ধর্ষণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না কেন?

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৭:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩, ২০২০

মো: জাহাঙ্গীর আলম রাজু

জঙ্গলে বাস করতে হলে পশুদেরও নাকি কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। কিন্তু তথাকথিত সভ্য সমাজেও মানুষ মাঝে মাঝে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কাই করে না। কোনো কোনো সময়ে মানুষ হয়ে ওঠে পশুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। ভাবতে খুব অবাক লাগে, পাশের বাড়ির পরিচিত চাচাও দাঁত-নখ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছোট্ট শিশুর ওপর। কোনো একসময় আবার অতি ভরসার বন্ধুও হয়ে ওঠে হিংস্র হায়েনা। কেন হয় এ রকম? তবে কি যেকোনো মানুষের মধ্যেই থাকে ধর্ষণ প্রবৃত্তি?

বর্তমান সময়ে দেশে এমন অবস্থা বিরাজ করছে গনমাধ্যমগুলোর হেডলাইনে ই থাকে ধর্ষণের খবর। ৪ বছর বাচ্চা থেকে শুরু করে রাস্তার পাগলী পর্যন্ত ছাড় পাচ্ছেনা এই ধর্ষণ থেকে। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা শুনে আমরা বিস্মিত হই। কিন্তু আমাদের এই বিস্মিত হওয়াটা বেড়েই চলছে। গ্রামে, শহরে, রাস্তাঘাটে গনপরিবহন সহ যেকোন জায়গায় শুনতে পাওয়া যায় শুধু ধর্ষণের খবর। এই খবর শুনে হতাশা যেন অারো বেশি অাঁকড়ে ধরছে। কারণ, এক এলাকায় ধর্ষণের ঘটনার রেষ কাটতে না কাটতেই আমাদের পত্রিকার পাতাজুড়ে কিংবা গণমাধ্যম কেঁপে ওঠে নতুন আরেক খবরে। এ কেমন সমাজে বাস করি, মনের মধ্যে প্রশ্ন ঘুরপাক করে। কিন্তু ঘটনা থেমে থাকে না। ঘটনা দিন দিন ক্রমশ বেড়েই চলছে। আজকে কোনো চলন্ত বাসে হয়তো কোনো তরুণী, নয়তো কালকে নিজ বাসায় ছোট্ট শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। যৌন অপরাধগুলো বাড়িতে ও হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে যুক্ত থাকে পরিবার এবং আত্মীয়রাই। নিজের বাড়িতেও মেয়েরা নিরাপদ নয়। বলা হয়ে থাকে, অধিকাংশ শিশুই জেনে অথবা না জেনে তার নিকট আত্মীয়ের দ্বারাই যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে।

নারী দিবসে প্রতিবারই আসে নারীর প্রতি বৈষম্য, সহিংসতা, নিপীড়ন রোধ করার আহ্বান। তারপরও বন্ধ নেই এই সামাজিক অসুখ। সেই অসুখের এক বিষফোঁড়ার নাম ধর্ষণ। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা আমাদের বিশেষভাবে নাড়া দেয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর সাভারে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রী নীলা রায়কে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ির বলপিয়ে আদাম এলাকায় চাকমা সম্প্রদায়ের এক নারীকে গণধর্ষণের পাশাপাশি তার ওপর বর্বর নির্যাতন করে। অন্যদিকে ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণ করে। অাসকের তথ্যমতে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৯ মাসে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন এবং ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন। কিছুতেই যেন ধর্ষন প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অপহরণ করে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বেড়েছে। নারী স্বাধীনতা, নারী আন্দোলন, নারী অধিকার নিয়ে সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা, বক্তৃতা, অন্যদিকে বেড়ে চলেছে ধর্ষণের সংখ্যা। কিন্তু কেন? এর জন্য কারা দায়ী, কী করে ধর্ষণ কমিয়ে আনা সম্ভব? কেনই বা ঘটছে ধর্ষনের মত জঘন্য ঘটনা? বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষেরই ধারণা, বাংলাদেশের নারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেপরোয়াভাবে, বেপর্দায় চলাফেলার কারণে ধর্ষণের শিকার হয়। অনেকেরই দাবি, ধর্ষণের দায় প্রধানত নারীদের। তাদের ভাষায়, বখাটে ছেলেরা তো ঘোরাফেরা করবেই, ভারত-বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থাই এ রকম। ধর্ষণ বন্ধ করতে এই মধ্যযুগীয় চিন্তাচেতনার পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু পোশাকই যদি ধর্ষণের কারণ হতো, তবে এত পরিমাণের শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হতো না। ধর্ষণের জন্য দায়ী ধর্ষকামী মানসিকতা।

শুধু আইন প্রনয়ণ করেই কি ধর্ষন ঠেকানো সম্ভব? কখনোই না। আইনের ফাঁকফোকরের কারণে অনেক ধর্ষক পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে যেটুকু আইন রয়েছে, সেটা যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো নারীবান্ধব পরিবেশ নেই। আমাদের দেশের আইনের কাঠামোটা সেই ব্রিটিশরা বানিয়েছিল সেই পদ্ধতিতেই চলছে। সেখানে ধর্ষণের যে ইনভেস্টিগেশন সেটা মান্ধাতা আমলের। ফলে আইনের দুর্বলতার কারণে অনেক ধর্ষক সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। শিশু ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে সবাই মিলে এটাকে একটা আন্দোলন হিসেবে নিতে হবে। প্রথমত একেকটা ঘটনা ঘটে, তারপর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা হয়, তারপর একটা সময় আর মিডিয়ার ফলোআপ থাকে না। এ সময়ের মধ্যে তালিকায় আরও একটি ঘটনা যোগ হয়। ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে, সে জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। ধর্ষণ প্রতিরোধে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হতে হবে। ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে। শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে সরকারকে জিরো টলারেন্স নিতে হবে। প্রথম কথা হলো এটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অনেকেই সাহস করে মামলা দিচ্ছে না। এ ছাড়া শিশুদের যত্ন নিতে হবে। শুধু প্রশাসনের ওপর ভরসা করলে হবে না। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। এছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে প্রয়োজন ধর্মের নিয়মনীতি অনুযায়ী চলা। সবাইকে ধর্মের নিয়মনীতির প্রতি অাকৃষ্ট করা। নিজ সন্তানদের প্রতি কড়া নজরদারী করা। কোথায় চলছে, মিশছে প্রযুক্তির ভুল পথ প্রয়োগ করছে কিনা। সকলের প্রচেষ্ঠার ইতিবাচক দিক অবলম্বন করার মাধ্যমে এই সহিংসতা, অত্যাচার, গণধর্ষণ কমানো সম্ভব।

———–
মো: জাহাঙ্গীর আলম (রাজু)
ইংরেজি বিভাগ
সরকারী বাঙলা কলেজ,ঢাকা।