখি, সময়ের সাথে সাথে এটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রুপ নিয়েছে। ১৯৮০ এর দশকে বিশেষত ১৯৮৮-৯০ এর সময়কার আজারবাইজানের ‘সুমিগাট” ও ‘বাকু’ শহরে আর্মেনিয়ানদের উপর চালিত সংঘাত তার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
আলোচনার এই প্রেক্ষাপটে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যে দ্বিজাতিতাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের নেপথ্যে আন্তর্জাতিক বিশেষ করে ককেশীয় রাজনীতি কতটুকু ভূমিকা রেখে আসছে?
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রোনাল্ড সানী এবং ডেভিড ডি. লেইটেন(1) তাঁদের Armenia and Azerbaijan : Thinking A Way Out of Karabakh(1999) প্রবন্ধের প্রথমেই বলেন, আজারবাইজান তার প্রতিপক্ষ আর্মেনিয়াকে রাশিয়া এবং খ্রিস্টান মদদপুষ্ট শক্তি মনে করে; অপরদিকে আর্মেনিয়া প্রতিপক্ষ আজারবাইজানকে অটোমান সাম্রাজ্য তথা তুরস্কের বলয়ের একটি শক্তি হিসেবে দেখে।
তবে জাতিতাত্ত্বিক সংঘাতের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ এবং প্রেক্ষাপট যথেষ্ট লম্বা। নরওয়ের Uppsala বিশ্ববিদ্যালয়ের ককেশীয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞ Svante Cornell তাঁর Turkey and the Conflict in Nagarno Karabakh: A Delicate Balance(1998) প্রবন্ধে বলেন, আজেরি আর্মেনিয়ানদের এই সংঘাত সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। বলশেভিক বিপ্লব থেকে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে।
এক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। জাতিতাত্ত্বিক সংঘাত বা Ethno-Nationalist conflict এই দুটি দেশের মাঝে চলমান সংঘাতের একমাত্র কারণ নয়। এর নেপথ্যে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিভিত্তিক রাজনৈতিক প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। ককেশীয় রাজনীতিতে সোভিয়েত রাশিয়া এবং অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাববলয় বিস্তৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট স্ট্যালিন ককেশীয় অঞ্চলে তার নিজস্ব প্রভাববলয় বিস্তার করার জন্য বেশ কয়েকটি নীতিমালা প্রণয়ন করেন। এসব নীতিমালাকে stalinism বলা হয়ে থাকে।
ইলকার নিফতালিয়েভ তার Stalin on the Territorial Integrity of the Azerbaijani SSR (2010) প্রবন্ধে স্ট্যালিনের নাগার্নো কারাবাখ পরিকল্পনা ও চিন্তার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। জাতিগত দ্বন্দ্বপূর্ণ ককেশাসে মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজন ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পরে স্ট্যালিন বুঝতে পারেন ‘অর্থনৈতিক মন্দা’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দলপূর্ণ’ এই অঞ্চলের জন্য ‘আন্তঃজাতিগত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ একমাত্র সমাধান হতে পারে।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাশিয়া তার আজারবাইজান-আর্মেনিয়া নীতিতে দ্বিধাগ্রস্তভাবে নতুন কৌশলগত পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হয়। রাশিয়া একদিকে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাববলয়ের আজারবাইজান অপরদিকে কমিউনিস্ট প্রভাবিত আর্মেনিয়া নীতিতে কুটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে। এই বিষয়টিকে Cornell(1999) A Study of Ethno political Conflict in the Caucasus অনুচ্ছেদে বলেন, রাশিয়া প্রাথমিকভাবে অটোমান সাম্রাজ্যকে কুটনৈতিক আশ্বাসস্বরুপ নাগার্নো কারাবাখকে আজারবাইজানের ভূমি হিসেবে উল্লেখ করে। কিন্তু ১৯৮০ এর দশকে দুদেশের জাতিগত দ্বন্ধ পুনঃরুপ নিলে রাশিয়া আর্মেনিয়াকে নাগার্নো কারাবাখ অধিকারের ইংগিত দেয়।
