নবীন শিক্ষার্থীদের আতঙ্কের নাম গেস্টরুম

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০২০

মাহবুবুর রহমান সাজিদ ঃ

মধ্যরাতে কনকনে শীতে বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে একদল শিক্ষার্থী। সকলের মনে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা। ভিতরে ইমিডিয়েট সিনিয়র এবং বটনেতারা জটলা পাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
আজ কিভাবে প্যারা দেওয়া যায় এদেরকে।

দীর্ঘক্ষণ আলাপ আলোচনার পর  বেরিয়ে আসলেন ইমিডিয়েট সিনিয়ররা। উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সার্কাসে হাতি হতে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তখন পিনপতন নিরবতা।

তারপর হুকুম আসে একদল একদল করে সারিবদ্ধভাবে গেস্টরুমে প্রবেশ করো।
শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। কখনো কখনো শারীরিক নির্যাতনও করা হয়।

বলছি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরাতের এক নোংরা চিত্র।  যেটি সম্পন্ন হয় হলগুলোর গেস্টরুমে। তাই এটি সকলের নিকট গেস্টরুম হিসেবে পরিচিত। 

কেন করানো হয় গেস্টরুম?
অনেকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার জন্য গেস্টরুমের কিছু উপকারিতা তুলে ধরেন। তারমধ্যে অন্যতম উপকারিতা হচ্ছে বিসিএসের ভাইভায় নাকি সামনের সারিতে ইমিডিয়েট সিনিয়ররা বসে থাকবে। যখনই গেস্টরুম করানো জুনিয়রকে ঐ ইমিডিয়েট সিনিয়র দেখবে তখনই কোন সাক্ষাৎকার ছাড়াই ছেলেটি হয়ে যাবে বিসিএস ক্যাডার।  কতটুকু লেইম ও হাস্যকর তাদের এই লজিক সেটি বলা অবান্তর। কেননা বর্তমানের ছাত্রনেতা ওরফে ছাত্রনির্যাতনকারী বালবোকাশোদারা জীবনের অর্ধেক সময় অবৈধভাবে হলে কাটিয়ে দেয়। ওরা নাকি বসবে বিসিএসের ভাইভায়! আর বিসিএস ক্যাডার হয়েও বিসিএসের ভাইভায় বসতে একজন মানুষের কমপক্ষে ১৫-২০ বছরের অভিজ্ঞতা লাগে। সুতরাং তাদের যুক্তি ধোপে টিকেনা। দ্বিতীয় যে যুক্তি দেখানো হয় সেটিও বিসিএসকেন্দ্রীক। কারণ, আজকের প্রজন্ম বিসিএসের নেশায় মত্ত।  তাদের কব্জা করতে বিসিএসের লোভ দেখানোই পারফেক্ট।
যুক্তিটি হল, গেস্টরুমে কিভাবে সালাম দিতে হয়, কিভাবে হ্যান্ডশেক করতে হয়, কিভাবে প্যারা নিতে হয়, কিভাবে বড় ভাইদের গালাগাল  সহ্য করতে হয় অর্থাৎ কিভাবে একজন সুযোগ্য চামচা হওয়া যায় সেটি শিখানো হয়। যেটি বিসিএসের ভাইভা বোর্ডে এবং বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর চাকুরীক্ষেত্রে কাজে দিবে। প্রথম কথা হল, ক্যাম্পাস জীবনের এই স্বর্ণযুগে নবীন শিক্ষার্থীদের মহামূল্যবান ৩ ঘণ্টা সময় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে গেস্টরুমে, এছাড়া প্রোগ্রাম, প্রোটকলেও তাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে নিতে। যেখানেও তাদের প্রচুর সময় ধ্বংস করা হচ্ছে। এরপর ওরা কিভাবে বিসিএসের ভাইভায় যাবে! সারাদিন ভুতের মতো বিনাপারিশ্রমিকে খাটুনি খেটে রাতে পড়তে বসতে এমনিতেই মন চায়না। আবার ৯.০০ টা থেকে ১২.০০ টা পর্যন্ত গেস্টরুম।

এসব লেইম লজিকগুলো নিয়ে আর আলোচনা করতে চাচ্ছিনে। এবারে মূল আলোচনায় আসা যাক।

গেস্টরুম করানো হয় প্রোগ্রাম এবং প্রোটকল করানোর জন্য। প্রোগ্রাম ও প্রোটকল করতে যাতে বাধ্য হয় সেজন্য প্রশাসনের যোগসাজশে ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের গণরুমে তোলা হয়।

পয়সা খরচ করে সমাবেশে কর্মী নেওয়া, প্রোটকলের জন্য কর্মী নেওয়া ব্যাপক ব্যয়বহুল।  প্রতিবছর বিনা পয়সায় কয়েক হাজার পলিটিকাল প্রোগ্রামার পাওয়া যাচ্ছে সুতরাং এই পয়সা খরচের প্রশ্নই আসেনা। সুতরাং সকলের জ্ঞাতসারেই গেস্টরুম নামক এই অপসংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে হারিয়ে যাচ্ছে মেধাবী মুখগুলো, তৈরী হচ্ছে তেলবাজ, অমেরুদন্ডী কিছু চামচা।

আজকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিকট যখন প্রশ্ন করা হয়, তোমার গ্রুপ কি? আর্টস, কমার্স, নাকি সাইন্স? দ্বিতীয় প্রশ্ন শোনার পূর্বে নিঃসঙ্কোচে উত্তর করে অমুক ভাইয়ের গ্রুপ। এমনকি ডাক্তারেরা রক্তের গ্রুপ জিজ্ঞেস করেও বিপাকে পড়তে হয়। এতটুকু পাচাটা গোলামে পরিণত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। 

এতো আন্দোলন এত সংগ্রাম হয় এই ক্যাম্পাসে। এর পরও প্রতিরাতে নবীন শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিদিন তাদেরকে ইউজড করা হয়। এই গোলামীর দিন কবে শেষ হবে!

সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম