ধর্ষণ ও নারী উত্যক্তকরণঃ শেষ কোথায়?

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২০

———-

ধর্ষণ কী? ধর্ষণকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সকল সংজ্ঞার মূলকথা হল কারো অনিচ্ছায় জোরপূর্বক যৌন সঙ্গম,শারীরিক বল প্রয়োগ,যৌন নির্যাতন, যৌন আক্রমন কিংবা ব্যক্তিত্ব অপহরণের মাধ্যমে হেনস্থা করা। ধর্ষণ বলতেই অসামাজিক, বর্বর, নিষ্ঠুর ঘৃণিত অপরাধকে বোঝায়। এর ব্যাপ্তি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। যে কোন লিঙ্গ,বয়স,জাতি,সংস্কৃতি বা ধর্মের ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হতে পারে। ধর্ষণকে বেশ কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপঃ গণধর্ষণ,বৈবাহিক ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, অজাচার ধর্ষণ এবং কারাগারে ধর্ষণ। তন্মধ্যে গণধর্ষণ এবং শিশুধর্ষণ সবচেয়ে মারাত্মক জঘণ্যতম বিবেকহীন নিষ্ঠুর কর্ম হিসেবে বিবেচিত।
আধুনিক সমাজের বিস্তারের সাথে সাথে প্রতিনিয়ত আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে ধর্ষণের পরিসীমা। ১অক্টোবর ২০২০ (বৃহস্পতিবার) আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) যৌন হয়রানি, সহিংস ধর্ষণ ও হত্যাকান্ড, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপসহ ধর্ষণের সাথে সম্পৃক্ত অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ৯ মাসে সারা দেশে ৯৭৫ টি ধর্ষণের ঘটণা ঘটেছে,ধর্ষণের পর ৪৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং আত্মহত্যা করেছে আরো ১২ জন নারী। গত বছর একই সময়ে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ১,১১৫ টি। ওই সময়ে ৫৭ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল। আসেকের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের প্রথম ৯ মাসে ২৯৭ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ছিলেন। চলতি বছরের একই সময়ে এটি বেড়ে ৪৩২ হয়েছে। এ বছর নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে ২৮১ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছে আরো ৭৪ জন নারী। সাম্প্রতিক জরিপ ছাড়াও বিগত এবং প্রতিনিয়ত প্রকাশিত, অপ্রকাশিত, বিচারহীন, বিচারাধীন ও লোকচক্ষুর অন্তরালে অসংখ্য নারী নির্যাতনের এবং ধর্ষণের ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে। এছাড়াও পরিবার থেকে শুরু করে গ্রাম, শহর, রাস্তাঘাট, মার্কেট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৈন্দদিন জীবনের প্রতিটি স্তরে ঘটছে অসংখ্য ধর্ষণ আর নির্যাতনের ঘটনা। এবং এগুলার প্রভাব এতটাই বেশি যে মনে হয় এসব কিছুই আমাদের প্রতিনিয়ত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ন্যূনতম সাধারণ ঘটনা। তাছাড়াও কটূক্তি, অপ্রীতিকর অশালীন মন্তব্য, এসিড নিক্ষেপ, অযাচিত বল প্রয়োগে বিপর্যস্ত নারীদের জনজীবন। পরিবার থেকে শুরু করে, জাতীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে অপহৃত হচ্ছেন তারা। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম এবং সংশ্লিষ্ট সকল অনলাইন প্লাটফর্মে অশ্লীল অপ্রতীকির ভিডিও, কমেন্ট, হুমকিতে রীতিমত হেনস্থার শিকার হচ্ছেন নারীসমাজ। ব্যক্তিস্বাধীনতা যেন আজ কারারুদ্ধ, মুক্ত স্বাধীন অনিয়ন্ত্রিত জীবনব্যবস্থা আজ যেন শুধুই কল্পনা।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের সর্বশেষ পরিণতি মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যা। জীবিত থাকলেও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিঘ্নিত হয় সামাজিক কর্মজীবন,আত্মসম্মাে পরিবর্তিত হয় লাঞ্চনা ও বঞ্চনায়। ঘৃণা, দ্বেষ, অপমান আর অবহেলায় জীবিত ব্যক্তি হয়ে যায় মৃত্যসম যা মৃত্যুর থেকে অধিক যন্ত্রণাদায়ক। অধিকাংশ দেশেই ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড। বাংলাদেশেও নারী ও শিশু আইন-২০০০ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যদি নারী অথবা শিশুকে ধর্ষণ করে তাহলে যাব্বজীবন, অর্থদন্ড কিংবা উভয়ই দন্ডে দন্ডিত হবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগিক কর্মফল কতটুকু তা আজ রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ।

ধর্ষণকে সামাজিক ব্যাধি বললে ভুল হবেনা। এর মাধ্যমে কলুষিত হয় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র। বর্তমান সময়ের এর ব্যাপকতা এতটাই আশঙ্কাজনকভাবে জনজীবন শঙ্কিত করে তুলেছে যে, এর সমাধান হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাড়িয়েছেন্নয়নgঅগ্রগতির জন্য, সামাজিক এই ব্যাধির অপসারণ বর্তমানে জাতির মৌলিক দাবি। এক্ষেত্রে সরকার, সমাজ, এবং ব্যক্তিসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইনি কঠোরতা, এর বাস্তবিক প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতা যেরকম গুরুত্বপূর্ণ, তেমনিভাবে ব্যক্তিসচেতনতা , সামাজিক দায়বদ্ধতা, ধর্মীয় অনুশাসনের বিস্তার, নৈতিক মুল্যবোধের প্রয়োগিক রূপ এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অতীব জরুরী। সেই সাথে স্পষ্ট নীতিমালা, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান, সমতা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সংঘবদ্ধ একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে হবে, প্রতিটি নাগরিককে তার অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে অবগত ও সোচ্চার হতে হবে এবং ধর্ষণকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করণ, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতা, তথ্য ও প্রযুক্তির সেবা নিশ্চিতকরণ এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ধর্ষণ মোকাবেলা এবং এর বিস্তার রোধকল্পে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

মোঃ আরাফাত আলী।
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।