এক্ষেত্রে রাশিয়া একটি ত্রিমুখী নীতি অবলম্বন করে। রাশিয়া আজারবাইজানের তেলসমৃদ্ধ সম্পদ হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে আর্মেনিয়াকে সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করে তোলে। এরই প্রেক্ষিতে রাশিয়া তার মিগ বিমান,ট্যাংক এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে আর্মেনিয়াকে শক্তিশালী করতে থাকে। যা একইসাথে আজারবাইজানের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বার্তা হিসেবে রুপ নেয়।
রাশিয়া আজারবাইজান আর্মেনিয়ান নীতিতে তার নতুন একটি রূপরেখা হিসেবে ‘মিন্সক প্রোসেস’ প্রবর্তন করতে সচেষ্ট হয়। তুরস্কের বিলকেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে Oil and Independence শিরোনামের প্রবন্ধে এই প্রোসেস সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয় রাশিয়া মিন্সক প্রোসেস এর মাধ্যমে নাগার্নো কারাবাখ সমস্যা সমাধানের কূটনীতিক কৌশল অবলম্বন করে ১৯৯০ এর দশকে। মিন্সক প্রোসেস হলো মূলত একটি শান্তি প্রক্রিয়া যেখানে রাশিয়া একমাত্র ‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসেবে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মাঝে শান্তিরক্ষায় এগিয়ে আসে। রাশিয়ায় এই প্রোসেসকে আর্মেনিয়া স্বাগত জানালেও আজারবাইজান রাশিয়ার এই কৌশলগত পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে।

অপরদিকে ককেশীয় রাজনীতিতে তুরস্কের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজারবাইজান তার একমাত্র শক্তিশালী মিত্র তুরস্ককে তার ভৌগোলিক রাজনীতিতে সবসময়ই স্বাগত এবং সমর্থন প্রত্যাশী ছিলো। ইরান, জর্জিয়া এবং আর্মেনিয়া দ্বারা পরিবেষ্টিত আজারবাইজান সাথে তুরস্কের কোনো সীমান্ত যোগাযোগ না থাকলেও বর্তমান আজারবাইজান প্রেসিডেন্ট আলীয়েভ তুরস্ককে ‘ভ্রাতৃপ্রতীম দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে।(বিবিসি,৭ অক্টোবর, ২০২০)
এক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ এবং ‘অসম অর্থনৈতিক তৎপরতা’ তুরস্ককে আজারবাইজানের পক্ষ নিতে উস্কে দিচ্ছে। এটি ককেশীয় রাজনীতির একটি বড় শক্তি রাজনৈতিক প্রভাবের ফল। যেখানে একধরনের zero sum থিউরি কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট ফর কনফ্লিক্ট এনালিসিস এন্ড রেজুলেশন এর অধ্যাপক Ho – Won Jeong তার Peace and Conflict Studies An Introduction এ বলেন, অসম আঞ্চলিক সম্পদকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তগ্রহণ অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যতা তৈরি করে। আজারবাইজান স্বার্থে তুরস্ক ও রাশিয়া বর্তমানে এরকম একটি অবস্থাতে দেখা যেতে পারে।
আজারবাইজান ক্ষেত্রে তুরস্কের অর্থনৈতিক স্বার্থ ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তুরস্কের নিকট আজারবাইজানের তেলসমৃদ্ধ সম্পদ প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। নরওয়ের Uppsala বিশ্ববিদ্যালয়ের European Studies এর ১৯৯৯ এর একটি প্রতিবেদনে তুরস্কের আজারবাইজান স্বার্থের একটা স্পষ্ট বিবরণ লক্ষ করা যায়।
প্রথমতঃ আজারবাইজানের কাস্পিয়ান খনিজ তেল তুরস্ককে একদিকে যেমন নিজের অঅভ্যন্তরীণ সামর্থ্যকে শক্তিশালী করবে অপরদিকে তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা থেকে বের করে আনবে।
দ্বিতীয়তঃ তুরস্ককে ককেশীয় অঞ্চলে একটি ‘চালিকাশক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করবে।
তাই দেখা যাচ্ছে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া সংঘাত একটি শক্তির খেলা হিসেবে কাজ করছে। তুরস্কের ড্রোনভিত্তিক সামরিক সাহায্যসহ যেকোনো সহোযোগিতা আজারবাইজানকে শক্তিশালী করছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি স্রেফ ভিত্তিহীনতায় রুপ নিয়েছে। এই সংঘাতে আজারবাইজানকে ভাবি-বিজয়ী হিসেবে দেখা যাচ্ছে। অপরদিকে আর্মেনিয়া ক্রমাগতভাবে চরম পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মাহফুজুর রহমান
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।